সিলেটের পর্যটন খাতে সম্ভাবনার হাতছানি

শফিক আহমদ শফি, সিলেট: পাহাড়, ঝর্ণা, নদী, হাওড়, অরণ্য, চা-বাগান কিংবা জলাবনের নৈসর্গিক লীলাভূমি সিলেট। হজরত শাহজালাল (র.) ও হজরত শাহপনার (র.)সহ ৩৬০ আউলিয়ার স্মৃতিবিজড়িত সিলেটকে বলা হয় দেশের আধ্যাত্মিক রাজধানী। প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে সিলেটের পরিচিতি বিশ্বজুড়ে। 

তবে গত দেড় দশকে প্রকৃতিকন্যা সিলেটের এই অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন এনেছে পর্যটন খাত। এ খাতে বিনিয়োগে এগিয়ে এসেছেন প্রবাসী ও বেসরকারি উদ্যোক্তারা। গড়ে উঠেছে অসংখ্য হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, রেস্টুরেন্ট। ফলে সিলেটে পর্যটক সমাগমও বেড়েছে ব্যাপকহারে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনসহ সরকারি ছুটির দিনে সিলেটের বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রে ভ্রমণপ্রিয় পর্যটকদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। তবে সিলেটের আধুনিক ও সহজতর যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত হলে সিলেট পর্যটনে আরও গতির সঞ্চার হবে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত।

দুটি পাতা একটি কুঁড়ির দেশ নামে খ্যাত পুণ্যভূমি সিলেট, বিস্তীর্ণ সবুজ মনোরম চা-বাগানের জন্য প্রসিদ্ধ সিলেট। এই জেলার যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই দেখা যায় সবুজেঘেরা চা-বাগান। তাছাড়া ছোটবড় পাহাড়-টিলা, হাওড়, নদী, বনাঞ্চল, ঝর্ণার এক অপরূপ সমারোহ আমাদের এই সিলেট অঞ্চল। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত জেলা সিলেট। রাজধানী ঢাকা থেকে মাত্র ২৭৮ কিলোমিটার দূরে সিলেটের অবস্থান। নৈসর্গিক সৌন্দর্যে ভরপুর সিলেটের পর্যটন। এই শহরে রয়েছে উপমহাদেশের সর্বপ্রথম ও সর্ববৃহৎ মালনীছড়া চা-বাগান। এই অঞ্চলে আসা ভ্রমণপ্রিয় পর্যটকদের মন জুড়ায় সৌন্দর্যের রানিখ্যাত জাফলং, নীলনদখ্যাত স্বচ্ছ জলরাশির লালাখাল, পাথর-জলের মিতালীতে বয়ে যাওয়া বিছনাকান্দির নয়নাভিরাম সৌন্দর্য, পাহাড় ভেদ করে নেমে আসা পাংথুমাই ঝর্ণা, সোয়াম্প ফরেস্ট রাতারগুল, ‘মিনি কক্সাবাজার’ হাকালুকি ও কানাইঘাটের লোভাছড়ার সৌন্দর্য।

চারপাশে সবুজের সমারোহ, নীল আকাশের নিচে যেন সবুজ গালিচা পেতে আছে সজীব প্রকৃতি, সঙ্গে উঁচু-নিচু টিলা এবং টিলাঘেরা সমতলে সবুজের চাষাবাদ। আর এই সবুজ গালিচাই হলো সিলেটের চা-বাগান। সিলেটের চা-বাগানের খ্যাতি রয়েছে সারা বিশ্বে। দেশের মোট চায়ের ৯০ শতাংশই উৎপন্ন হয় সিলেটে। বিভিন্ন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ হলেও প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে অন্য এক ভালো লাগার ধারক হয়ে আছে সিলেটের চা-বাগান। বাংলাদেশের মোট ১৬৩টি চা-বাগানের মধ্যে ১৩৫টি রয়েছে বৃহত্তর সিলেটে। বৃহত্তর সিলেটের মধ্যে সিলেট জেলার জৈন্তাপুর, কানাইঘাট, গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ ও সিলেট সদর উপজেলায় রয়েছে বেশ কয়েকটি চা-বাগান। চা-বাগানে বসে একটি দিন প্রকৃতির সঙ্গে যে কীভাবে কেটে যাবে তা টের পাওয়া যাবে না।

