শ্রীলঙ্কা-বাংলাদেশের পর ভারত? মোদির সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ!
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: এটা একটা সংখ্যার সিরিজ। এক, তিন, পাঁচ, সাত... এক, তিন, সাত, তেরো... এক, দুই, চার, সাত, এগারো...

সংখ্যাগুলো আলাদা। কিন্তু প্রতিটি সিরিজের ভিতরে লুকিয়ে আছে একটা নিয়ম। সেই নিয়মটা ধরতে পারলে পরের সংখ্যাটা অনুমান করা সম্ভব।

এবার সংখ্যার বদলে কয়েকটা দেশের নাম বসিয়ে দেখুন।

২০২২—শ্রীলঙ্কা।
২০২৪—বাংলাদেশ।
২০২৫—নেপাল।
২০২৬—ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন এবং ইউরোপ ও দক্ষিন আমেরিকার কয়েকটি দেশ।

 

দেশ আলাদা, ভাষা আলাদা, রাজনৈতিক ব্যবস্থা আলাদা। কিন্তু একটা মিল চোখে পড়ছে—জনক্ষোভ, তরুণদের অংশগ্রহণ, রাস্তায় বিক্ষোভ, ডিজিটাল প্রচার এবং কোথাও কোথাও সরকারের অস্তিত্বের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।

তাহলে প্রশ্ন—এগুলো কি কেবল একই রকম দেখতে আলাদা আলাদা রাজনৈতিক সংকট? নাকি আধুনিক গণআন্দোলনের এমন কিছু পুনরাবৃত্ত কৌশল আছে, যেগুলো এক দেশ থেকে অন্য দেশের অভিজ্ঞতা নিয়ে আরও কার্যকর হয়ে উঠছে?

আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই পরিস্থিতিতে ভারত কী করল? কীভাবে সামলাল সম্ভাব্য অস্থিরতার চাপ? আর দিল্লির পদক্ষেপ কি সত্যিই একটি বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি ঠেকিয়ে দিয়েছে, মোদি সরকার কি এবারের মতো বেঁচে গেলো - নাকি গল্পটা আরও জটিল?

এই এক্সপ্লেইনারে আমরা খুঁজতে চেস্টা করবো -  আন্দোলনের সিমিলার প্যাটার্ন, ছাত্রদের ফন্টলাইনার ভূমিকা, সোশ্যাল মিডিয়ার শক্তি এবং ভারত সরকারের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া। পাশাপাশি খুঁজব— বিশ্বজুড়ে ঘটনাগুলোর পেছনে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের যে অভিযোগ উঠছে, তার পক্ষে প্রমাণ কতটা, আর কোথায় শুরু হচ্ছে এই ষড়যন্ত্রতত্ত্বের অনুমান।

কারণ দাবার বোর্ডে একই চাল বারবার দেখা যেতে পারে। কিন্তু একই রকম চাল দেখলেই যে খেলোয়াড়ও একই হবে, তা কিন্তু নয়।

শ্রীলঙ্কা থেকে বাংলাদেশ—কীভাবে ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়

প্রথমে শ্রীলঙ্কা

২০২২ সালে দেশটির অর্থনৈতিক সংকট এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে খাদ্য, ওষুধ ও জ্বালানি আমদানি করা কঠিন হয়ে পড়ে। দীর্ঘ বিদ্যুৎবিভ্রাট, জ্বালানির সংকট, মূল্যবৃদ্ধি এবং সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্ষোভ রাস্তায় নেমে আসে।

জুলাইয়ে বিক্ষোভকারীরা প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবনে ঢুকে পড়েন। প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষে দেশ ছাড়েন এবং পরে পদত্যাগ করেন। অর্থাৎ এখানে আন্দোলনের পিছনে শুধু রাজনৈতিক প্রচার ছিল না; ছিল মানুষের দৈনন্দিন জীবনে আঘাত করা গভীর অর্থনৈতিক সংকট।

