মফস্বল সাংবাদিকতার ঐতিহ্য ও বাস্তবতা

রফিকুল ইসলাম 

মফস্বল সাংবাদিকতা বর্তমানে এক গভীর ও বহুমাত্রিক সংকটের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে, যা স্থানীয় পর্যায়ে মুক্ত সাংবাদিকতা এবং তথ্যের অবাধ প্রবাহকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মফস্বল বা গ্রামীণ সাংবাদিকতাকে গণমাধ্যমের 'রুট লেভেল' বা ভিত্তি ধরা হলেও, বাস্তব ক্ষেত্রে তারা নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তাছাড়া রয়েছে পেশাদারিত্বের অভাব ও 'হলুদ সাংবাদিকতা'র দৌরাত্ম্য।

বাংলাদেশসহ সামগ্রিক দক্ষিণ এশিয়ার গণমাধ্যম কাঠামোয় মফস্বল সাংবাদিকতা কেবল একটি শাখা নয়, বরং মূলধারার গণমাধ্যমের সবচেয়ে প্রাণবন্ত চালিকাশক্তি। রাজধানী বা প্রধান নগরীগুলোর বাইরে—জেলা, উপজেলা এবং প্রান্তিক জনপদের অবদমিত কণ্ঠস্বরকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরাই এর মূল লক্ষ্য। 

ঐতিহাসিক বিবর্তনের দিকে তাকালে দেখা যায়, ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক আমলে যখন মূলধারার সংবাদপত্রগুলো শহরকেন্দ্রিক এলিট শ্রেণির বৃত্তে বন্দি ছিল, তখন মফস্বল থেকে প্রকাশিত স্থানীয় পত্রিকাগুলোই প্রথম গ্রামীণ মানুষের ওপর হওয়া শোষণ, সামাজিক অন্যায় ও জমিদারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। ফলশ্রুতিতে, ভারতীয় উপমহাদেশের গণমাধ্যমের বিকাশে মফস্বল সাংবাদিকতা এক যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে।

মফস্বল সাংবাদিকতার আলোচনা এলেই একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—ঢাকা কি তবে পুরো বাংলাদেশ? কাঁচ ও কংক্রিটের ঘেরাটোপে বন্দি মূলধারার গণমাধ্যম যখন সচিবালয়ের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষের ফাইল চালাচালি, রাজু ভাস্কর্যের আন্দোলন বা গুলশানের অভিজাত আসরকে প্রতিদিনের ‘ব্রেকিং নিউজ’ বানায়, তখন রাজধানী থেকে সামান্য দূরে প্রান্তিক জনপদের বাস্তব চিত্র ঢাকা পড়ে যায়। অথচ এই সাধারণ মানুষের পরিশ্রমে ও বুড়ো আঙুলের ছাপে সচল রয়েছে জাতীয় অর্থনীতির মূল ভিত্তি। গণমাধ্যমের এই ঢাকাকেন্দ্রিক দৃষ্টি পরিবর্তন না হলে প্রান্তিক মানুষের প্রকৃত সংকট ও সংগ্রামের গল্প আড়ালেই থেকে যাবে।

বাংলাদেশ কেবল চারকোনা রাজধানী ঢাকার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্টুডিওতে সীমাবদ্ধ নয়; আসল বাংলাদেশ স্পন্দিত হয় টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার কাদা-জলের হাজারো জনপদে। দুর্ভাগ্যবশত, ঢাকার আলো-ঝলমলে বৃত্তে বসে প্রান্তিক মানুষের কান্না, ঘাম কিংবা প্রতিবাদের ভাষা নিখুঁতভাবে অনুধাবন করা অসম্ভব। আর এখানেই মফস্বল সাংবাদিকদের অপরিহার্যতা। এই অবহেলিত জনপদের ক্ষত, আনন্দ আর দীর্ঘশ্বাসের যিনি একমাত্র জীবন্ত দলিললেখক—তিনিই প্রান্তিক বা মফস্বল সাংবাদিক। প্রাচীনকালে সমাজ-সংশোধনকারী যে নির্ভীক তথ্য-সন্ধানীদের "মাকরেকার্স" (Muckrakers) বলা হতো, আজকের মফস্বল সাংবাদিকরা যেন তারই আধুনিক প্রতিচ্ছবি।

