গান্ধি বনাম গডসে: ভারতের গণতন্ত্র ও নির্বাচন নিয়ে নতুন বিতর্ক

জাতীয় অর্থনীতি আন্তর্জাতিক: মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা। অহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করে তিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পান। ভারতে তিনি ‘জাতির পিতা’ হিসেবে সম্মানিত। তবে স্বাধীনতার পরপরই তাঁর হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করে, দেশের সবাই তাঁর আদর্শের অনুসারী ছিলেন না।

১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি নয়াদিল্লির বিড়লা হাউসে একটি প্রার্থনা সভায় গান্ধিকে গুলি করে হত্যা করেন নথুরাম গডসে। ২০২২ সালের ২৪ জানুয়ারি বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গডসে ছিলেন চরম ডানপন্থি সংগঠন হিন্দু মহাসভার সদস্য। তাঁর অভিযোগ ছিল, গান্ধি মুসলিমদের প্রতি পক্ষপাত দেখিয়েছেন এবং পাকিস্তানের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। ১৯৪৯ সালের নভেম্বরে গডসের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

হিন্দু মহাসভায় যোগ দেওয়ার আগে গডসে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) সদস্য ছিলেন। আরএসএসের সঙ্গে ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) আদর্শগত সম্পর্ক রয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও দীর্ঘদিন এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পিএম ইন্ডিয়া ওয়েবসাইটের জীবনী অনুযায়ী, ১৯৭২ সালে তিনি আরএসএসের প্রচারক হন।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন আরএসএস গান্ধির হত্যাকারী গডসেকে প্রকাশ্যে গুরুত্ব দেয়নি। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গডসেকে দেশপ্রেমিক হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বলে সমালোচকেরা অভিযোগ করছেন। এ পরিস্থিতিতে ভারতের রাজনীতিতে গান্ধির বহুত্ববাদী ও অহিংস আদর্শের সঙ্গে গডসের উগ্র হিন্দুত্ববাদী চিন্তার সংঘাত নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

গান্ধির আদর্শে আন্দোলনে তরুণেরা

গত ৪ অক্টোবর সাংবাদিক অনিকেত চট্টোপাধ্যায় তাঁর এক পডকাস্টে বলেন, ভারতের সংবিধান, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ও গণতান্ত্রিক কাঠামো হুমকির মুখে। তাঁর মতে, এই পরিস্থিতিতে গান্ধির আদর্শ অনুসরণ করেই নতুন করে গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

এর আগে ২ অক্টোবর, গান্ধির জন্মদিনে মুম্বাইয়ের ঐতিহাসিক শিবাজি পার্কে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামে পরিচিত আন্দোলনকারীদের সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে সেখানে গান্ধির অহিংস আন্দোলনের কৌশল অনুসরণের আহ্বান জানান।

তাঁর বক্তব্য, গান্ধি মানুষকে ভোটাধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন করতে, নির্যাতন উপেক্ষা করে রাজপথে থাকতে এবং প্রয়োজনে কারাবরণ করতেও শিখিয়েছেন। এসব কৌশল অনুসরণ করেই দাবি আদায় করতে হবে বলে সমর্থকদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

এর আগে জুলাইয়ে ভারতের শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতি দমনে ব্যর্থতার অভিযোগে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করেছিল এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত তরুণেরা। আন্দোলনটি দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার পর সরকার তাদের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয় বলে লেখাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই সাফল্যের পর এবার আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবি ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ।

ভোটার তালিকা নিয়ে অভিযোগ, বাড়ছে বিতর্ক

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, জ্ঞানেশ কুমার যথাযথ কারণ ছাড়াই বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁদের দাবি, বাদ পড়া ব্যক্তিদের মধ্যে সংখ্যালঘু মুসলিম ভোটারের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। এর ফলে বিজেপি নির্বাচনে বাড়তি সুবিধা পেয়েছে বলে অভিযোগ করছেন বিরোধীরা।

গত ২৫ সেপ্টেম্বর দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে দুই নির্বাচন কমিশনারের লিখিত আপত্তির বিষয়টি তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনের শিরোনাম অনুযায়ী, ১০ মাসে ১৪ বার তাঁরা কমিশনের কার্যক্রম নিয়ে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছিলেন।

এ প্রতিবেদন প্রকাশের পর নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক আরও জোরালো হয়। কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলো আগে থেকেই ভোটার তালিকা থেকে বৈধ ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছিল। তবে বিজেপি এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।

আন্দোলনকারীরা জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করে ‘ইট ইজ ডান ব্রো’ স্লোগান তুলেছেন। এর অর্থ, ‘অনেক হয়েছে, এবার বিদায় নিন’। গত ৬ অক্টোবর বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একই বক্তব্য দিয়ে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করেন।

অন্যদিকে, বিজেপির বক্তব্য হলো, নির্বাচন কমিশন আইন ও বিধি মেনেই কাজ করছে। বিরোধীরা নির্বাচনে পরাজয়ের কারণে ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলছে বলে দাবি দলটির নেতাদের। ভোটার তালিকা সংশোধনের নিয়মে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি বলেও বিজেপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।

