জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক:
দীর্ঘ ১০ মাসের জটিলতা ও প্রতীক্ষার অবসান ঘটে অবশেষে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের জন্য এলো এক স্বস্তিদায়ক সুখবর। বহুল কাঙ্ক্ষিত দশম গ্রেড অনুযায়ী প্রধান শিক্ষকদের বেতন নির্ধারণ পদ্ধতি এখন সরাসরি ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা আইবাস ডাবল প্লাস সফটওয়্যারে যুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এর ফলে এতদিন পদটি দশম গ্রেডে উন্নীত থাকা সত্ত্বেও নানা প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত জটিলতায় যারা আগের স্কেলেই বেতন পাচ্ছিলেন, তারা এবার পূর্ণাঙ্গ দশম গ্রেডের আর্থিক সুবিধা পেতে যাচ্ছেন।
আদেশের বিস্তারিত অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার ৬ অক্টোবর অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের বাস্তবায়ন-২ অনুবিভাগ থেকে এই সংক্রান্ত একটি সরকারি নির্দেশপত্র জারি করা হয়েছে। সিনিয়র সহকারী সচিব ফাতেমাতুজ জোহরা স্বাক্ষরিত এই চিঠিতে জানানো হয়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১১তম গ্রেডভুক্ত প্রধান শিক্ষকদের বেতন দশম গ্রেডে নির্ধারণের কার্যক্রম দ্রুত শেষ করতে আইবাস ডাবল প্লাস সফটওয়্যারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এই নির্দেশনার মাধ্যমে প্রশাসনিক সব বাধা আনুষ্ঠানিকভাবে দূর হলো।
প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আদালতের রায় ও দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে গত ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে প্রধান শিক্ষকদের পদটি দশম গ্রেডে উন্নীত করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল। তবে প্রজ্ঞাপন হলেও বেতন সফটওয়্যারে এই গ্রেড অন্তর্ভুক্ত না থাকায় শিক্ষকরা তাদের নতুন স্কেলের অর্থ থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলেন। অবশেষে অর্থ বিভাগের এই নতুন আদেশের মাধ্যমে দীর্ঘ ১০ মাস পর বেতন পাওয়ার পুরো পথ পরিষ্কার হয়ে গেল।
বেতন কাঠামোর পরিবর্তনটি শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তায় বড় পরিবর্তন আনবে। আদালতের আদেশের পর নতুন বেতন স্কেল অনুযায়ী দশম গ্রেডে উন্নীত হওয়ার পর একজন প্রধান শিক্ষকের শুরুর মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ৩২ হাজার টাকা, যা ধাপে ধাপে সর্বোচ্চ ৭৭ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছাবে। এর আগের সাধারণ বেতন স্কেলের হিসাবে দশম গ্রেডে শুরুর বেতন ছিল ১৬ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ছিল ৩৮ হাজার ৬৪০ টাকা।
দশম গ্রেডে উন্নীত হওয়ার আগে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা পদভেদে ১১তম ও ১২তম গ্রেডে বেতন পেতেন। পুরোনো স্কেল অনুযায়ী ১১তম ও ১২তম গ্রেডে মূল বেতন শুরু হতো যথাক্রমে ১২ হাজার ৫০০ টাকা ও ১১ ৩০০ টাকা থেকে। পরবর্তীতে নতুন বেতন কাঠামোতে ১১তম গ্রেডে শুরুর মূল বেতন দাঁড়ায় ২৫ হাজার টাকা এবং ১২তম গ্রেডে ২৪ হাজার ৩০০ টাকা। সেই তুলনায় এবার সরাসরি দশম গ্রেডে আইবাস ডাবল প্লাসের সুবিধা পাওয়ায় প্রধান শিক্ষকদের বেতন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তবে এই সুখবরের মাঝেও একটি নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আদেশে। দীর্ঘ প্রায় ১০ মাস ধরে যে বকেয়া অর্থ জমেছে, তা শিক্ষকরা এককালীন পাবেন কি না-সে বিষয়ে প্রশাসনিক স্পষ্টীকরণ দেওয়া হয়েছে। আদেশে বলা হয়েছে, প্রশাসনিক মন্ত্রণালয় কর্তৃক সরকারি আদেশ বা জিও জারির তারিখের আগের সময়কালের কোনো আর্থিক বকেয়া প্রধান শিক্ষকরা প্রাপ্য হবেন না। অর্থাৎ জিও জারির পর থেকেই শিক্ষকরা এই বর্ধিত স্কেলের নগদ সুবিধা হিসাবভুক্ত করতে পারবেন।
অন্যদিকে প্রধান শিক্ষকদের এই পদোন্নতি ও বেতন বৃদ্ধির প্রভাব পড়ছে প্রাথমিক শিক্ষার সার্বিক কাঠামোর ওপর। বর্তমানে দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৫ হাজার ৫৬৯টি। এসব বিদ্যালয়ে সর্বমোট ৩ লাখ ৮০ হাজারের বেশি শিক্ষক কর্মরত আছেন। প্রধান শিক্ষকদের স্কেল জটিলতা মেটায় পুরো প্রাথমিক শিক্ষাঙ্গনে এক ধরনের কর্মোদ্দীপনা তৈরি হয়েছে।
প্রধান শিক্ষকদের এই অগ্রগতির পাশাপাশি সহকারী শিক্ষকদের বেতন গ্রেড নিয়েও দীর্ঘদিনের আলোচনা চলছে। সহকারী শিক্ষকরা বর্তমানে ১৩তম গ্রেডে রয়েছেন, যেখানে নতুন পে স্কেলে তাদের শুরুর মূল বেতন ২৪ হাজার টাকা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সহকারী শিক্ষকদের বেতন গ্রেড দুই ধাপ বাড়িয়ে ১১তম করার একটি প্রস্তাব প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জাতীয় বেতন কমিশনে পাঠানো হলেও সেখান থেকে কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। এছাড়া মন্ত্রিপরিষদ ও অর্থ বিভাগেও আলাদা প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল।
যদি সহকারী শিক্ষকদের বেতন ১১তম গ্রেডে উন্নীত করা হয়, তবে সরকারি কোষাগার থেকে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ৮৩১ কোটি ৯১ লাখ টাকা ব্যয় হবে। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত কোনো রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক অগ্রগতি হয়নি। তবে সম্প্রতি নতুন নিয়োগ পাওয়া প্রায় ১৪ হাজার সহকারী শিক্ষককে আগামী ১১ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে পদায়ন করা হচ্ছে, যা প্রাথমিক শিক্ষায় নতুন গতি এনে দেবে।
বকেয়া টাকা পাবেন না প্রধান শিক্ষকরা?
দীর্ঘ ১০ মাসের জট খুলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের দশম গ্রেডের বেতন আইবাস ডাবল প্লাস সফটওয়্যারে যুক্ত করার নির্দেশ দিল অর্থ মন্ত্রণালয়। আদালতের রায়ের পর গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর দশম গ্রেড পেলেও প্রযুক্তিগত জটিলতায় শিক্ষকরা বেতন পাচ্ছিলেন না। নতুন স্কেলে মূল বেতন ৩২ হাজার থেকে শুরু হয়ে ৭৭ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত হবে। তবে অর্থ বিভাগের স্পষ্ট বার্তা, সরকারি আদেশ জারির আগের কোনো মাসের বকেয়া টাকা শিক্ষকরা পাবেন না। আদেশ জারির পর থেকেই মিলবে বাড়তি বেতনের সুযোগ।
—জা. অর্থনীতি/এলএটি