এরপর ২০২৪ সালে বাংলাদেশ

শুরুটা ছিল সরকারি চাকরিতে কোটা নিয়ে ছাত্রদের প্রতিবাদ। কিন্তু আন্দোলনের বিস্তার ঘটে সংঘর্ষ, প্রাণহানি, নিরাপত্তা বাহিনীর বলপ্রয়োগ এবং সরকারের প্রতিক্রিয়া ঘিরে জনক্ষোভ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে। কোটা নিয়ে আদালতের সিদ্ধান্তের পরও পরিস্থিতি থেমে থাকেনি। আন্দোলনের দাবি ও চরিত্র বদলাতে থাকে, বৃহত্তর সরকারবিরোধী বিক্ষোভ তৈরি হয় এবং ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান।

এখানে একটা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—আন্দোলনটির সূচনা, বিস্তারের প্রেক্ষাপট কিন্তু একরকম ছিল না। তাই ১৬ বছরের সরকারের পতনকে একটি মাত্র কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। ছাত্রদের দাবি, রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া, সংঘর্ষ, প্রাণহানি, রাজনৈতিক বিরোধিতা এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ—সব মিলিয়েই বাংলাদেশে সরকার পতনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।

এবার ২০২৫ এর নেপাল

সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল তাৎক্ষণিক স্ফুলিঙ্গ। কিন্তু তার নিচে জমে ছিল দুর্নীতি, কর্মসংস্থানের অভাব, অর্থনৈতিক হতাশা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর অনাস্থা। তরুণদের বিক্ষোভ দ্রুত বড় আকার নেয়। সংঘর্ষে প্রাণহানির পর প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি পদত্যাগ করেন।

Reuters-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোশ্যাল মিডিয়া নিষেধাজ্ঞা আন্দোলনের তাৎক্ষণিক কারণ হলেও দুর্নীতি ও সুযোগের অভাব নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ছিল এর গভীরে।

আর ২০২৬ সালের ফ্রান্সে ছাত্রদের বিক্ষোভ শুরু হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবস্থা নিয়ে। পরে জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি পরিষেবা এবং বৃহত্তর রাজনৈতিক অসন্তোষও সামনে আসে। অক্টোবরের বিক্ষোভে ছাত্রদের পাশাপাশি ট্রেড ইউনিয়ন ও বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর অংশগ্রহণ দেখা গেছে। কিছু জায়গায় শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নেয়। শুধু ফ্রান্সে নয়, ইতালি, স্পেনসহ দক্ষিণ আমেরিকার কিছু দেশ এমনকি আফ্রিকার দেশে দেশেও সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেছে একই ধরনের বিক্ষোভ, আন্দোলন।

একেবারে নির্দিষ্ট করে বললে -চারটি দেশ। চার ধরনের সংকট। কিন্তু একটা মিল আছে—একটি নির্দিষ্ট অভিযোগ বা ক্ষোভ যখন মানুষের বৃহত্তর হতাশার সঙ্গে মিশে যায়, তখন আন্দোলনের পরিধি মূল দাবির সীমানা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

এটাই প্রথম প্যাটার্ন। একটা সমাজে শুধু ক্ষোভ থাকলেই আন্দোলন হয় না। ক্ষোভকে সংগঠিত শক্তিতে পরিণত করতে হয়।

আর এই শক্তিতে পরিণত করার প্রথম ও প্রধান ধারণাটি হলো—ফল্টলাইন।

অর্থাৎ, মানুষের প্রত্যাশার সঙ্গে রাষ্ট্র বা ব্যবস্থার বাস্তব আচরণের যে সংঘাত, সেটিই ফল্ট লাইন।

চাকরি নেই, রাষ্ট্রের টাকা পয়সা গায়েব, পরীক্ষায় অনিয়ম, সর্বগ্রাসী দুর্নীতি, মূল্যবৃদ্ধি, নাগরিক অধিকার বা নিরাপত্তাহীনতা—এগুলোর যেকোনো একটি বড় ফল্টলাইন হয়ে উঠতে পারে।