যেখানে ক্ষমতার আলো পৌঁছায় না, সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁদের লড়াই। তাঁরা মফস্বল সাংবাদিক—এক বোবা মানচিত্রের জীবন্ত কণ্ঠস্বর। কোনো বিলাসী শখ নয়, এটি এক ঝুঁকিপূর্ণ যুদ্ধ। আজ আমরা ব্যবচ্ছেদ করব মফস্বলের সেই সাংবাদিকতার অতীত গৌরব এবং বর্তমানের উপেক্ষিত ট্র্যাজেডি।

ঢাকার মিডিয়া সাম্রাজ্যের টিআরপি ও রেটিংয়ের রসদ জোগাতে দিনরাত হাড়ভাঙা খাটুনি খাটলেও, প্রান্তিক চারণ সাংবাদিকরাই আজ নিজ পেশার সবচেয়ে নির্মম শোষণের শিকার। বিলাসী জীবনের কোনো মোহ তাদের নেই; প্রান্তিক জনপদের অবদমিত কণ্ঠস্বরকে মূলধারায় তুলে আনতে গিয়ে তারা আজ করপোরেট সিন্ডিকেট ও রাজনৈতিক ক্ষমতার অদৃশ্য নিগড়ে আধুনিক ক্রীতদাস মাত্র।

কাঙাল হরিনাথ থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধ:

আজকের মফস্বল সাংবাদিকতাকে যারা ‘অখ্যাত অঞ্চলের ছোটখাটো খবর’ বলে অবজ্ঞা করেন, তারা আসলে শেকড়হীন। এই উপমহাদেশের সাংবাদিকতার মূল চেতনা—অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন বিদ্রোহ—কোনো বিলাসী রাজধানীতে জন্মায়নি; জন্মেছিল কুষ্টিয়ার কুমারখালীর এক প্রত্যন্ত গ্রামে। 

১৮৬৩ সালে যখন ব্রিটিশ শাসক আর স্থানীয় জমিদারদের অত্যাচারে কৃষকের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে যায়, তখন কাঙাল হরিনাথের হাত ধরে প্রকাশিত হয় ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’। মফস্বলের সেই কাঁঠের তৈরি ছাপাখানা থেকে যে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছড়িয়েছিল, তা আজকেও ক্ষমতার মসনদকে কাঁপানোর ক্ষমতা রাখে। মফস্বল সাংবাদিকতা তাই তুচ্ছ নয়, বরং ইতিহাসের চিরন্তন চালিকাশক্তি।

কাঙাল হরিনাথের কোনো আধুনিক ল্যাপটপ, ইন্টারনেট কিংবা দামি ক্যামেরা ছিল না; ছিল কেবল অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক বুক বারুদ। পাবনার কুখ্যাত নীলকরদের অত্যাচার আর জমিদারের লাঠিয়াল বাহিনীর শোষণের খবর যখন তিনি ছপছপ শব্দে কাঁঠের প্রেসে ছেপে বের করতেন, তখন কলকাতার বাবুদের বৈঠকখানায় তোলপাড় শুরু হতো।

মফস্বল সাংবাদিকতার জনক কাঙাল হরিনাথ আমাদের শিখিয়েছেন—সত্য প্রকাশের জন্য ক্ষমতার আড়ালে মাথা নোয়াতে হয় না, মাটির কাছাকাছি থাকাই আসল শক্তি।তিনি প্রমাণ করেছিলেন, আপসহীন সত্য প্রকাশের জন্য লর্ড-সাহেবদের অনুগ্রহের প্রয়োজন নেই, গণমানুষের স্পন্দন বুঝতে পারাই একজন প্রকৃত সাংবাদিকের সার্থকতা। তাঁর লেখনীর বজ্রনিনাদই শোষকশ্রেণির বুকে প্রথম কাঁপন ধরিয়েছিল।

১৯৫২-এর রক্তঝরা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৬৯-এর প্রলয়ঙ্করী গণঅভ্যুত্থান—বাঙালির স্বাধিকার লড়াইয়ের প্রতিটি বাঁকে স্বর্ণাক্ষরে খোদাই করা আছে মফস্বলের চারণ সাংবাদিকদের নাম। আর ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁদের ভূমিকা ছিল স্রেফ পেশাদারিত্ব নয়, বরং জীবন-মরণ বাজি রাখা এক অবিনাশী লড়াই। ঢাকা যখন পাকিস্তানি হানাদারদের বুটের তলায় পিষ্ট আর অবরুদ্ধ, তখন মফস্বলের অকুতোভয় কলমযোদ্ধারা কাঁধে ঝোলা ব্যাগ আর হাতে ডায়েরি নিয়ে ঘুরেছেন মুক্তাঞ্চলে। তাঁরা কেবল সংবাদ সংগ্রহ করেননি, রাইফেল আর কলমের যুগলবন্দীতে মুক্তাঞ্চল থেকে ছড়িয়ে দিয়েছেন বিজয়ের বারতা, হয়ে উঠেছেন অবরুদ্ধ দেশের কণ্ঠস্বর।

