জাতীয় অর্থনীতি সারাবাংলা: নেত্রকোনার মদন উপজেলার বাগজান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে নদীভাঙন থেকে রক্ষায় প্রায় ২০ লাখ টাকার প্রকল্পের কাজে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ভেজা বালু দিয়ে জিও-ব্যাগ তৈরি, শক্ত কাঠের বল্লার পরিবর্তে গাছের ডাল ব্যবহার এবং প্রাক্কলন অনুযায়ী মালামাল না দেওয়ার অভিযোগে ঠিকাদার ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক উপসহকারী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন হোসাইন কবির নামে এক ব্যক্তি। অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীকে নির্দেশ দিয়েছেন জেলা প্রশাসক।
লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মগড়া নদীর ভাঙন থেকে বিদ্যালয়টি রক্ষায় ৮০ মিটার অংশে জরুরি ভাঙন প্রতিরোধকাজের জন্য ১৯ লাখ ৮২ হাজার ২৮২ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রকল্পের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ১২ মিটার দীর্ঘ ১৩টি শক্ত কাঠের বল্লা, ৮০ মিটারজুড়ে অন্তত ৩৯টি ব্যারাক বাঁশের পাইলিং, নাট-বল্টু দিয়ে ওয়ালিং পিস আটকানো এবং নির্ধারিত ওজনের জিও-ব্যাগ নদীতে ফেলার কথা ছিল।
অভিযোগে বলা হয়েছে, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে এবং প্রাক্কলন উপেক্ষা করে কাজ করেছেন ঠিকাদার। শুকনো বালুর পরিবর্তে ভেজা বালু ব্যবহার, শক্ত কাঠের বল্লার বদলে মেহগনি গাছের ডাল দিয়ে পাইলিং এবং নির্ধারিত পরিমাণে মালামাল না দেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। তদারকির দায়িত্বে থাকা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী মুস্তাফিজুর রহমানের যোগসাজশে এসব অনিয়ম হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কাজ চলাকালে অনিয়মের অভিযোগ তুলে স্থানীয় ইউপি সদস্যের মাধ্যমে একবার কাজ বন্ধ করা হয়েছিল। তবে প্রাক্কলন গোপন রেখে ঠিকাদার নিজের মতো করে কাজ শেষ করেছেন বলে অভিযোগ তাদের। সরেজমিনে দেখা যায়, প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে। তবে কাজের মান ও অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।
বাগজান গ্রামের আশরাফুল ইসলাম আকন্দ বলেন, বিদ্যালয় রক্ষায় প্রকল্প নেওয়ার খবর শুনে এলাকাবাসী খুশি হয়েছিলেন। কিন্তু ঠিকাদার স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে নিজের মতো করে কাজ করায় ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় পুতুল মিয়া বলেন, বিদ্যালয় রক্ষার প্রকল্পটি নিয়ে এলাকার মানুষের অনেক আগ্রহ ছিল। কিন্তু অনিয়ম করে কাজ করায় তারা হতাশ হয়েছেন। সরকারি অর্থ ব্যয় করে এমন কাজ করা উচিত হয়নি।
তিয়শ্রী ইউনিয়নের ইউপি সদস্য আব্দুল্লাহ বলেন, কাজটিতে অনেক ফাঁক রয়েছে। ঠিকাদার একদিন তাকে একটি বালুর বস্তা ওজন করে দেখিয়েছিলেন। বস্তাটিতে ২৮০ কেজি বালু ছিল। তবে জিও-ব্যাগে ভেজা বালু ব্যবহার করা হয়েছে।
অভিযোগকারী হোসাইন কবির বলেন, বিদ্যালয় রক্ষার প্রকল্পে নিয়ম মানা হয়নি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী মুস্তাফিজুর রহমান টাকার বিনিময়ে ঠিকাদারকে সহযোগিতা করেছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও কার্যকর ব্যবস্থা দাবি করেন হোসাইন কবির।
তবে ঠিকাদারের প্রতিনিধি উজ্জ্বল তালুকদার অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে তাদের জানানো হয়েছে, জেলা প্রশাসক অভিযোগ পেয়ে তাদের ডেকেছেন। তবে তারা কাজে কোনো অনিয়ম করেননি বলে দাবি করেন তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে উপসহকারী প্রকৌশলী মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, কোনো প্রকল্প দেওয়ার ক্ষমতা তার নেই। এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী কথা বলতে পারবেন।
বাগজান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাদেকুর রহমান বলেন, জিও-ব্যাগ নদীতে ফেলার সময় ঠিকাদার তাকে বা বিদ্যালয়ের পিয়নকে ডেকেছিলেন। তবে এর আগে ব্যবহৃত বল্লাসহ অন্যান্য উপকরণ পরিবর্তন করা হয়নি। জিও-ব্যাগে ভেজা বালু দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এ বিষয়ে নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, বাগজান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রক্ষার প্রকল্পে অনিয়মের বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছেন তিনি। অভিযোগটি তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীকে ইতোমধ্যে বলা হয়েছে।
—জা. অর্থনীতি/এলএটি