যবিপ্রবি প্রতিনিধি: রাত তখন ১১টা ৪০ মিনিট। চারদিকে নিস্তব্ধতা। দিনের ব্যস্ততা শেষে আবাসিক হলের কক্ষে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন শিক্ষার্থীরা। কেউ স্বপ্ন দেখছিলেন আগামী দিনের, কেউ হয়তো পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন, আবার কেউ ক্লান্ত শরীর নিয়ে একটু নিশ্চিন্ত ঘুমের অপেক্ষায়।
কিন্তু মুহূর্তেই সেই স্বাভাবিক পরিবেশ রূপ নেয় এক বিভীষিকাময় নরকে। একের পর এক বোমা ও ককটেলের বিস্ফোরণ, গুলির শব্দ, আতঙ্কিত শিক্ষার্থীদের ছোটাছুটি, দরজা-জানালা ভাঙার আওয়াজ আর প্রাণ বাঁচানোর আকুতি সব মিলিয়ে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) শহীদ মসিয়ূর রহমান (শ.ম.র) হল পরিণত হয়েছিল এক ভয়াবহ সংঘর্ষস্থলে।
২০১৭ সালের ৫ অক্টোবর। আজ সেই ঘটনার ৯ বছর পূর্ণ হলো। সময়ের হিসাবে একটি দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেছে। ক্যাম্পাসে এসেছে নতুন প্রজন্ম, বদলেছে প্রশাসন, পাল্টেছে শিক্ষার্থীদের মুখ। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে ‘হল ডাকাতি’ নামে পরিচিত সেই রাতের ভয়াবহতা আজও অনেকের স্মৃতিতে দগদগে ক্ষত হয়ে আছে। যে হলে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ আবাসনের কথা, সেই হলেই সেদিন নিজেদের জীবন বাঁচাতে বিছানার নিচে, বন্ধ কক্ষের অন্ধকারে কিংবা অন্য ভবনের আশ্রয়ে লুকিয়ে থাকতে হয়েছিল তাদের। কেউ প্রাণভয়ে হল থেকে লাফিয়ে পড়েছিলেন, কেউ পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন শিক্ষক ডরমেটরিতে। আর কারও কপালে জুটেছিল নির্মম শারীরিক নির্যাতন।
যেভাবে শুরু হয়েছিল সেই বিভীষিকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে অন্যতম কলঙ্কজনক এই ঘটনার নেপথ্যে ছিল তৎকালীন যবিপ্রবি শাখা ছাত্রলীগের ২ শীর্ষ নেতা সভাপতি সুব্রত বিশ্বাস ও সাধারণ সম্পাদক শামীম হাসানের মধ্যকার রাজনৈতিক বলয়, গ্রুপ পরিবর্তন এবং ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্ব।
সংশ্লিষ্ট সূত্র ও সমসাময়িক সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, কমিটির শুরুতে সুব্রত বিশ্বাস ও শামীম হাসান দুজনই যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদার এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি বদিউজ্জামান সোহাগ ও সাইফুর রহমানের অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
এমনকি ২০১৪ সালে যবিপ্রবি শিক্ষার্থী নাইমুল ইসলাম রিয়াদ হত্যা মামলায় আসামি হিসেবে ২ জনকে একসঙ্গে কারাবরণও করতে হয়।
তবে ২০১৭ সালের শুরুতে শামীম হাসান কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় রাজনৈতিক বলয় পরিবর্তন করে তৎকালীন সংসদ সদস্য কাজী নাবিল আহমেদ এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেনের অনুসারী হন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে তখন জানা যায়।
এরপর থেকেই দুইপক্ষের মধ্যে ক্ষমতা ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দূরত্ব বাড়তে থাকে। ওই বছরের মে মাসে সুব্রত বিশ্বাসের নেতৃত্বে শামীম গ্রুপকে ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত করা হয় বলে জানা যায়।
দুইপক্ষের এ বিরোধের নেপথ্যে রাজনৈতিক প্রভাবের পাশাপাশি টেন্ডারের অর্থের ভাগ-বাঁটোয়ারার বিষয়টিও তখন উঠে আসে। সুব্রত বিশ্বাসের এক বিশ্বস্ত অনুসারীর সূত্রে এমন অভিযোগ পাওয়া গিয়েছিলো।
এর কয়েক মাস পর সেই বিরোধের ভয়াবহ পরিণতি প্রত্যক্ষ করে বিশ্ববিদ্যালয়। ৫ অক্টোবর রাতে শামীম হাসান ও তার অনুসারীদের নেতৃত্বে বহিরাগতদের নিয়ে হলে হামলা, ভাঙচুর, মারধর এবং শিক্ষার্থীদের মূল্যবান সামগ্রী লুটের অভিযোগ ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে রাতটি পরিচিতি পায় ‘হল ডাকাতি’ নামে।
কয়েক ঘণ্টার নারকীয়তা