সেইসাথে স্থানীয় পর্যায়ের সাধারণ মানুষকে সংগঠিত করতে এবং পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যার খবর সংগ্রহ ও প্রচার করতে মফস্বল সাংবাদিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে জাতীয় আন্দোলনে ভূমিকা রাখে। এতে গ্রামীণ অর্থনীতি, কৃষি, বন্যা, দুর্ভিক্ষ এবং মহামারী পরিস্থিতি প্রথম মফস্বলের সাংবাদিকদের লেখনীর মাধ্যমেই নীতিনির্ধারকদের নজরে আসত।

এছাড়া তাঁরা যুদ্ধের খবর সংগ্রহ করেছেন, মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয়ের বার্তা কাগজে লিখে বর্ডারের ওপারে পাঠিয়েছেন, বিশ্ববিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছেন। অনেক মফস্বল সাংবাদিককে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসররা নির্মমভাবে হত্যা করেছে, কারণ তাদের কলম ছিল স্বয়ংক্রিয় রাইফেলের চেয়েও ধারালো ও সক্রিয়।

মফস্বল সাংবাদিকতার বর্তমানকালের গুরুত্ব:

বর্তমান ডিজিটাল বাংলাদেশে মফস্বল সাংবাদিকতার পরিধি ও গুরুত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। একে আধুনিক গণমাধ্যমের "লাইফলাইন" বা প্রাণশক্তি বলা যায়। কেননা, তথ্যের প্রধান উৎসই হলো মফস্বল।

১. বাস্তবিকই জাতীয় গণমাধ্যমগুলোর পক্ষে দেশের প্রতিটি গ্রাম বা প্রত্যন্ত অঞ্চলের খবর রাখা সম্ভব নয়। মফস্বল সাংবাদিকরাই স্থানীয় প্রশাসন, অপরাধ, উন্নয়ন, সম্ভাবনা ও সংকটের খবর অনুসন্ধান করে মূলধারার গণমাধ্যমে তুলে ধরেন। তাঁদের পাঠানো তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই জাতীয় স্তরের বড় বড় সংবাদ ও প্রতিবেদন তৈরি হয়।

২. ইন্টারনেট ও স্মার্টফোনের কল্যাণে এখন মফস্বল সাংবাদিকরা প্রত্যন্ত অঞ্চলের যেকোনো ঘটনা লাইভ ভিডিয়ো, ছবি বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সাহায্যে তাৎক্ষণিকভাবে দেশ ও বিদেশের মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। এর ফলে সংবাদের গতি বহুগুণ বেড়ে গেছে।

৩. স্থানীয় পর্যায়ে দুর্নীতি, অনিয়ম, এবং সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশার কথা মফস্বল সাংবাদিকদের মাধ্যমেই নীতি-নির্ধারকদের নজরে আসে। তারা স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেন।

৪. ডিজিটাল যুগে মানুষ নিজের এলাকার খবর সবচেয়ে বেশি জানতে চায়। এই 'হাইপারলোকাল' বা অতি-আঞ্চলিক সংবাদের যে বিপুল চাহিদা তৈরি হয়েছে, তা মফস্বল সাংবাদিকরাই পূরণ করছেন। ফলে গণমাধ্যমের পাঠক ও দর্শকপ্রিয়তা ধরে রাখতে তারা অপরিহার্য।

৫. মফস্বলের কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং পরিবেশগত বিভিন্ন সংকটের প্রতিবেদন জাতীয় গণমাধ্যমে আসার পর তা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। অনেক সময় এসব রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই জাতীয় বাজেট বা উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।

৬. জাতীয় স্তরের মূলধারার টেলিভিশন, পত্রিকা বা অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলোর সংবাদের একটি বিশাল অংশ আসে মফস্বল প্রতিনিধিদের কাছ থেকে। মফস্বল সাংবাদিকরা না থাকলে দেশের ৮০ ভাগ এলাকার খবর সম্পূর্ণ আড়ালে থেকে যেত।

৭. স্থানীয় পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দুর্নীতি, অনিয়ম এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের চিত্র মফস্বল সাংবাদিকরাই সাহসের সাথে সামনে নিয়ে আসেন। এটি স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহিতা নিশ্চিত এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি দমন করতে সাহায্য করে।

