জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক:
একদল ঋণ নিয়ে ফেরত দিল না। ব্যাংকের টাকা নিয়ে হলো অনিয়ম। দুর্বল হয়ে পড়ল দেশের আর্থিক খাত। আর এখন সেই ব্যাংক বাঁচাতে আগামী আট বছরে খরচ হতে পারে ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা! কিন্তু এই টাকা আসবে কোথা থেকে? আর যাদের অনিয়মে ব্যাংক আজ সংকটে, তাদের দায় কতটুকু? নাকি শেষ পর্যন্ত সব বোঝা বইতে হবে সাধারণ মানুষকেই?
ব্যাংক খাতের সংকট কতটা বড়?
সংকটের গভীরতা বুঝতে তাকাতে হবে, একটি সংখ্যার দিকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশই খেলাপি। অর্থাৎ, ব্যাংক থেকে দেওয়া প্রতি ১০০ টাকা ঋণের মধ্যে প্রায় ৩৩ টাকাই নির্ধারিত নিয়মে ফেরত আসছে না।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, মোট খেলাপি ঋণের ৭২ শতাংশের বেশি কেন্দ্রীভূত মাত্র ১০টি ব্যাংকে। অনিয়ম, দুর্বল তদারকি ও ঋণ আদায়ে ব্যর্থতা ব্যাংক খাতের সংকটকে আরও গভীর করেছে।
বছরে ৬০ হাজার কোটি টাকা, আট বছরে কত?
এই সংকট কাটাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের হিসাব আরও বড়। গত ১০ অক্টোবর তিনি জানান, ব্যাংক খাত পুনরুদ্ধারে আগামী পাঁচ থেকে আট বছর প্রতিবছর ৬০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে।
অঙ্কটা সহজ করে বুঝুন। পাঁচ বছর ধরে এই অর্থ ব্যয় হলে মোট দাঁড়াবে ৩ লাখ কোটি টাকা। আর আট বছর হলে ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেটের তুলনায় বছরে ৬০ হাজার কোটি টাকা প্রায় ৬ দশমিক ৪ শতাংশ।
অর্থাৎ, বিপুল এই অর্থের জোগান দিতে হবে এমন এক সময়ে, যখন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষার মতো খাতেও সরকারের ব্যয়ের প্রয়োজন রয়েছে।
জনগণ টাকা দিলে লাভটা কী?
ব্যাংক খাতের এই ক্ষতি মেটাতে সরকারি অর্থ ব্যবহার হলে তার প্রভাব পড়তে পারে পুরো অর্থনীতিতে। কারণ, বাজেটের অর্থ আসে কর ও অন্যান্য সরকারি রাজস্ব থেকে; ঘাটতি মেটাতে ঋণও নিতে হয়। তাই ব্যাংক উদ্ধারে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হলে অন্য খাতের বরাদ্দ ও সরকারি ঋণের চাপের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
তবে এখানে একটি বিষয় জেনে রাখা জরুরি। ৬০ হাজার কোটি টাকা মানেই প্রত্যেক নাগরিককে সরাসরি জরিমানা দেওয়া নয়। এটি ব্যাংক খাত পুনরুদ্ধারে বাজেট থেকে সম্ভাব্য অর্থায়নের হিসাব। আর মাথাপিছু প্রায় ৩ হাজার ৪৩২ টাকার হিসাবটি মোট সম্ভাব্য ব্যয় জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে পাওয়া যায়; এটি কোনো ব্যক্তির ওপর নির্ধারিত কর নয়।
তাহলে জনগণের টাকা খরচ হলে বিনিময়ে কী নিশ্চিত হবে? আমানতকারীর নিরাপত্তা, ব্যাংকের জবাবদিহি, নাকি আবারও অনিয়মের সুযোগ?
বিশ্বব্যাংকের টাকা কি নেই?
