অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড: স্লাইডে আসামিদের নিয়ে পুলিশের যেসব তথ্যে গরমিল
ছবি: সংগৃহীত

কুবি প্রতিনিধি: কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আসামিদের বয়স, ঠিকানা ও শিক্ষাগত পরিচয় নিয়ে পুলিশের দেওয়া তথ্যে একাধিক অসংগতি পাওয়া গেছে।

পুলিশের প্রেস ব্রিফিংয়ের লিখিত তথ্য ও একই ব্রিফিংয়ে উপস্থাপিত স্লাইডের তথ্য তুলনা করে এসব পার্থক্য দেখা গেছে।

পুলিশের লিখিত তথ্যে সাইফুল ইসলাম তুহিনের বয়স ১৯ বছর উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, তিনি কুমিল্লা সরকারি সিটি কলেজের একাদশ শ্রেণিতে ফেল করে ২০২৫ সালে ড্রপআউট হন। বর্তমানে তিনি পড়ালেখা করেন না। একই ব্রিফিংয়ের স্লাইডেও তার বয়স ১৯ বছর উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে তুহিনের শিক্ষাগত পরিচয় নিয়ে পুলিশের তথ্যের সঙ্গে তার পরিবার ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বক্তব্যের অমিল রয়েছে।

তুহিনের মা রওশন আরা বেগমের দাবি, তার ছেলে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হননি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে তুহিন গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুলে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলেন। পরে নিয়মিত ক্লাস না করায় তিনি এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি।

এ বিষয়ে গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুলের প্রধান শিক্ষক বলেন, সাইফুল ইসলাম তুহিন ২০২৩ সালে তাদের বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। তবে বিদ্যালয়ের নিয়মকানুন না মানায় একই বছর তিনি টিসি নিয়ে স্কুল ছেড়ে যান।

প্রধান শিক্ষক বলেন, সে ২০২৩ সালে আমাদের স্কুলে ভর্তি হয়েছিল। এখানে নিয়মকানুন না মানায় ২০২৩ সালেই টিসি নিয়ে চলে যায়। পরবর্তী সময়ে সে কী করেছে, এর জন্য আমাদের স্কুল দায়ী নয়। আমাদের স্কুল সম্পর্কে বিভ্রান্তি ছড়ানো থেকে বিরত থাকার জন্য অনুরোধ করছি।

অপ্রতিম হত্যা মামলার আরেক আসামি মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদের বয়স নিয়েও পুলিশের দেওয়া দুই তথ্যে পার্থক্য রয়েছে। লিখিত প্রেস ব্রিফিংয়ে তার বয়স ১৫ বছর উল্লেখ করা হলেও একই ব্রিফিংয়ের স্লাইডে বয়স দেওয়া হয়েছে ১৬ বছর। লিখিত তথ্যে তাকে ময়নামতি কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী বলা হয়েছে।

মো. কামরুল হাসানের ক্ষেত্রে পুলিশের লিখিত প্রেস ব্রিফিংয়ে বয়স উল্লেখ করা হয়নি। তবে একই ব্রিফিংয়ের স্লাইডে তার বয়স ১৫ বছর দেখানো হয়েছে।

সবচেয়ে বড় পার্থক্য দেখা গেছে মো. সিয়ামের বয়সের ক্ষেত্রে। পুলিশের লিখিত তথ্যে তার বয়স ১৯ বছর উল্লেখ করা হয়েছে এবং তাকে আফজাল খান ডিগ্রি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী বলা হয়েছে। অথচ একই ব্রিফিংয়ে উপস্থাপিত স্লাইডে তার বয়স ১৫ বছর উল্লেখ করা হয়েছে। স্লাইডে তার শিক্ষাগত পরিচয় উল্লেখ করা হয়নি।

সিয়ামের ঠিকানার ক্ষেত্রেও দুই তথ্যে অমিল রয়েছে। লিখিত তথ্যে তার ঠিকানা এলাহীপুর, সদর দক্ষিণ, কুমিল্লা উল্লেখ করা হলেও স্লাইডে গ্রাম হিসেবে ‘সুধনাপুর (নোয়াবাড়ি)’ লেখা হয়েছে।

পুলিশের লিখিত তথ্য ও স্লাইডের তথ্য পাশাপাশি রাখলে দেখা যায়, ফাহাদের বয়সে এক বছরের পার্থক্য রয়েছে। কামরুলের বয়স লিখিত তথ্যে না থাকলেও স্লাইডে ১৫ বছর উল্লেখ করা হয়েছে। আর সিয়ামের বয়সে ৪ বছরের পার্থক্য রয়েছে। একই সঙ্গে তার ঠিকানাতেও অমিল রয়েছে।

সঠিক তথ্য প্রকাশের দাবি শিক্ষার্থীদের

প্রেস ব্রিফিংয়ে আসামিদের বয়স ও পরিচয় নিয়ে তথ্যের পার্থক্য থাকায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

তাদের দাবি, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে আসামিদের পরিচয়, বয়স ও ঘটনার বিবরণে স্পষ্ট ও সামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য দেওয়া প্রয়োজন।

ফার্মেসি বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী নাঈম ভূইয়া বলেন, প্রেস ব্রিফিংয়ের তথ্য নিয়ে তাদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

তার দাবি, কর্মসূচির আগে পুলিশকে দেওয়া চার দফা দাবি নিয়েও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো স্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একই ঘটনায় আগে আনাস নামের একজনকে আটকের খবর প্রকাশিত হলেও পরবর্তী প্রেস ব্রিফিংয়ে পুলিশ তা অস্বীকার করেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী নাজমুল বলেন, তুহিনকে গ্রেপ্তারের পর সে আনাসের নাম বলেছে বলে আমরা জানতে পেরেছিলাম। পরে আনাসকে বেলতলি থেকে আটক করা হয়েছে বলেও খবর পেয়েছিলাম।

কিন্তু প্রেস ব্রিফিংয়ে পুলিশ জানিয়েছে, আনাস নামে কাউকে আটক করা হয়নি। তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়ে থাকলে কেন ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, সেটিও স্পষ্ট করা দরকার।

সিয়ামের বয়স নিয়েও প্রশ্ন তোলেন নাজমুল। তার দাবি, পুলিশ সিয়ামের বয়স ১৫ বছর বললেও তাকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সিয়ামের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রোফাইলে ভিন্ন জন্মতারিখ দেখা যাচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্যের স্বাধীন যাচাই না হওয়ায় প্রতিবেদনে সেটিকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি।

এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে কুমিল্লার পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামানকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। পরে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে গিয়েও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

—জা.অর্থনীতি/এনজে