৮. কৃষকের ফসলের ন্যায্য মূল্য না পাওয়া, নদীভাঙন, চিকিৎসাবঞ্চিত মানুষের দুর্দশা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ের লড়াই মফস্বল সাংবাদিকতার মাধ্যমেই মূলধারার আলোচনায় আসে। ফলে প্রান্তিক মানুষের অধিকারও রক্ষা পায়।

৯. ডিজিটাল বিপ্লব ও তাৎক্ষণিক তথ্যপ্রবাহে
সোশ্যাল মিডিয়া এবং স্মার্টফোনের যুগে মফস্বল সাংবাদিকতা আরও গতিশীল হয়েছে। এখন কোনো প্রত্যন্ত গ্রামে ঘটনা ঘটার কয়েক মিনিটের মধ্যে ফেসবুক লাইভ বা অনলাইনের মাধ্যমে তা সারা বিশ্ব জেনে যাচ্ছে। স্থানীয় ফেসবুক পেজ বা অনলাইন পোর্টালগুলো এখন জনমত গঠনে বড় ভূমিকা রাখছে।

ইতিহাসের সেই গৌরবোজ্জ্বল মফস্বল সাংবাদিকতা আজ কোন মোহনায় এসে দাঁড়িয়েছে? বর্তমানের মফস্বল সাংবাদিকতা এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে প্রযুক্তির আলো, অন্যদিকে পেশাগত অন্ধকার।
                 
আজকের দিনে ঢাকার তথাকথিত বড় বড় স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল কিংবা মিলিয়ন ভিউজ পাওয়া অনলাইন পোর্টালগুলোর দিকে তাকান। প্রতিদিন তারা যে হরিলুটের খবর, ধর্ষণের বিচার, নদীভাঙন, ফসলহানি, ডাকাতি, মাদক কিংবা চোরাচালানের খবর দেখায়, তার শতকরা ৮০ ভাগ সরবরাহ করেন মফস্বলের প্রতিনিধিরা। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, মোটরসাইকেলের তেল নিজের পকেট থেকে পুড়িয়ে এই মফস্বল সাংবাদিকরা যে সংবাদ পাঠান, তা দিয়েই ঢাকার এসি রুমে বসা চকচকে চশমা পরা নিউজ এডিটররা ‘এক্সক্লুসিভ’ লোগো বসিয়ে রেটিং বাড়ান। মফস্বল সাংবাদিকরা হলেন এই তথ্য-শিল্পের মূল কাঁচামাল সরবরাহকারী। অথচ, বিনিময়ে তারা কী পান?

বাংলাদেশের মূলধারার গণমাধ্যমের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়টি রচিত হয় মফস্বলে। দেশের অধিকাংশ জাতীয় পত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেল তাদের উপজেলা বা জেলা প্রতিনিধিদের কোনো নিয়মিত বেতন দেয় না, তাদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া রঙচঙা প্লাস্টিকের আইডি কার্ড ছাড়া। প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক নিশ্চয়তা না থাকায়, জীবনধারণের তাগিদে এই কার্ডটিই অনেক সময় অনৈতিক সুবিধা আদায়ের এক অদৃশ্য ‘ছাড়পত্র’ বা ‘লাইসেন্স টু হান্ট’-এ রূপ নেয়। আর আন্ডারগ্রাউন্ড মিডিয়াগুলো তো নিয়োগের নামে উল্টো সাংবাদিকদের পকেট কাটে।

খাতা-কলমে সরকারি ওয়েজ বোর্ড থাকলেও মফস্বলে তা চরম প্রহসন। এটি সাংবাদিকতার মোড়কে এক নিখাদ আধুনিক দাসপ্রথা। যে গণমাধ্যমকর্মী নিজের পরিবারের তিন বেলার ভাতের নিশ্চয়তা পান না, সমাজ তার কাছ থেকে কীভাবে নিরপেক্ষ ও সাহসী সাংবাদিকতা আশা করবে? 

মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকদের ন্যূনতম রুটি-রুজির নিরাপত্তা না দিয়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার চটকদার বিজ্ঞাপন দেওয়া আসলে এক সুসংগঠিত প্রতারণা, ভণ্ডামি ও প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম ছাড়া আর কিছুই নয়।

ডিজিটাল বাংলাদেশ বা স্মার্ট বাংলাদেশের ছোঁয়া মফস্বলেও লেগেছে। এখন আর সংবাদ পাঠাতে ট্রেনের ওপর বা ডাক বিভাগের ওপর নির্ভর করতে হয় না। স্মার্টফোন আর ইন্টারনেটের কল্যাণে মফস্বল সাংবাদিকতা এখন রিয়েল-টাইম।

কোনো প্রত্যন্ত গ্রামের সরকারি হাসপাতালে ডাক্তার নেই কিংবা কোনো মেম্বার গরিবের চাল চুরি করছেন—মফস্বল সাংবাদিকের মোবাইল ক্যামেরা অন হতেই তা মুহূর্তের মধ্যে লাখো মানুষের ওয়ালে পৌঁছে যাচ্ছে। এই তাৎক্ষণিকতা স্থানীয় প্রশাসনকে তটস্থ রাখে।

প্রযুক্তির সহজলভ্যতা মফস্বল সাংবাদিকতায় আবার এক বিপজ্জনক ‘হাইব্রিড’ সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে। ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা আন্ডারগ্রাউন্ড পোর্টাল, ভুঁইফোড় ফেসবুক পেজ আর সস্তা ডোমেইন-হোস্টিংয়ের কল্যাণে আজ ঘরে বসেই যে কেউ ‘অনলাইন নিউজ পোর্টাল’ বা ‘লাইভ টিভি’র মালিক ও চেয়ারম্যান বনে যাচ্ছেন।

কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, ন্যূনতম ভাষাজ্ঞান বা সাংবাদিকতার নীতিনৈতিকতার তোয়াক্কা না করে শুধু গলায় একটা রঙবেরঙের 'প্রেস কার্ড' ঝুলিয়েই অনেকে নিজেকে ‘সাংবাদিক’ দাবি করছেন। মোটরসাইকেলের সামনে ‘সাংবাদিক’ লিখে ইটের ভাটা, ক্লিনিক, বালুমহাল কিংবা থানা বা বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে মাসোহারা ও চাঁদাবাজি করাই এই শ্রেণির মূল পেশা। ফলে মফস্বলে আজ প্রকৃত ও নিষ্ঠাবান সাংবাদিকদের চেয়ে ‘কার্ডধারী’ দালালের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেশি।

শুধু কি তাই? ওসি, ইউনও, ডিসি, এসপি, হাসপাতালের পরিচালক-উপপরিচালকসহ প্রভাবশালী সরকারি কর্মকর্তাদের সাথে ছবি তুলে বিশ্বজয়ের তৃপ্তিতে তা মহাসমারোহে প্রকাশ-প্রচার করছে। এই প্রবণতাটি কেবল একটি সাধারণ ছবি নয়; এটি মূলত সামাজিক প্রভাব তৈরি, আত্মরক্ষার কবচ খোঁজা এবং নিজের পেশাগত গুরুত্ব প্রমাণের এক মনস্তাত্ত্বিক হাতিয়ার।

মোদ্দা কথা, এটি এক ধরণের 'সোশ্যাল কারেন্সি' বা সামাজিক পুঁজি হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা, যার মাধ্যমে কিছুসংখ্যক মফস্বল সাংবাদিক সমাজে নিজের দাপট ও প্রভাব টিকিয়ে রাখতে চান।

মফস্বল সাংবাদিকতার এই প্রবণতা বা এর ফলে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতায় কী ধরণের প্রভাব পড়ে, তা জানা জরুরি।

মফস্বল সাংবাদিকতায় সরকারি কর্মকর্তাদের সাথে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা এবং ছবি তোলার সংস্কৃতির কারণে স্থানীয় পর্যায়ে বস্তুনিষ্ঠ ও স্বাধীন সাংবাদিকতা মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। এর ফলে সাংবাদিকতার মূল লক্ষ্য এবং সমাজ—উভয়ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ে - ১. সাংবাদিকতার মূল লক্ষ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব, ২. বস্তুনিষ্ঠতার অভাব, ৩. স্বাধীন সাংবাদিকতা ব্যাহত হওয়া, ৪. তদারকি বা ওয়াচডগ ভূমিকা হারানো, ৫. সমাজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব, ৬. জনস্বার্থের ক্ষতি, ৭. জনগণের আস্থা হ্রাস, ৮. অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রশ্রয় পাওয়া।

এই সংস্কৃতি সাংবাদিককে তার পেশাগত সততা থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং সমাজকে সঠিক তথ্য পাওয়া ও বিচার পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে। ফলে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ আড়ালে পড়ে যায়।