সিলেটের পর্যটনের কথা এলে প্রথমেই যে নামটি চলে আসে তা হলো  জাফলং। এটি সিলেট বিভাগের একটি হিল স্টেশন এবং অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র। সিলেট শহর থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই পর্যটনকেন্দ্রে সড়কপথে পৌঁছাতে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগে। বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্তবর্তী খাসিয়া পাহাড়ের কোলে মারি নদীর পাশে অবস্থিত পাহাড়, সবুজ বন ও বাগানের সৌন্দর্যঘেরা একটি পাহাড়ি অঞ্চলের নাম জাফলং। হিমালয় থেকে সৃষ্ট মারি নদী এখানে প্রচুর পরিমাণে পাথরখণ্ড বয়ে নিয়ে আসে। চা-বাগান এবং পাহাড় থেকে গড়িয়ে আসা পাথরের বিরল সৌন্দর্যের দেখা মিলে এখানে।

দেশের একমাত্র এবং বিশ্বের অন্যতম জলাবনের নাম রাতারগুল। সিলেট শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে গোয়াইনঘাট উপজেলায় অবস্থিত রাতারগুল বন। পর্যটকদের কাছে এটা রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট নামেও পরিচিত। প্রায় ৩০ হাজার ৩২৫ একর জায়গা নিয়ে এই বনাঞ্চল গঠিত। রাতারগুল একটি প্রাকৃতিক বন। এরপরও বন বিভাগ হিজল, বরুণ, করচ, মুতাসহ কিছু জলবান্ধব জাতের গাছ লাগিয়ে দেয় এই বনে। এছাড়া রাতারগুলের গাছপালার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কদম, জালিবেত, অর্জুনসহ জলসহিষ্ণু প্রায় ২৫ প্রজাতির গাছপালা। তাইতো রাতারগুল সিলেট অঞ্চলের সুন্দরবন নামে খ্যাত। ভরা বর্ষায় স্থানীয় হস্তচালিত ডিঙি নৌকায় চড়ে রাতারগুল জলাবনে ঘুরে বেড়ানোর মধুর স্মৃতি ভোলা যাবে না সহজে।

সিলেট শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে জৈন্তাপুর উপজেলায় স্বচ্ছ নীল পানির নদী ‘লালাখাল’। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপরূপ লীলাভূমি। প্রকৃতিকে একান্তে অনুভব করার জন্য স্থানটি বেশ উপযোগী। পাহাড়ে ঘন সবুজ বন, নদী, চা-বাগান ও নানা জাতের বৃক্ষের সমাহার লালাখালজুড়ে। পানি আর প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যাওয়া এখানকার মানুষের জীবনযাত্রা একজন পর্যটককে দেবে নতুন করে বাঁচার প্রেরণা। বেশিরভাগ পর্যটক লালাখাল ভ্রমণের জন্য নদীপথ ব্যবহার করে থাকে। নৌপথে যেতে যেতে যেদিকে চোখ যায়, মুগ্ধতায় নেমে আসে কিছুক্ষণের জন্য।

সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলায় অবস্থিত বিছনাকান্দি মূলত জাফলংয়ের মতোই একটি পাথরকোয়ারি। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে খাসিয়া পাহাড়ের অনেকগুলো ধাপ দুই পাশ থেকে এক বিন্দুতে এসে মিলেছে। পাহাড়ের খাঁজে রয়েছে সুউচ্চ ঝর্ণা। ভ্রমণবিলাসীদের জন্য এই স্পটের মূল আকর্ষণ হলো পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে চলা পানির প্রবাহ। তাছাড়া বর্ষায় থোকা থোকা মেঘ আটকে থাকে পাহাড়ের গায়ে, মনে হতে পারে মেঘেরা পাহাড়ের কোলে বাসা বেঁধেছে।