তৎকালীন প্রত্যক্ষদর্শী ও নিরাপত্তাকর্মীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ঘটনার দিন রাত আনুমানিক ১১ টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে এসে দাঁড়ায় ৩-৪টি কালো মাইক্রোবাস। গাড়ি থেকে নেমে আসে মুখোশধারী একদল ব্যক্তি। প্রধান ফটকে দায়িত্ব পালনরত ২ আনসার সদস্যকে মারধর করে তাঁদের মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এরপরই শুরু হয় আতঙ্কের সেই রাত।
কিছুক্ষণের মধ্যেই বোমা ও ককটেল বিস্ফোরণের বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে শহীদ মসিয়ূর রহমান হল। অভিযোগ অনুযায়ী, তৎকালীন শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শামীম হাসান ও তার অনুসারীদের সঙ্গে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ জন বহিরাগত ব্যক্তি মুখে মাস্ক ও কালো কাপড় বেঁধে হলে প্রবেশ করেন। তাদের অনেকের হাতে ছিল আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র। হলে প্রবেশের পর কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলিও ছোড়া হয় বলে তৎকালীন প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।
এরপর শুরু হয় কক্ষ থেকে কক্ষে তাণ্ডব। ভাঙা হয় দরজা ও লকার। শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, নগদ টাকা ও অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র লুটের অভিযোগ ওঠে। বাধা দিতে গিয়ে মারধরের শিকার হন আবাসিক শিক্ষার্থীরা। কেউ আহত হয়ে মেঝেতে পড়ে থাকেন, কেউ আতঙ্কে কক্ষ ছেড়ে পালিয়ে যান। নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে শিক্ষার্থীদের ছোটাছুটিতে মুহূর্তেই বদলে যায় পুরো হলের পরিবেশ।
সেদিনের সহিংসতায় তৎকালীন শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি সুব্রত বিশ্বাসসহ প্রায় ৩০ থেকে ৪০ জন শিক্ষার্থী আহত হন বলে প্রাথমিকভাবে জানা যায়। তাদের মধ্যে কয়েকজন গুরুতর আহত হন।
বিছানার নিচে লুকিয়ে জীবন বাঁচানোর চেষ্টা
তৎকালীন সেই রাতের ভয়াবহতা স্মৃতিচারণ করে হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মোহাম্মাদ ফিরোজ তখন বলেছিলেন, গভীর রাতে তিনি ও তার রুমমেট হিমু হঠাৎ বোমা ও ককটেল বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পান। এরপর হলে শুরু হয় চিৎকার-চেঁচামেচি ও আতঙ্ক। পরিস্থিতি বুঝতে না পেরে তারা নিচতলার ১২২ নম্বর কক্ষে আশ্রয় নিয়েছিলেন। গুলি ও বিস্ফোরণের শব্দে ভয়ে বিছানার নিচে শুয়ে থাকেন দুজন।
পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে বাইরে এসে তারা জানতে পারেন, হামলাকারীরা বিভিন্ন কক্ষ থেকে মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ ও নগদ টাকা নিয়ে গেছে। নিজেদের কক্ষে ফিরে গিয়ে দেখেন, লকার ভেঙে দুটি ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগে থাকা নগদ টাকা নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
ফিরোজ বলেন, পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্তদের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তার জন্য আবেদন চাইলেও আবেদন করার পরও তার মতো অনেক শিক্ষার্থী কোনো সহযোগিতা পাননি ।
চতুর্থ তলার আরেক ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর বর্ণনা আরও ভয়াবহ। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই রাতে তৃতীয় ও পঞ্চম তলায় সবচেয়ে বেশি ভাঙচুর ও তাণ্ডব চালানো হয়। তাকে এবং তার কক্ষে থাকা এক জুনিয়র শিক্ষার্থীকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করে মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ ও নগদ টাকা নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, প্রাণ বাঁচাতে অনেক শিক্ষার্থী লুঙ্গি পরে খালি গায়ে দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলা থেকে লাফ দিয়ে নিচে নেমেছিলেন। কেউ কেউ হল ছেড়ে পালিয়ে শিক্ষক ডরমেটরিতে আশ্রয় নেন।