সাধারণ মানুষ যখন দেখেন একজন সাংবাদিক সারাক্ষণ ডিসি-এসপি বা ওসি-ইউএনও-এর সাথে ওঠাবসা করছেন, তখন তারা ওই সাংবাদিকের ওপর ভরসা হারিয়ে ফেলেন। জনগণ মনে করেন প্রশাসন কোনো অন্যায় করলে এই সাংবাদিক তার সঠিক বিচার বা সংবাদ প্রকাশ করবেন না।

এই ধরণের সাংবাদিকেরা সাধারণত প্রশাসনের দেওয়া তথ্য বা 'প্রেস রিলিজ' হুবহু প্রকাশ করতে বেশি পছন্দ করেন। তারা প্রশাসনের ভেতরের অনিয়ম খোঁজার চেয়ে কর্মকর্তাদের গুণগান গেয়ে সংবাদ প্রকাশ করেন, যা সাংবাদিকতাকে এক ধরণের জনসংযোগ কাজে পরিণত করে।

অথচ মফস্বলে যারা সততা ও সাহসিকতার সাথে সত্যিকারের অনুসন্ধানমূলক সাংবাদিকতা করতে চান, তারা প্রশাসনের রোষানলে পড়েন। অন্যদিকে, কর্মকর্তাদের সাথে ছবি তোলা 'প্রভাবশালী' সাংবাদিকরা প্রশাসনের সুনজরে থাকেন এবং সব ধরণের সরকারি সুবিধা বা তথ্য আগে পেয়ে যান। এতে সৎ সাংবাদিকরা পেশাগতভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েন।

মফস্বল এলাকার অনেক সাংবাদিক এই প্রশাসনিক ক্ষমতা দেখিয়ে বিভিন্ন চাঁদাবাজি, দালালি বা তদবির বাণিজ্যের সাথে জড়িয়ে পড়েন। কর্মকর্তারাও অনেক সময় নিজেদের দুর্নীতি ঢাকতে এই ধরণের সাংবাদিকদের ব্যবহার করেন বা সুবিধা দিয়ে মুখ বন্ধ রাখেন। এই সংস্কৃতি মফস্বল সাংবাদিকতাকে প্রশাসনের 'ওয়াচডগ' বা পাহাড়াদার থেকে 'ল্যাপডগ' বা পোষা প্রাণিতে পরিণত করে, যা একটি সুস্থ ও গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

যার পরিপ্রেক্ষিতে আসল পেশাদার মফস্বল সাংবাদিকরা যেমন কোণঠাসা হচ্ছেন, তেমনি সাংবাদিকতা পেশাটির মর্যাদা ধুলোয় মিশছে। এ যেন ভিউজ আর লাইকের সস্তা ফাঁদ।

মফস্বল সাংবাদিকতার এই দৃশ্যমান অবক্ষয় এবং অন্ধকার সুরঙ্গ থেকে বের হয়ে আসতে হলে কেবল লিপ-সার্ভিস বা ফাঁকা বুলি যথেষ্ট নয়; এর জন্য প্রয়োজন আমূল কাঠামোগত সংস্কার।

মফস্বল সাংবাদিকতার বর্তমান প্রধান সংকটের ত্রিভুজ:

বর্তমান যুগে মফস্বলে সাংবাদিকতা করা সত্যিই তলোয়ারের ধারের ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার মতো এক ঝুঁকিপূর্ণ পেশা। একজন মফস্বল সাংবাদিককে প্রতিদিন যে তিনটি প্রধান শক্তির বিরুদ্ধে মূলত যুদ্ধ করে টিকে থাকতে হয় -

১. স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক চাপ: 
মফস্বলে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু থাকে খুব সীমিত মানুষের হাতে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতাকর্মী এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নিজেদের এলাকায় একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখতে চান। তাদের যেকোনো অনিয়ম, দুর্নীতি, বা ক্ষমতার অপব্যবহারের খবর প্রকাশ করতে গেলেই সাংবাদিকদের ওপর সরাসরি হুমকি, হামলা, মিথ্যা মামলা কিংবা হেনস্তার খড়গ নেমে আসে। শহরের মতো মফস্বলে সাংবাদিকদের তাৎক্ষণিক প্রাতিষ্ঠানিক বা আইনি সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগও খুব কম থাকে।