পাংথুমাই সিলেটের আরেকটি প্রধান পর্যটনকেন্দ্র। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে মেঘালয়ের কোলে এক অসম্ভব সুন্দর গ্রাম পাংথুমাই। মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এই পানথুমাই গ্রামকে বলা হয় বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর গ্রাম। মেঘালয় রাজ্যের সারি সারি পাহাড়, ঝর্ণা থেকে বয়ে আসা পানির স্রোতধারা আর দিগন্তবিস্তৃত সবুজ ভূমির সঙ্গে স্থানীয় মানুষের জীবনাচার সবকিছু মিলে এক অনন্য পর্যটনকেন্দ্র এই পাংথুমাই। পাহাড়ঘেঁষা আঁকাবাঁকা রাস্তা পানথুমাই গ্রামের বৈশিষ্ট্য। গ্রামের শেষে পাহাড়ি গুহা থেকে হরিণীর মতোই উচ্ছল ভঙ্গিমায় ছুটে চলেছে ঝর্ণার জলরাশি। ভারতের মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝর্ণাধারাটি স্থানীয়ভাবে মায়ামতি ও ফাটাছড়া ঝর্ণা হিসেবে পরিচিত। আর পর্যটকদের কাছে জলপ্রপাতটির পরিচিতি পাংথুমাই ঝর্ণা নামে।

সমগ্র সিলেট অঞ্চলে জালের মতো ছড়িয়ে আছে ছোট-বড় অসংখ্য হাওড়। এর মধ্যে হাকালুকি হাওড় উল্লেখযোগ্য। সিলেট ও মৌলভীবাজার জেলার বেশ কয়েকটি উপজেলা নিয়ে সিলেটের সর্ববৃহৎ হাওড় হাকালুকি। সমগ্র বর্ষাকালে হাকালুকি হাওড়কে সাগরের মতো মনে হয় এবং এর মধ্যে অবস্থিত গ্রামগুলোকে মনে হয় একেকটা ছোট্ট দ্বীপ। বছরের প্রায় সাত মাস হাওড় এলাকা পানির নিচে অবস্থান করে এবং যাতায়াতের জন্য নৌকাই গ্রামগুলোর প্রধান বাহন। হাকালুকি হাওড়ে ৮০টি ছোট এবং ৯০টি মাঝারি ও বড় বিল রয়েছে। শীতকালে এসব বিলে অতিথি পাখিদের বিচরণে মুখর হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। সারা দেশ থেকে হাজারো পর্যটক ছুটে আসে পাখিদের এই মিলনমেলা দেখতে। শীতের হাকালুকি যেন এক অন্য জগৎ, মনোলোভা দৃশ্য দেখে মন হারিয়ে যায় এক পলকে। শীতের প্রকোপ যতই বাড়তে থাকে অথিতি পাখির আসার সংখ্যাও বাড়তে থাকে। বিশাল এলাকাজুড়ে শুধুই কিচিরমিচির আর নানান রঙের ডানা ঝাঁপটানোর দৃশ্য আর হাওড়ের মাঝে মাঝে ছোট ছোট বিলে শাপলা আর পদ্মের বাগান যেন কেউ সাজিয়ে রাখে পর্যটকদের জন্য।

পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, নানা সমস্যার কারণে আশানুরূপ পর্যটক টানতে ব্যর্থ হচ্ছে সিলেট। গত এক দশক ধরে সিলেটের পর্যটন খাত নিয়ে শুধু পরিকল্পনাই হচ্ছে। কিন্তু পরিকল্পনা কিংবা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। ভাঙাচোরা সড়ক, অনুন্নত অবকাঠামো, নিরাপত্তাহীনতা, পরিকল্পনা ও প্রচারের অভাব, দক্ষ জনশক্তি না থাকায় এখনও পরিকল্পনাতেই থমকে আছে সিলেটের সম্ভাবনাময় পর্যটন খাতটি। এ খাতে বিকাশে অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে পরিবহন খাতের অব্যবস্থাপনা। কারণ এখানকার পর্যটক দুর্ভোগ নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এখানকার চালকরা সিলেটের মানুষ না হলে ভাড়া বেশি রাখেন। এছাড়া ভাড়া গাড়ি নেওয়ার মতো কোনো কাউন্টার বা টিকিটের ব্যবস্থা নেই। ফলে যাত্রীদের যেমন বাড়তি ভাড়া গুনতে হয় তেমনি নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কায় থাকতে হয়। এছাড়া তুলনামূলক বেশি নৌকা ভাড়া নির্ধারণ করা থাকলেও এসবও মানতে চায় না কেউ।
প্রতি বছর জাফলং ও লালাখালসহ বিভিন্ন পর্যটন স্পটে পানিতে ডুবে অনেকের মৃত্যু হয়। প্রতি বছর এমন ঘটনা ঘটলেও পর্যটকদের নিরাপত্তায় তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। পর্যটন পুলিশ বলে একটি বিশেষ ইউনিট থাকলেও তাদের তেমন কার্যক্রম চোখে পড়ে না।

সিলেটের পর্যটন খাতের উন্নয়নে ইতোমধ্যে ১ হাজার ৯৫২ কোটি টাকার একটি নতুন বড় প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে যার লক্ষ্য যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও পর্যটন সম্ভাবনার প্রসার।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (LGED) অধীনে সিলেটের চার জেলার ৪১টি উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রশস্ত ও শক্তিশালী করা হচ্ছে।
২০২৯ সালের জুনের মধ্যে এই প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, অর্থনৈতিক গতিশীলতা আনা এবং সিলেটের পর্যটন ও বাণিজ্যের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য এ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। 

এলজিইডি সূত্র জানায়, পর্যটকদের সময় ও খরচ কমাতে এবার সিলেটের ভোলাগঞ্জ সাদাপাথর থেকে বিছনাকান্দি পর্যন্ত সাড়ে ১৯ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। 
এছাড়া গোয়াইনঘাটের রাধানগর থেকে জাফলং পর্যন্ত আরও ১৩ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করা হবে। এই সাড়ে ৩২ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে চারটি সেতু নির্মাণ করবে এলজিইডি।

সূত্র জানায়, সীমান্তঘেঁষা সড়কটি নির্মাণের পর পর্যটকরা ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে সাদাপাথর হয়ে জাফলং পৌঁছাতে পারবেন। পথিমধ্যে তারা সাদাপাথর, উৎমাছড়া, দমদমা ছড়া, বিছনাকান্দি, লক্ষ্মণছড়া, পান্থমাই, খাসিয়াপল্লী, জাফলং, মায়াবিঝর্ণা, সমতল চা-বাগান, তামাবিল ও নলজুড়ি ঝর্ণা দেখার সুযোগ পাবেন। ভোরে বের হলে সারা দিনে এই ১৩টি পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে জাফলংয়ে রাতযাপন করতে পারবেন। আর পরদিন জাফলং থেকে সিলেট আসা পর্যন্ত ঘুরে দেখতে পারবেন ডিবিরহাওড়, লালাখাল, জৈন্তারাজবাড়ী, রাতারগুল, খাদিম চা-বাগান, খাদিম জাতীয় উদ্যান, হজরত শাহপরাণ (রহ.) ও হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার।

সংশ্লিষ্টরা জানান ‘সিলেটের বেশিরভাগ পর্যটনকেন্দ্রে কোনো বিশ্রামাগার ও ওয়াশরুম নেই। এতে পর্যটকরা এসব স্থানে এসে বিপাকে পড়েন। কেবল পর্যটন এলাকায় নয়, ওইসব স্থানে যাওয়ার পথেও ওয়াশরুম নির্মাণ করা প্রয়োজন। স্পটগুলোতে কোনো বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও নেই। ফলে পর্যটকরা অনেক সময় পর্যটন এলাকা নোংরা করে ফেলেন। পর্যটনশিল্পের বিকাশে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও জরুরি বলে জানান অনেকে।