তাদের অভিযোগ, ঘটনার পর প্রক্টরের কাছে বিভিন্ন মাধ্যমে সহযোগিতা চেয়েও তাৎক্ষণিক সহায়তা পাননি। পরবর্তীতে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা বলা হলেও তারা সেই সহায়তা পাননি। এমনকি ভুক্তভোগীদের জন্য ডাইনিংয়ে এক মাসের বিনা মূল্যে খাবারের বরাদ্দের অর্থও পরবর্তী ছাত্রলীগ সভাপতি সুব্রত বিশ্বাস ভাগ করে নিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছিলেন ওই শিক্ষার্থী। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে তৎকালীন সময়ে সুব্রত বিশ্বাসের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
জাগো নিউজের সমসাময়িক প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলায় ৩০ লাখ টাকার ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন, আইফোন ও হাতঘড়ি, ১ লাখ ২০ হাজার টাকা নগদ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১০ লাখ টাকার সম্পদের ক্ষতি হয়। সব মিলিয়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৪১ লাখ ২০ হাজার টাকা। যা মামলাটি বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে রেকর্ড করা হয়েছিল।
লোহার পাইপের আঘাতে ভেঙেছিল পায়ের হাড়
সেই রাতের সহিংসতা শুধু সম্পদ লুট বা ভাঙচুরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন বহু শিক্ষার্থী। তাদের একজন এফএমবি বিভাগের শিক্ষার্থী।
তার অভিযোগ, হামলাকারীরা তাকে লোহার পাইপ দিয়ে নির্মমভাবে পেটান। এতে তার পায়ের হাড় সম্পূর্ণ ভেঙে যায়।
আহত অবস্থায় চিকিৎসা ও আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন হলেও প্রথমদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা পাননি বলে জানিয়েছিলেন তিনি। পরে তার মা একাধিকবার প্রক্টর ও প্রভোস্ট অফিসে যোগাযোগ করে আবেদন করলে যৎ সামান্য আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছিলো।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে আসা একজন শিক্ষার্থীকে যখন নিজের ক্যাম্পাসেই লোহার পাইপের আঘাতে পায়ের হাড় ভাঙার যন্ত্রণা নিয়ে দিন কাটাতে হয়, তখন সেই আঘাত কেবল শরীরে সীমাবদ্ধ থাকে না। নিরাপত্তা, আস্থা ও শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ নিয়েও তৈরি হয় গভীর প্রশ্ন।
ক্ষতিপূরণ নিয়ে ভিন্ন বক্তব্য
ঘটনার পর তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহযোগিতা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তৎকালীন শহীদ মসিয়ূর রহমান হলের প্রভোস্ট ইকবাল কবির জাহিদ জানান, ক্ষতিগ্রস্ত আনুমানিক ৯০ থেকে ৯৫ জন শিক্ষার্থী আবেদন করেছিলেন। মেডিকেল সার্টিফিকেট ও অন্যান্য কাগজপত্র যাচাই করে নিয়ম অনুযায়ী তাদের সহযোগিতা দেওয়া হয়েছিল।
তবে তৎকালীন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের একাংশের অভিযোগ, আবেদন করেও তারা প্রত্যাশিত সহায়তা পাননি। কেউ কোনো সহায়তাই পাননি, আবার কেউ পেয়েছেন যৎসামান্য অর্থ। ফলে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রশাসনিক দাবি এবং বাস্তবে শিক্ষার্থীদের প্রাপ্তির মধ্যে পার্থক্য নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেনের বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনার পর এক মাস শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যে খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল এবং আর্থিক ক্ষতিপূরণও দেওয়া হয়েছিল। তবে মোট কত টাকা দেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে তার সুনির্দিষ্ট হিসাব মনে নেই। প্রভোস্ট ও প্রক্টর অফিসে এ-সংক্রান্ত হিসাব ও তালিকা রয়েছে বলে তিনি জানিয়েছিলেন।
বিচারহীনতার দীর্ঘ প্রশ্ন