২. অপরাধী চক্র ও ভূমি-বালু দস্যু:
 মফস্বল বা গ্রামাঞ্চলে অবৈধ বালু উত্তোলন, ভূমি দখল, মাদক ব্যবসা, চোরাচালান এবং নদী-বন ধ্বংসের মতো অপরাধমূলক সিন্ডিকেটগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী ও হিংস্র হয়। এই চক্রগুলোর পেছনে অনেক সময় স্থানীয় প্রশাসনের একাংশ বা রাজনীতিকদের মদদ থাকে। এই অপরাধী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করতে গিয়ে মফস্বল সাংবাদিকদের প্রায়শই চরম শারীরিক নিরাপত্তা হীনতায় ভুগতে হয় এবং অনেক সময় জীবন পর্যন্ত দিতে হয়।

৩. অর্থনৈতিক সংকট ও প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা: এটি মফস্বল সাংবাদিকদের ভেতরের বা ঘরের শত্রু। মূল ধারার বা বড় মিডিয়া হাউসগুলো মফস্বলের প্রতিনিধিদের নিয়মিত বা পর্যাপ্ত বেতন-ভাতা দেয় না। অনেক সময় তাদের কেবল একটি 'পরিচয়পত্র' দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। ফলে সৎভাবে সাংবাদিকতা করতে গিয়ে তাদের তীব্র অর্থনৈতিক অনটনের মুখোমুখি হতে হয়। একদিকে জীবিকার তাগিদ, অন্যদিকে নিজের মিডিয়া হাউসের কাছ থেকে সঠিক সময়ে আইনি ও আর্থিক ব্যাকআপ না পাওয়া—এই দুইয়ের মাঝে পড়ে তাদের প্রতিদিন এক মানসিক যুদ্ধ লড়তে হয়।

অথচ ঢাকায় বসে কোনো মন্ত্রীর সমালোচনা করা যতটা সহজ, মফস্বলে বসে স্থানীয় থানার ওসি বা উপজেলা চেয়ারম্যানের দুর্নীতির খবর ছাপা তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি বিপজ্জনক। কারণ, ঢাকায় কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা থাকে, কিন্তু মফস্বলে সাংবাদিকের ঘরের ঠিক পাশেই থাকে অপরাধীদের আস্তানা। খবর প্রকাশের পরেই সাংবাদিকের ওপর হামলা, বাড়ি ভাঙচুর কিংবা মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়া মফস্বলের নিত্যদিনের চিত্র। 

সাগর-রুনির হত্যাকাণ্ড নিয়ে দেশ তোলপাড় হয়, কিন্তু মফস্বলে যখন কোনো সাংবাদিককে পিটিয়ে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়, তখন সেই খবর ঢাকার পত্রিকার ভেতরের পাতায় তিন লাইনের এক টুকরো কলাম হয়ে ঝুলে থাকে।

ডিজিটাল কিংবা সাইবার নিরাপত্তার নামে যে সমস্ত কালো আইন তৈরি হয়েছে, তার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী কিন্তু মফস্বলের সাংবাদিকরা। ক্ষমতাসীন রাজনীতিক বা কোনো ডিসি-এসপি বা ইউএনও-ওসি কিংবা বড় কোনো কর্মকর্তার অনিয়মের বিরুদ্ধে ফেসবুকে পোস্ট দিলেই বা নিউজ করলেই ‘রাষ্ট্রের বা ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন’ কিংবা মানহানি হওয়ার অজুহাতে মফস্বলের সাংবাদিকদের গভীর রাতে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। আইনের এই চাবুক মফস্বলের স্বাধীন সাংবাদিকতার কণ্ঠনালী চেপে ধরেছে।

মফস্বল সাংবাদিকদের এই নিরাপত্তাহীনতা কোনো ফাঁকা আওয়াজ বা অতিরঞ্জন নয়, তা দেশের সমসাময়িক মানবাধিকার প্রতিবেদনগুলোর দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২৬ সালের আগস্টে মানবাধিকার ও গণমাধ্যম বিষয়ক সংস্থা ‘মিডিয়া ইনিশিয়েটিভ ফর ডেভেলপমেন্ট’ (মিড)-এর একটি চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মাত্র এক মাসে (জুলাই ২০২৬) দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ৫০ জন সাংবাদিক তীব্র নির্যাতন ও প্রাণনাশের হুমকির শিকার হয়েছেন। আঁতকে ওঠার মতো তথ্য হলো, এই নির্যাতনের শতকরা ৯১.৪ ভাগ ঘটনাই ঘটেছে মফস্বলে—অর্থাৎ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে।