‘অপারেশন গঙ্গাজল’ নিয়েও বিতর্ক

ভারতের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ‘অপারেশন গঙ্গাজল’ শব্দবন্ধটিও। ১৯৮০-এর দশকে বিহারের ভাগলপুরে অপরাধী সন্দেহে আটক ব্যক্তিদের চোখে অ্যাসিড ঢেলে অন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে পুলিশের বিরুদ্ধে। সে সময় ঘটনাটি দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল।

বিবিসি বাংলার ২০১৯ সালের ২৯ নভেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিহার পুলিশের সদস্যরা সন্দেহভাজন অপরাধীদের চোখ সাইকেলের স্পোক দিয়ে ফুটো করে তাতে অ্যাসিড ঢেলে দিতেন। নির্যাতনের সময় অ্যাসিডকে ‘গঙ্গার পবিত্র জল’ বলে উল্লেখ করা হতো। ঘটনাটি নিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধিও উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।

তবে গত ২ অক্টোবর আনন্দবাজার পত্রিকা গুজরাটে ‘অপারেশন গঙ্গাজল’ শুরুর খবর প্রকাশ করে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুর্নীতি ও গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগে সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে মুখ্যমন্ত্রী ভূপেন্দ্র প্যাটেলের নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার এই উদ্যোগ নিয়েছে। এটি বিহারের পুরোনো পুলিশি নির্যাতনের অভিযানের মতো নয়; বরং প্রশাসনিক ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

রাজপথ থেকে আদালত—চাপের মুখে নির্বাচন কমিশন

ভারতের বিভিন্ন শহরে ভোটার তালিকা ও নির্বাচন নিয়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে বলে সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। মুম্বাই থেকে নয়াদিল্লি পর্যন্ত আন্দোলনকারীরা ‘ভোট চোর গদি ছোড়’ এবং ‘জ্ঞানেশ ইস্তফা দো’ স্লোগান দিচ্ছেন। ২ অক্টোবরের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া বহু মানুষকে আটক করা হয়। দিল্লিতে বিক্ষোভকারীদের চলাচল সীমিত করতে কয়েকটি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখার খবরও প্রকাশিত হয়।

পরবর্তী সময়ে আন্দোলনকারীরা ১০ অক্টোবর দিল্লির যন্তর মন্তরে সমাবেশের ঘোষণা দেন। সংগঠক অভিজিৎ দীপকে জানান, পুলিশ যেখানে বাধা দেবে, সেখানেই তাঁরা শান্তিপূর্ণভাবে বসে বিক্ষোভ করবেন।

এদিকে ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক আদালতেও পৌঁছেছে। দ্য হিন্দু জানিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া বৈধ নামগুলো পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি সামনে এসেছে। অন্যদিকে, গোয়ার বোম্বে হাইকোর্টও ভোটার তালিকা সংশোধনের পর নাম বাদ পড়ার বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে প্রশ্ন তুলেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

উত্তরপ্রদেশের ভোটার তালিকায় দুই কোটির বেশি নাম বাদ পড়া এবং নতুন করে ১৬ লাখ ১৮ হাজার নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়া নিয়েও বিরোধীরা প্রশ্ন তুলেছেন। এসব নামের পরিচয় ও অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া নিয়ে স্বচ্ছতা দাবি করছেন তাঁরা।

আন্দোলনকারীদের দাবির বিরোধিতা করে বিজেপি নেতারা বলছেন, নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগের যথাযথ ভিত্তি নেই। বিরোধীরা নির্বাচনে হারার পর এমন অভিযোগ তুলছেন বলেও তাঁদের দাবি। অন্যদিকে, আন্দোলনকারীদের একাংশের বক্তব্য, শুধু প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ নয়, পুরো নির্বাচনব্যবস্থায় সংস্কার প্রয়োজন।

ভারতের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ কোন পথে?

ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, ভোটার তালিকা ও নির্বাচন নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত হবে কি না এবং নির্বাচন কমিশনের ওপর মানুষের আস্থা কতটা বজায় থাকবে।

সমালোচকদের মতে, গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন। ভোটার তালিকা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগের নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি না হলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হতে পারে।

তবে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া বা নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগগুলোকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এগুলোর যথাযথ তদন্ত ও আইনি নিষ্পত্তি জরুরি।

সব মিলিয়ে, ভারতের রাজনীতিতে গান্ধির অহিংস ও বহুত্ববাদী আদর্শ এবং গডসের উগ্র হিন্দুত্ববাদী চিন্তার দ্বন্দ্ব নতুন করে আলোচনায় এসেছে। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, ভোটারদের অধিকার এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিয়েও বিতর্ক বাড়ছে। তরুণদের নেতৃত্বে চলমান আন্দোলন কতটা সফল হবে, আর নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্নগুলোর কী সমাধান হবে—তা নির্ধারণ করবে ভারতের গণতন্ত্রের আগামী দিনের গতিপথ।

—জা.অর্থনীতি/আরএস