সমসাময়িক সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শুধু মামলা করেই থেমে থাকেনি; অভ্যন্তরীণ তদন্তের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। তবে তদন্ত প্রক্রিয়াও বাধার মুখে পড়ে। ২০১৭ সালের ২৮ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের রিজেন্ট বোর্ডের সভায় তদন্ত কমিটির আহ্বায়কের পদত্যাগের কারণে কমিটি পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পুনর্গঠিত ৫ সদস্যের কমিটির আহ্বায়ক করা হয় জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জিয়াউল আমিনকে। কমিটিতে যশোর জেলা প্রশাসন, পুলিশ সুপার ও রিজেন্ট বোর্ডের প্রতিনিধিদেরও রাখা হয়েছিল।
এ ঘটনায় আবাসিক হলে হামলা ও ডাকাতির অভিযোগে সাত শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। পাশাপাশি তাদের এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৩০ থেকে ৪০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
এই বিষয়ে তৎকালীন প্রক্টর অধ্যাপক শেখ মিজানুর রহমান বলেন, ঘটনার রাতে আনুমানিক সাড়ে এগারোটার দিকে আমি জানতে পেরে কয়েকজন শিক্ষক ও নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে ক্যাফেটেরিয়ার সামনে গিয়ে দেখি পুলিশের ২ জন এএসপিসহ আরও পুলিশ সদস্য সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত। আমরা জানতে পারলাম ছাত্রলীগের সুব্রত গ্রুপ বের হয়ে গেছে এবং শামীম গ্রুপ হল দখলে নিয়েছে। ঐ সময় আমরা হলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিলে তৎকালীন উপাচার্য আনোয়ার স্যার আমাকে ফোন করে পুলিশের সহয়তা ছাড়াই হলে প্রবেশ করতে বলেন। পেশাগত দায়িত্ব পালনে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই তখন পুলিশ বাহিনীকে ছাড়া আমরা হলে প্রবেশ করেছিলাম।
হলে প্রবেশের পর ছাত্রলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক শামীমকে হল থেকে আমি চলে যেতে বললে, ঘণ্টা দু'য়েক সময় নিয়ে হল থেকে বেরিয়ে যায়। ঘটনাস্থলে তারা যেই গাড়িগুলো নিয়ে আসছিল তার ড্রাইভারদের পাওয়া যাচ্ছিল না, তখন পুলিশ সদস্যের মধ্যে যারা ড্রাইভিং জানে তাদের সহযোগিতায় ওরা ক্যাম্পাস ত্যাগ করে। পুলিশের উপস্থিতিতে এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সম্মতিতে এই কাজটি করা হয়েছিল। এই সকল নির্দেশনাই তৎকালীন উপাচার্য স্যারের কাছ থেকেই এসেছিল। আমি পরে এই বিষয়টা শুনেছি যে, তারা যাওয়ার সময় নাকি বেশ কিছু ল্যাপটপ, মোবাইলসহ মূল্যবান জিনিস নিয়ে চলে যায়। বিষয়টা আমি নিজ চোখে দেখিনি, আমার কাছে তখন এরকম কোনো তথ্যও ছিল না। যদি থাকতো আমি অবশ্যই বাঁধা দিতাম।
তবে এই বিষয়ে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন বলেন ঐ রাতে আমার সাথে প্রথম কথা হয় যশোরের তৎকালীন এএসপি রব্বানীর। তারা আমাকে বলেছিল যে আমি যেন তাদেরকে হলে প্রবেশ করার অনুমতি দেই, যাতে তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। আমি তো পুলিশকে একা ছাত্র হলে ঢুকতে দিতে পারি না, তাই আমি প্রক্টরকে বলি তাদের সাথে হলে ঢুকতে।
কিন্তু তখন প্রক্টর এই বিষয়ে তাদেরকে কোনো সাহায্য করেনি এবং সে ঘটনাস্থলে যেতে রাজি হননি। তাকে আমি পুলিশ ছাড়া একা হলে যেতে বলেছি এই কথাটি মিথ্যা। কারণ হলের সমস্যার সমাধান করবে হল প্রভোস্ট সেখানে প্রক্টর একা কেন হলে যাবে। আমি কখনও তাকে একা যেতে বলিনি বরং আমি তাকে বলেছিলাম সে যেন পুলিশের সাথে হল প্রভোস্টকে সাথে নিয়ে হলে যায় তাও সেটা এএসপি রব্বানীর ফোনে ।
প্রশ্নের মুখে প্রশাসনের ভূমিকা
তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক শামীম হাসান হল ডাকাতি ও শিক্ষার্থীদের মালামাল লুটের অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন।
তার দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য ও হল প্রভোস্টের সঙ্গে আগেই আলোচনা করে তারা ক্যাম্পাসে এসেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে হলে তাদের আবাসিক আসনও ছিল। ঘটনার দিন রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে তারা হলে প্রবেশ করেন।
শামীমের ভাষ্য অনুযায়ী, গভীর রাতে পরিস্থিতির অবনতি হলে তৎকালীন উপাচার্যের নির্দেশে পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহযোগিতায় তারা ক্যাম্পাস ত্যাগ করেন।