একইভাবে ‘হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি’ (এইচআরএসএস)-এর ডেটাও বলছে, বছরের পর বছর ধরে শয়ে শয়ে মাঠপর্যায়ের সাংবাদিক পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আহত ও হয়রানিমূলক মামলার শিকার হচ্ছেন। ঢাকায় বসে যখন প্রেস ফ্রিডম বা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার লম্বা চওড়া খসড়া তৈরি হয়, ঠিক তখন কুড়িগ্রামের কোনো চরে বালুমহালের সিন্ডিকেটের তাড়া খেয়ে কিংবা বরিশালের কোনো প্রত্যন্ত উপজেলায় ইউপি চেয়ারম্যানের গুন্ডাবাহিনীর মারধরের শিকার হয়ে মফস্বলের কোনো এক সাংবাদিক হাসপাতালে যন্ত্রণায় কাতরান। অথচ এই সমস্ত লোমহর্ষক ঘটনাগুলো মূলধারার গণমাধ্যমে স্রেফ ছোট একটা ‘নিউজ স্ক্রল’ বা ভেতরের পাতার এক কোণায় জায়গা পেয়েই হারিয়ে যায়। 

মফস্বল সাংবাদিকতা যেন আজ এমন এক দণ্ড, যেখানে অপরাধের মুখোশ উন্মোচন করার একমাত্র পুরস্কার হলো পিঠের ওপর লাঠির আঘাত বা গলায় মিথ্যা মামলার ফাঁস।

চারণ সাংবাদিকদের কে দেবে শেষ আশ্রয়?

মফস্বল সাংবাদিকরা হলেন আমাদের সমাজদেহের প্রান্তিক স্নায়ুতন্ত্র। স্নায়ু সচল না থাকলে যেমন মানুষের শরীর প্যারালাইজড হয়ে যায়, ঠিক তেমনি মফস্বল সাংবাদিকতা বাঁচিয়ে না রাখলে পুরো দেশের গণতন্ত্র এবং সুশাসন পঙ্গু হতে বাধ্য।

বিজ্ঞাপনের করপোরেট টাকার ভাগ যেমন ঢাকার মিডিয়া হাউসগুলো পায়, তার একটি ন্যায্য অংশ মফস্বলের সাংবাদিকদেরও পাওয়া উচিত। এতে মিডিয়া মালিকদের সস্তা ও অমানবিক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। মফস্বল প্রতিনিধিদের নিয়মিত বেতন, চিকিৎসা ভাতা এবং পেশাগত নিরাপত্তার আইনি গ্যারান্টি দিতে হবে। রাষ্ট্রকেও বুঝতে হবে, সত্যকে খাঁচায় বন্দি করে কোনোদিন টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।

সেকালের মফস্বল সাংবাদিকতায় সম্পদের অভাব ছিল, কিন্তু সততা ও দায়বদ্ধতার কোনো খামতি ছিল না। আর একালের সাংবাদিকতায় প্রযুক্তির প্রাচুর্য আছে, কিন্তু নৈতিকতা ও নিরাপত্তার সংকট তীব্র। 

মফস্বল সাংবাদিকতা কেবল গ্রামীণ খবরের আদান-প্রদান নয়, এটি রাষ্ট্রব্যবস্থার ভারসাম্য বজায় রাখার একটি অন্যতম স্তম্ভ। তাই এই ক্ষেত্রটিকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে হলে সাংবাদিকদের অর্থনৈতিক মুক্তি, পেশাগত নিরাপত্তা এবং নৈতিক শিক্ষার বিকল্প নেই। সেকালের আদর্শ আর একালের প্রযুক্তি—এই দুয়ের সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে একটি সুস্থ, নির্ভীক ও আধুনিক মফস্বল সাংবাদিকতা।

পরিশেষে বলবো, কাঙাল হরিনাথের যে উত্তরাধিকার বুকে নিয়ে মফস্বল সাংবাদিকতার যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেই রক্ত যেন করপোরেট লোভ আর রাজনৈতিক হিংস্রতার নোংরা নর্দমায় হারিয়ে না যায়। 

মফস্বলের ওই ভাঙা সাইকেল আর সস্তা স্মার্টফোন হাতে চষে বেড়ানো মানুষগুলো যদি একদিন কলম থামিয়ে দেন, তবে বিশ্বাস করুন—পুরো বাংলাদেশ একটা বিশাল অন্ধকূপে পরিণত হবে। সেই অন্ধকার গ্রাস করার আগেই আমাদের জাগতে হবে।

কারণ, মফস্বল সাংবাদিকদের কলম থামা মানেই একটি অন্ধকার বাংলাদেশের সূচনা।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট। সহযোগী সম্পাদক, আজকের সূর্যোদয়, ঢাকা