দ্বিতীয় ধাপ হলো—আবেগের সংযোগ।

একটি রিপোর্টের পরিসংখ্যান মানুষকে তথ্য দিতে পারে। কিন্তু সেই তথ্য যখন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিশে যায়, তখন তা হয়ে ওঠে আন্দোলনের চালিকাশক্তি। একজন পরীক্ষার্থী ভাবতেই পারেন, তার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। একজন অভিভাবক ভাবতেই পারেন, তার সন্তানের পরিশ্রমের মূল্য নেই। একজন তরুণ ভাবতেই পারেন, তার সামনে এগোনোর সব পথ রাষ্ট্র ক্রমাগত বন্ধ করছে।

আর এখানে এই ভাবনা ও ক্ষোভের সঙ্গে যুক্ত হয় হতাশা, অপমানবোধ, নিরাপত্তাহীনতা কিংবা পরিবর্তনের আশা। যা প্রচলিত যুক্তির ধারণার অনেক বাইরে।

তৃতীয় ধাপ— হাল আমলের সর্বগ্রাসী ডিজিটাল বিস্তার।

সোশ্যাল মিডিয়া আন্দোলনের খবর ছড়াতে পারে, বিচ্ছিন্ন মানুষকে যুক্ত করতে পারে, ভিডিও ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা সামনে আনতে পারে। আবার একই প্ল্যাটফর্মে গুজব, এডিটেড ভিডিও, ভুল তথ্য এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারনাও উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে ছড়াতে পারে।

তবে কোনো আন্দোলনে ভুল তথ্য ছড়ালেই যে পুরো আন্দোলনটি সাজানো বা ফেসবুকের সহযোগিতায় ডিপ স্টেটের সাজানো—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোটাও সহজ নয়। আবার কোনো আন্দোলনের আবেগ সত্যি বলেই তার প্রতিটি দাবি সত্যি—সেটাও ধরে নেওয়া যায় না।

এবার আসি চতুর্থ ধাপে—স্থানীয় অথবা অল্প কিছু মানুষের ক্ষোভের সঙ্গে বৃহত্তর রাজনৈতিক অসন্তোষের সংযোগ।

প্রথমে যে দাবি ছিল কোটা সংশোধন, পরীক্ষায় স্বচ্ছতা বা দুর্নীতি - সেটি পরে সরকারের জবাবদিহির প্রশ্নে পৌঁছতে পারে। যে প্রতিবাদ শুরু হয়েছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে, সেটি দুর্নীতি ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নিতে পারে।

এই পরিবর্তন স্বতঃস্ফূর্তভাবেও ঘটতে পারে। রাজনৈতিক দল, সংগঠক কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তিরা তাতে ভূমিকা রাখতে পারেন। কিন্তু কারা আন্দোলনকে প্রভাবিত করছে, কে অর্থ জোগাচ্ছে, কে পরিকল্পনা করছে—এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে প্রমাণ দরকার। তবে যারা এই অর্থ জোগায় বা পরিকল্পনা করে তারাও যে এতো সহজে নিজেদের ধরা দেবেন, তা কিন্তু নয়।

অর্থাৎ, আন্দোলনের প্যাটার্ন মেলানো যায়। কিন্তু সেই প্যাটার্নের একই পরিচালকের পরিচালনা কি না, সেটি আলাদা তদন্তের বিষয়।

পর্ব ৩: ছাত্ররাই কেন আন্দোলনের সামনের সারিতে?

একবিংশ শতাব্দীতেই শুধু নয় আধুনিক যুগে ছাত্ররা বরাবরই আন্দোলনের সামনের শক্তি ছিল।

ছাত্র আন্দোলনের একটা বিশেষ সামাজিক শক্তি আছে। ছাত্রদের ভবিষ্যৎ, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং ন্যায্য সুযোগের দাবি খুব সহজেই সাধারণ মানুষের সঙ্গে আবেগের সংযোগ তৈরি করতে পারে। তরুণদের অংশগ্রহণ আন্দোলনকে নতুন ভাষা, নতুন প্রতীক এবং নতুন প্রচারপদ্ধতির জন্ম দেয়।