তার দাবি, তারা কারও কোনো মালামাল লুট বা ছিনতাই করেননি। এমনকি এ বিষয়ে তাদের বিরুদ্ধে কেউ থানায় অভিযোগ করেছেন বলেও তার জানা নেই। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পক্ষপাতের কারণে তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ ও মামলা দেওয়া হয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন শামীম হাসানের সঙ্গে ঘটনার দিন তার যোগাযোগের বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে দাবি করেন। তিনি জানান, ঘটনার রাতে তিনি বগুড়ায় ছিলেন।
এদিকে তৎকালীন শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি সুব্রত বিশ্বাসের সঙ্গে তখন যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য তখন পাওয়া যায়নি।
তার এক বিশ্বস্ত অনুসারীর সূত্রে জানা গিয়েছিল, তৎকালীন টেন্ডারের অর্থের ভাগ-বাঁটোয়ারাকে কেন্দ্র করে দুই গ্রুপের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীতে স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতার সহযোগিতায় শামীম গ্রুপকে ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত করা হয়। এরপর ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তার ও ছাত্র হল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার উদ্দেশ্যে শামীম গ্রুপ হামলা চালায় বলে ওই সূত্রের দাবি।
এ ঘটনায় সহযোগিতার অর্থ আত্মসাৎ বা ভাগ-বাঁটোয়ারার অভিযোগও সামনে আসে। বিশেষ করে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দকৃত খাবারের অর্থ তৎকালীন সভাপতি সুব্রত বিশ্বাস ভাগ করে নিয়েছেন বলে কয়েকজন শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন। তবে এ অভিযোগের স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
৯ বছর পরও যে প্রশ্নগুলোর উত্তর মেলেনি
২০১৭ সালের ৫ অক্টোবরের সেই ঘটনা শুধু একটি ছাত্রসংগঠনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের পরিণতি ছিল না; এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, প্রশাসনিক দায়িত্বশীলতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের ভয়াবহ চিত্র সামনে এনেছিল। একটি আবাসিক হলে কীভাবে বহিরাগতরা প্রবেশ করল? কীভাবে একাধিক মাইক্রোবাস নিয়ে হামলাকারীরা ক্যাম্পাসে ঢুকে পড়ল? বিস্ফোরণ ও গুলির শব্দের মধ্যেও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাৎক্ষণিক কার্যকর ব্যবস্থা কতটা নেওয়া হয়েছিল? ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বরাদ্দকৃত সহায়তা সবাই পেয়েছিলেন কি না? আর সেই ঘটনার বিচার ও মামলার সর্বশেষ পরিণতিই বা কী?
বর্তমান প্রশাসন যা বলছে
হল ডাকাতির এই ঘটনা সম্পর্কে যবিপ্রবির বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইয়ারুল কবীর বিষয়টি সম্পর্কে অবগত থাকার কথা জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, পূর্বের তদন্ত প্রতিবেদন এবং মামলার কাগজপত্র পর্যালোচনা করতে হবে। সবকিছু জেনে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বর্তমান প্রশাসনের এই বক্তব্য নতুন করে সেই পুরনো ঘটনার নথিপত্র সামনে আনার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
৯ বছর আগে যে শিক্ষার্থীরা প্রাণভয়ে বিছানার নিচে আশ্রয় নিয়েছিলেন, যারা লোহার পাইপের আঘাতে পায়ের হাড় হারিয়েছিলেন, যারা নিজেদের কক্ষ থেকে লুট হয়ে যাওয়া জিনিসপত্রের জন্য প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছিলেন তাদের কাছে ৫ অক্টোবর কেবল একটি তারিখ নয়। এটি জীবনের এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা ।
৫ অক্টোবর তাই যবিপ্রবির ইতিহাসে শুধু একটি সহিংস রাতের নাম নয়; এটি শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক আধিপত্যের নামে সহিংসতা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাহীনতার এক নির্মম স্মারক।
—জা. অর্থনীতি/এনজে