নেত্রকোনা প্রতিনিধি: নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলে বজ্রপাতে একের পর এক প্রাণহানি ঘটলেও কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। গত সাত বছরে জেলায় বজ্রপাতে অন্তত ৭৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। হাওরাঞ্চলে স্থাপন করা বজ্রনিরোধক দণ্ডের বেশিরভাগই এখন অকেজো। বজ্রপাত থেকে সুরক্ষায় তালগাছ রোপণের উদ্যোগও কার্যত সফল হয়নি। ফলে কৃষক, জেলে, হাঁস ও গবাদিপশু পালনকারীসহ হাওরাঞ্চলের মানুষের ঝুঁকি কমেনি।
মোহনগঞ্জ, মদন ও খালিয়াজুরীর বিস্তীর্ণ হাওর, বিল ও উন্মুক্ত মাঠে জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন কাজ করেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। বিশেষ করে চৈত্র-বৈশাখে ধান কাটার মৌসুমে বজ্রপাতের ঝুঁকি বাড়ে। ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে মাঠে কাজ করতে গিয়ে প্রতিবছরই প্রাণ হারান অনেকে। এতে বজ্রপাতের মৌসুমে কৃষকদের মধ্যে আতঙ্কও বাড়ছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে বজ্রপাতে ৮ জন, ২০২১ সালে ১৫ জন, ২০২২ সালে ৩ জন, ২০২৩ সালে ১২ জন, ২০২৪ সালে ৮ জন এবং ২০২৫ সালে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মারা গেছেন অন্তত ১৭ জন। হাওরাঞ্চলের বাসিন্দাদের দাবি, প্রকৃত প্রাণহানির সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
সর্বশেষ গত ১৭ সেপ্টেম্বর সকালে খালিয়াজুরী উপজেলার মেন্দিপুর ইউনিয়নের সাতগাঁও গ্রামের ইছাক মিয়ার ছেলে শফিকুল মিয়া বাড়ির সামনের হাওরে হাঁস আনতে গিয়ে বজ্রপাতে মারা যান। হাঁস পালন করে জীবিকা নির্বাহের স্বপ্ন ছিল তার। কিন্তু এক মুহূর্তের বজ্রপাতেই সেই স্বপ্ন থেমে যায়।
বজ্রপাতে প্রাণহানি কমাতে ২০২২ সালে জেলার বিভিন্ন হাওরাঞ্চলে বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন করা হয়। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায় ৩২টি লাইটনিং অ্যারেস্টার স্থাপন করা হয়েছিল। প্রতিটি দণ্ড স্থাপনে ব্যয় হয় ছয় থেকে আট লাখ টাকা। তবে হাওরবাসীর অভিযোগ, এগুলোর বেশিরভাগ খোলা মাঠের বদলে বাজার, ইউনিয়ন পরিষদ ভবন বা জনবসতিপূর্ণ এলাকায় স্থাপন করা হয়েছে। পরে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অনেকগুলো অকার্যকর হয়ে পড়ে। কোথাও কোথাও যন্ত্রাংশও চুরি হয়েছে।
খালিয়াজুরীর নয়াপাড়া গ্রামের কৃষক অনিল তালুকদার, মদনের গোবিন্দশ্রী গ্রামের রফিকুল ইসলাম ও মোহনগঞ্জের আদর্শনগর গ্রামের ফারুক মিয়া বলেন, হাওরের ফাঁকা জায়গায় বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন করা হলে কৃষকসহ মাঠে কাজ করা মানুষ বেশি উপকৃত হতেন। লোকালয়ের কাছে স্থাপন করায় হাওরে কাজ করতে যাওয়া মানুষের ঝুঁকি কমছে না।
বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে ২০১৮ সালে নেত্রকোনাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় তালগাছ রোপণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। নেত্রকোনাতেও এ প্রকল্পের আওতায় তালগাছের চারা লাগানো হয়েছিল। তবে রোপণের পর পর্যাপ্ত পরিচর্যা ও পানি না দেওয়ায় বেশিরভাগ চারা মারা গেছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। ফলে সরকারি অর্থ ব্যয়ে নেওয়া এ উদ্যোগও কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়নি।
মোহনগঞ্জের আদর্শনগর গ্রামের সুজিত মিয়া বলেন, “পাঁচ-ছয় বছর আগে সারা দেশের মতো নেত্রকোনাতেও তালগাছ রোপণ করা হয়েছিল। কিন্তু নজরদারির অভাবে এখন এসব গাছের অস্তিত্বই নেই। হাওর এলাকায় পরিকল্পিতভাবে তালগাছ লাগিয়ে স্থানীয়দের পরিচর্যার দায়িত্ব দিলে সুফল পাওয়া যেতে পারে।”
খালিয়াজুরী উপজেলা সদরের বাসিন্দা কাজল সরকার বলেন, “মানুষের জীবন রক্ষায় স্থাপন করা বজ্রনিরোধক দণ্ডগুলো রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে গেছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি বিভাগের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। পাশাপাশি উন্মুক্ত হাওরের বিভিন্ন স্থানে তালগাছ লাগানো দরকার।”
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন বলেন, “বিভিন্ন উপজেলার হাওর অঞ্চলে ফসলের মাঠ, বিল ও ফাঁকা জায়গায় ৩৪টি লাইটনিং অ্যারেস্টার স্থাপন করা হয়েছিল। এগুলোতে বিশেষ ধরনের ম্যাগনেট রয়েছে, যা ৩০০ ফুট এলাকা কভার করতে পারে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের জন্য মন্ত্রণালয়ে লিখিত আবেদন করা হয়েছে। বজ্রপাতের সম্ভাবনা দেখা দিলে স্থানীয় লোকজন সেখানে আশ্রয় নিয়ে নিরাপদে থাকতে পারবেন।”
জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, “প্রতি বছর জেলার হাওর অঞ্চলে বজ্রপাতে নিহতের সংখ্যা বাড়ছে। হাওরাঞ্চলের মানুষকে বজ্রপাত থেকে রক্ষায় জনসচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া বজ্রপাতের সময় মানুষ যাতে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয় নিতে পারেন, সে জন্য আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। বরাদ্দ পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।”
—জা. অর্থনীতি/এলএটি