ট্যুর অপারেটস অ্যাসোসিয়েশন অব সিলেটের (টোয়াস) সভাপতি হুমায়ুন কবির লিটন বলেন, সিলেটের পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা অনেক বিস্তৃত। এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় স্থাপনা, চা-বাগান, পাহাড়, নদী ও হাওড়কে কেন্দ্র করে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার বিপুল সুযোগ রয়েছে। তবে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে পর্যটনসংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। পর্যটকদের কাছে সিলেটকে আরও আকর্ষণীয় ও নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরতে সেবার মান বাড়ানোর পাশাপাশি পর্যটনকেন্দ্রগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন। পর্যটকদের সঙ্গে ভালো আচরণ, স্বচ্ছতা, নির্ভরযোগ্য সেবা এবং পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা গেলে সিলেটের পর্যটন খাত আরও এগিয়ে যাবে।

খ্যাতিমান পর্যটন লেখক ও গবেষক মোহাম্মদ খতিবুর রহমান বলেন, সিলেটের পর্যটন শিল্পের উন্নয়নের জন্য আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ, পরিবেশ সংরক্ষণে কঠোর আইন প্রয়োগ, পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা, দক্ষ জনবল তৈরি, আন্তর্জাতিকমানের পর্যটনসেবা গড়ে তোলা, পর্যটন এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা, ডিজিটাল প্রচারণা বৃদ্ধি, স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি টেকসই পর্যটনের নীতিমালা অনুসরণ করে প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, সিলেট বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। এর অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং ধর্মীয় ঐতিহ্য দেশ-বিদেশের পর্যটকদের আকর্ষণ করে। তবে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর কার্যকর সমাধান ছাড়া এই সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশ সম্ভব নয়। পরিকল্পিত উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ, উন্নত সেবাব্যবস্থা এবং সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সিলেটকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আকর্ষণীয় ও টেকসই পর্যটন গন্তব্যে পরিণত করা সম্ভব।

সিলেট প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম বলেন,  সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সবচেয়ে অবহেলিত, নিগৃহীত ও জর্জরিত খাত হলো সিলেটের পর্যটন খাত। প্রাকৃতিকভাবে সৌন্দর্যের লীলাভূমি পেলেও সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে পর্যটন খাতটি দিন দিন পিছিয়ে পড়ছে। প্রবাসী ও বেসরকারি উদ্যোগে বিনিয়োগ করে হোটেল-মোটেল তৈরি করলেও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও উদ্যোগের কারণে অনেকেই বিনিয়োগ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।
তিনি বলেন, সিলেট থেকে দেশের যেকোনো জায়গায় যেতে এবং আসতে বিমান, রেল ও সড়কপথে আমাদের মোটা অঙ্কের টাকা গুনতে হচ্ছে। সিলেটে বিমানের টিকিটের মূল্য বেশি, রেলের ব্যবস্থাপনা ভালো নয় তবুও টিকিটের দাম বেশি। বাসে চড়তেও গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা। ফলে প্রথমেই সিলেটে আসার আগেই পর্যটকদের হোঁচট খেতে হচ্ছে। সিলেটে বর্তমানে পর্যটকের আনাগোনা কিছুটা বাড়ছে।
সিলেটের পর্যটনশিল্পের প্রসারে দৃশ্যমান, কার্যকর ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। এর এমনটি হলে পোশাকশিল্পের পরই সিলেটের পর্যটনশিল্প বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে দ্বিতীয় স্থানে থাকবে বলে আমার প্রত্যাশা।

সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন,
সিলেট বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। এর অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং ধর্মীয় ঐতিহ্য দেশ-বিদেশের পর্যটকদের আকর্ষণ করে। তবে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর কার্যকর সমাধান ছাড়া এই সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশ সম্ভব নয়। পরিকল্পিত উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ, উন্নত সেবাব্যবস্থা এবং সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সিলেটকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আকর্ষণীয় ও টেকসই পর্যটন গন্তব্যে পরিণত করা সম্ভব।