ব্যাংক খাত সংস্কারে বিদেশি সহায়তা একেবারেই নেই, বিষয়টি তেমন নয়। ২০২৬ সালের ২৪ জুন বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের আর্থিক খাত শক্তিশালী করতে ৪৫ কোটি ডলারের অর্থায়ন অনুমোদন করেছে। এই কর্মসূচির লক্ষ্য আমানতকারীদের সুরক্ষা বাড়ানো, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা শক্তিশালী করা এবং দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠনের প্রস্তুতি নেওয়া।
তবে এই অর্থায়ন আর ব্যাংকের সব পুরোনো ক্ষতি পূরণের অর্থ, এক নয়। অর্থাৎ, সংস্কারে বিদেশি সহায়তা থাকলেও পুরো সংকট সামাল দিতে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নের প্রয়োজন হতে পারে।
শুধু টাকা ঢাললেই কি ব্যাংক ঠিক হবে?
ব্যাংকের ঘাটতি পূরণ করলেই সংকটের সমাধান হবে না। ঋণ আদায়, পরিচালনায় স্বচ্ছতা, অনিয়মের বিচার এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা ঠেকানোর ব্যবস্থা না থাকলে নতুন করে সংকট তৈরি হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকও বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের দুর্বল পরিচালনা, প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের সুবিধা এবং নিয়ন্ত্রক তদারকির ঘাটতিকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো সংকটের পর খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকে মূলধন জোগান এবং দুর্বল প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠনে বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়েছিল। এ থেকে শিক্ষা হলো, শুধু আর্থিক সহায়তা নয়-ব্যবস্থার পরিবর্তনও জরুরি।
লুটের টাকা উদ্ধার হবে কীভাবে?
ব্যাংক খাতের ক্ষতি সামাল দিতে জনগণের করের অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি অনিয়মের মাধ্যমে সরিয়ে নেওয়া অর্থ উদ্ধারের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। যাদের বিরুদ্ধে ঋণ জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ বা অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী তদন্ত, বিচার এবং সম্পদ পুনরুদ্ধারের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
সম্পদ জব্দ বা অবরুদ্ধ করার আদেশ দেওয়া আর সেই অর্থ বাস্তবে উদ্ধার করে সরকারি কোষাগার বা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে ফেরত আনা এক বিষয় নয়। তাই কত সম্পদ শনাক্ত হলো, কতটা ফেরত এল এবং সেই অর্থ কোথায় ব্যবহার হলো-এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা জরুরি।
জনগণের টাকার বিনিময়ে কী নিশ্চয়তা চাই?
ব্যাংক খাত বাঁচানো জরুরি। কারণ, ব্যাংক দুর্বল হলে ক্ষতিগ্রস্ত হন আমানতকারী, ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী-শেষ পর্যন্ত পুরো অর্থনীতি। কিন্তু সেই খাত পুনরুদ্ধারে জনগণের অর্থ ব্যয় হলে শুধু টাকা দেওয়ার হিসাব দিলেই চলবে না। কত টাকা খরচ হলো, কত ঋণ উদ্ধার হলো, কার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলো এবং ভবিষ্যতে অনিয়ম ঠেকাতে কী বদল আনা হলো-প্রতিটি প্রশ্নের উত্তরও দিতে হবে সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে।
ব্যাংক বাঁচাতে জনগণের অর্থ ব্যয় হতে পারে। কিন্তু সেই অর্থের বিনিময়ে জনগণকে পেতে হবে নিরাপদ আমানত, স্বচ্ছ ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর জবাবদিহি। নইলে আজকের সংকট সামাল দিতে গিয়ে আগামী দিনের জন্য একই সমস্যার বোঝা রেখে যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।
আপনাদের সঙ্গে ছিলাম চন্দ্রা বিশ্বাস ববি। ফিরবো আবারও নতুন কোনো তথ্য নিয়ে। ততোক্ষণ পর্যন্ত ভালো থাকুন, জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে থাকুন।
ব্যাংক বাঁচাতে ৪.৮ লাখ কোটি টাকা, দায় নেবে কে?
ব্যাংক খাত পুনরুদ্ধারে আগামী পাঁচ থেকে আট বছর প্রতিবছর ৬০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু এই বিপুল অর্থের জোগান কোথা থেকে আসবে? অনিয়মের দায়ীদের কাছ থেকে কত টাকা উদ্ধার হবে? আর জনগণের করের অর্থ ব্যয়ের বিনিময়ে কী নিশ্চিত হবে?
—জা. অর্থনীতি/এলএটি