অনলাইন ডেস্ক: ২০১৮ সাল থেকে দেশে পাইপলাইনের ঘাটতি মেটাতে শুরু হয় এলএনজি আমদানি। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারের হিসাব বড় অদ্ভুত—চুক্তি হয় মিলিয়ন টনে, দর ঠিক হয় ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট বা এমএমবিটিইউতে, আর দেশে গ্রাহকের কাছে বিক্রি হয় ঘনমিটারে।
সহজ হিসাবে— একটি সাধারণ এলএনজি কার্গোতে থাকে প্রায় ৩৩ লাখ ৬০ হাজার এমএমবিটিইউ জ্বালানি। টার্মিনালে তরল থেকে গ্যাসে রূপান্তর এবং দীর্ঘ পাইপলাইনের সিস্টেম লস পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছায় প্রায় ৯ কোটি ১৯ লাখ ঘনমিটার গ্যাস।
এই গ্যাস মূলত যায় বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্প-কারখানা, ক্যাপটিভ পাওয়ার, সার কারখানা আর বাসাবাড়িতে।
এবার দেখা যাক খরচের খতিয়ান। আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে প্রতি এমএমবিটিইউ ২১.৫৫ ডলার দরে এক কার্গো এলএনজি কিনতে খরচ হয় প্রায় ৮৯৬ কোটি টাকা। এর সাথে আমদানি শুল্ক, রূপান্তর ফি, টার্মিনাল ভাড়া এবং সঞ্চালন ও বিতরণ চার্জ যোগ করলে মোট খরচ দাঁড়ায় ১ হাজার ১২ কোটি টাকা—অর্থাৎ প্রতি ইউনিটের খরচ পড়ে প্রায় ১১০ টাকা।
অথচ এই গ্যাস যখন ভর্তুকি মূল্যে বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গড়ে ১৫ টাকা বা শিল্পে ৩০ টাকায় বিক্রি করা হয়, তখন পুরো কার্গো বিক্রি করে সরকারের মোট আয় আসে মাত্র ২০৫ কোটি টাকা!
ফলাফল—একটি মাত্র কার্গো থেকে নিট লোকসান দাঁড়ায় প্রায় ৮০৭ কোটি টাকা! এই অঙ্কটি আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে যখন দেশীয় বিকল্পের সাথে তুলনা করা হয়। সমপরিমাণ গ্যাস যদি আমাদের নিজস্ব খনি থেকে তোলা যেত, তবে খরচ হতো মাত্র ৬৬ কোটি টাকা এবং রাষ্ট্র পেত প্রায় ১৩৯ কোটি টাকার নিট মুনাফা! এমনকি এই গ্যাস দিয়ে যে বিদ্যুৎ তৈরি হয়, কারখানার ছাদে আধুনিক রুফটপ সোলার প্যানেল বসালে তার চেয়ে অনেক কম খরচে নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।
অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদে স্পট মার্কেটের এলএনজির ওপর অতি-নির্ভরতা কোনো টেকসই অর্থনৈতিক পথ হতে পারে না। শিল্প কারখানায় বৈদ্যুতিক বয়লার, এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার এবং রুফটপ সোলার প্রকল্পের দৃশ্য। রিজার্ভ বাঁচাতে ও অর্থনীতি রক্ষা করতে অবিলম্বে দরকার সুনির্দিষ্ট সংস্কার:
প্রথমত, বাসাবাড়ির পাইপলাইনের অপচয় বন্ধ করে বোতলজাত এলপিজি ও ইন্ডাকশন ওভেনের ব্যবহারে জোর দেওয়া।
দ্বিতীয়ত, কারখানার ছাদে রুফটপ সোলার ও গ্যাস বয়লারকে বৈদ্যুতিক বয়লারে রূপান্তরের জন্য সাশ্রয়ী তহবিল তৈরি করা।
তৃতীয়ত, নবায়নযোগ্য জ্বালানির যন্ত্রাংশকে শতভাগ শুল্কমুক্ত করা।
আমদানি নির্ভরতার এই চড়া মূল্যের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে নিজস্ব শক্তি সক্ষমতা বাড়ানোই এখন অর্থনীতির প্রধান অগ্রাধিকার।