টাকা ফেরত পাচ্ছেন পাঁচ ব্রোকার হাউজের ১৭ হাজার বিনিয়োগকারী

নিজস্ব প্রতিবেদক: পুঁজিবাজারে পাঁচটি ব্রোকারেজ হাউজের বিভিন্ন অনিয়মে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ১৭ হাজার ৩৩২ জনকে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ডিএসই। আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে এ অর্থ ফেরতের কার্যক্রম শুরু হবে। এতে পাঁচ ব্রোকারেজ হাউজের ক্ষতিগ্রস্ত ১৭ হাজার ৯২৫ জন বিনিয়োগকারীর প্রায় ৯৭ শতাংশই তাদের পাওনা সম্পূর্ণ ফেরত পাওয়ার সুযোগ পাবেন।

যেসব ব্রোকারেজ হাউজের বিনিয়োগকারীরা টাকা ফেরত পাবেন সেগুলো হলো হলো মশিউর সিকিউরিটিজ, তামহা সিকিউরিটিজ, বানকো সিকিউরিটিজ, ক্রেস্ট সিকিউরিটিজ ও সগীর সিকিউরিটিজ।

মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর নিকুঞ্জে ডিএসইর কনফারেন্স রুমে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ডিএসইর চেয়ারম্যান মোমিনুল ইসলাম। সংবাদ সম্মেলনে সূচনা বক্তব্য দেন ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার। এছাড়াও ইনভেস্টমেন্ট প্রোটেকশন ফান্ডের চেয়ারম্যান নাসরিন বেগম বক্তব্য দেন।

ডিএসইর চেয়ারম্যান বলেন, পাঁচটি ডিফল্টার ব্রোকারেজ হাউজে বর্তমানে ১৭ হাজার ৯২৫ জন বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছেন। এসব বিনিয়োগকারীর মধ্যে ব্রোকারেজ হাউজ ও আইপিএফ থেকে এরই মধ্যে প্রায় ৩৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, যেসব বিনিয়োগকারীর পাওনা ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত, তাদের সম্পূর্ণ অর্থ আইপিএফ থেকে পরিশোধ করা হবে।

আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে অর্থ ফেরতের কার্যক্রম শুরু হবে জানিয়ে তিনি বলেন, পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে এক থেকে দুই মাস সময় লাগতে পারে। এর ফলে ১৭ হাজার ৩৩২ জন বিনিয়োগকারী, যা মোট ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীর প্রায় ৯৭ শতাংশ, তাদের পাওনা সম্পূর্ণ ফেরত পাবেন।

তবে ৫৯৩ জন বিনিয়োগকারীর পাওনা ৫ লাখ টাকার বেশি হওয়ায় তাদের বাকি অর্থ ফেরত পেতে আলাদাভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মোমিনুল ইসলাম বলেন, এসব বিনিয়োগকারীর পাওনা আদায়ে ডিফল্টার ব্রোকারেজ হাউজগুলোর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা জোরদার করা হবে। প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে থাকা শেয়ার বিক্রি, পরিচালকদের ব্যক্তিগত সম্পদ থেকে অর্থ আদায় এবং ভবিষ্যতে আইপিএফে জমা হওয়া অর্থ থেকেও তাদের পাওনা পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ডিএসই চেয়ারম্যান বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া শুধু আইনি বিষয় নয়, এটি মানবিক ও নৈতিক দায়িত্বও। ডিফল্টার প্রতিষ্ঠানগুলোর কারণে অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, শিক্ষক, বিচারক, ব্যাংকারসহ বিভিন্ন শ্রেণির বিনিয়োগকারী তাদের অর্থ আটকে যাওয়ায় সমস্যায় পড়েছেন। তাদের সমস্যা সমাধানে ডিএসই উদ্যোগ নিয়েছে।

তিনি জানান, ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরতের উদ্যোগে সরকারের নৈতিক সমর্থন পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সহযোগিতার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। শুরুতে নির্দিষ্ট একটি শ্রেণির বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরতের বিষয়ে নির্দেশনা থাকলেও ডিএসইর অনুরোধের পর সব ডিফল্টার হাউজের ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরতের বিষয়ে বিএসইসির কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি।

যেভাবে বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিলে অর্থ জমা হয়

বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিল বা আইপিএফের অর্থের উৎস সম্পর্কে মোমিনুল ইসলাম বলেন, ব্রোকারেজ হাউজগুলোর ট্রেড কমিশন থেকে নির্দিষ্ট হারে অর্থ প্রতি ছয় মাসে এ তহবিলে জমা হয়। পাশাপাশি তহবিলের অর্থ থেকে অর্জিত সুদও আইপিএফের অর্থের একটি উৎস।

তিনি বলেন, ২০২৫ সালে নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্রোকারেজ হাউজগুলোর হিসাবে থাকা অর্থের সুদের ২৫ শতাংশ আইপিএফে জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা ও বিতর্ক থাকলেও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডিবিএ) ও এর সদস্যরা এ অর্থ ব্যবহারে সমর্থন দিয়েছেন।
ডিএসই চেয়ারম্যান জানান, পাঁচটি ব্রোকারেজ হাউজের ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের তথ্য যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। একই সঙ্গে ডিফল্টার প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থাও চলমান রয়েছে। পাঁচ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চারটির বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) মামলা এবং একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে বলে জানান তিনি।
ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে ডিফল্টার প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা এবং বাজার তদারকি জোরদার করার কথাও জানান মোমিনুল ইসলাম। কোনো প্রতিষ্ঠানে অনিয়মের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরতের উদ্যোগ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীরা যাতে প্রতারণা বা অনিয়মের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সে জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা, স্টক এক্সচেঞ্জ ও বাজারসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
এ ছাড়া পুঁজিবাজারের বিভিন্ন বিষয়ে গণমাধ্যমকে নিয়মিত অবহিত করতে ভবিষ্যতে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে বৈঠক আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান ডিএসই চেয়ারম্যান।

—জা.অর্থনীতি/আরএস