ছাত্রদের অনেকেরই প্রচলিত দলীয় রাজনীতির বাইরে থাকার ভাবমূর্তি থাকে। ফলে তাদের দাবি কখনও কখনও বৃহত্তর সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা পায়।

দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ হলো যোগাযোগের স্বাভাবিক কেন্দ্র। সহপাঠী, ছাত্রসংগঠন, ক্যাম্পাসের নেটওয়ার্ক এবং অনলাইন কমিউনিটির মাধ্যমে খবর দ্রুত ছড়ায়।

তৃতীয়ত, ছাত্রদের দাবি যখন বৃহত্তর জনস্বার্থের সঙ্গে মিলে যায়, তখন অভিভাবক, শিক্ষক, পেশাজীবী, শ্রমিক এবং অন্যান্য নাগরিকও সহজেই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন।

তবে ছাত্রদের সবাই স্বার্থহীন, অথবা ছাত্রদের সবাই কারও ইশারায় চলছে—দুটির কোনোটিই শতভাগ সঠিক এইটাও ধরে নেওয়া যায় না। ছাত্রদের মধ্যে রাজনৈতিক মতভেদ থাকে, ব্যক্তিগত স্বার্থ থাকে, আবার সত্যিকারের ন্যায়সংগত দাবি নিয়ে ঝুঁকি নেওয়া মানুষও থাকেন।

আন্দোলনের মধ্যে রাজনৈতিক সংগঠনের অনুপ্রবেশও নতুন ঘটনা নয়। বিরোধী দল, আদর্শভিত্তিক গোষ্ঠী, শ্রমিক সংগঠন ও নাগরিক সমাজ অনেক সময় ছাত্রদের উত্থাপিত দাবিকে নানা উদ্দেশ্যে সমর্থন করে। কখনও তারা আন্দোলনের বিস্তার ঘটায়, কখনও আন্দোলনের নেতৃত্ব ও লক্ষ্য নিয়ে সংঘাত তৈরি করে।

তাই ছাত্রদের অংশগ্রহণকে সবসময়ই ষড়যন্ত্রের প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক নয়। বরং লক্ষ্য রাখতে হবে— তাদের দাবিটি কী? নেতৃত্ব কার হাতে যাচ্ছে? আন্দোলনের লক্ষ্য কি বদলাচ্ছে? অর্থায়ন ও সংগঠনের তথ্য কী বলছে? আর আন্দোলনের নামে যে দাবি করা হচ্ছে, বাস্তবে তার পক্ষে কী প্রমাণ রয়েছে?

এই প্রশ্নগুলোই আবেগের বাইরে গিয়ে প্যাটার্ন বুঝতে সাহায্য করে।

ভারত—কীভাবে পরিস্থিতি প্রাথমিকভাবে সামলাচ্ছে মোদী সরকার?

এবার ভারতের দিকে তাকানো যাক

২০২৬ সালে ভারতেও ছাত্র ও তরুণদের বিক্ষোভ হয়েছে। NEET-UG পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে বিক্ষোভের পর কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান ২৫ জুলাই পদত্যাগ করেন। Indian Express-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিক্ষোভকারীদের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল তার পদত্যাগ। মোদি সরকার ছাত্রদের দাবি মানতে বাধ্য হয়, এবং শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয়।

এই ঘটনাটি মোদি সরকারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সবাই ধারণা করছিলেন মোদি সরকার কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপের মাধ্যমে আন্দোলন ঠেকানোর চেষ্টা করবে। কিন্তু তারা সেই পঠে খানিকটা হেঁটে এরপর রাজনৈতিক দায় স্বীকারের মাধ্যমে নেতৃত্বে পরিবর্তন ও তদন্তের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষোভ কমানোর কৌশল বেছে নিয়েছিল।

ছাত্রদের দাবিকে অগ্রাহ্য না করে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিয়ে আন্দোলনের বিস্তার কমানোর চেস্টা করেছিল। সাময়িকভাবে মোদি সরকারের কৌশল সফল হলেও অক্টোবরের দিল্লি বলছে ভিন্ন কথা।

নির্বাচনী তালিকার Special Intensive Revision বা SIR নিয়ে বিতর্ক এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে এইবার বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। দিল্লি পুলিশ যন্তরমন্তরে সমাবেশের অনুমতি নিয়ে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। গত ১৪ অক্টোবর বিক্ষোভের সময় ব্যারিকেড অতিক্রমের অভিযোগে Cockroach Janta Party-র দুই নেতা আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাসকে আটক করা হয়।

পুলিশের বক্তব্য ছিল, অনুমতি ছাড়া জমায়েত ও আইনশৃঙ্খলার ঝুঁকি মোকাবিলায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, আটক নেতাদের পক্ষ থেকে আইনি প্রক্রিয়া ও ব্যক্তিস্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। বিষয়টি আদালতেও গড়ায়।

এই ঘটনাকে ভারতের আন্দোলন মোকাবিলার কৌশল বোঝার একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়। তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা রয়েছে—প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ মানেই আন্দোলন শেষ হয়ে যাওয়া নয়। কখনও তাৎক্ষণিকভাবে জমায়েত সীমিত হয়, কিন্তু অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ নতুন ক্ষোভও তৈরি করতে পারে।

তবে মোদি সরকারের এবারের মতো টিকে যাওয়ার সম্ভাব্য সুবিধাগুলোর মধ্যে প্রথমটি হলো—যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো।

ভারতে আইনশৃঙ্খলা ও পুলিশ প্রশাসনে রাজ্যগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ফলে দেশের এক প্রান্তে যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হয়, তার প্রতিক্রিয়া অন্য রাজ্যে একই রকম হবে—এমন নয়। রাজ্যভেদে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, প্রশাসনিক প্রস্তুতি, সামাজিক পরিস্থিতি এবং জনমত আলাদা।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে একাই অস্থিরতার বিরুদ্ধে ঢাল বলা যাবে না। সমন্বিত জাতীয় ক্ষোভ তৈরি হলে রাজ্যসীমা আন্দোলনকে আটকে রাখতে পারে না। ২০২০–২১ সালের কৃষক আন্দোলন কিংবা অতীতের বৃহৎ গণআন্দোলনে দেখা গেছে, দেশটিতে একাধিক রাজ্যে একই ইস্যু ছড়িয়ে পড়া সম্ভব।

দ্বিতীয় সুবিধা—ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক বৈচিত্র্য।

ভাষা, জাতি, ধর্ম, শ্রেণি, অঞ্চল এবং অর্থনৈতিক স্বার্থের ভিন্নতার কারণে একই ইস্যু সবার কাছে একইভাবে প্রতিধ্বনিত হয় না। এক রাজ্যের প্রধান দাবি অন্য রাজ্যের মানুষের কাছে কম গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এই বৈচিত্র্য আন্দোলনের দেশব্যাপী বিস্তারকে কখনও কঠিন করে তোলে।

তবে বিপরীত দিকও আছে। যখন কোনো ইস্যু বহু গোষ্ঠীর অভিন্ন স্বার্থকে স্পর্শ করে, তখন সেই বৈচিত্র্যই বৃহত্তর জোট গঠনের ভিত্তি হতে পারে।

তৃতীয় বিষয়—রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতি।

আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ে সরকার যদি সমস্যাটিকে শনাক্ত করে, আলোচনার দরজা খোলা রাখে, বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত করে এবং প্রয়োজনীয় সংশোধন আনে, তাহলে ক্ষোভ আরও বড় সংঘাতে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি কমতে পারে।

অন্যদিকে, বৈধ দাবিকে অস্বীকার করা, তথ্য গোপন করা কিংবা অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ পরিস্থিতি আরও জটিল করতে পারে।

ভারতের ২০২৬ সালের অভিজ্ঞতায় আমরা দুই ধরনের প্রতিক্রিয়াই দেখতে পাই—একদিকে NEET বিতর্কে মন্ত্রীর পদত্যাগ, অন্যদিকে দিল্লিতে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক পুলিশি পদক্ষেপ ও তা নিয়ে আইনি বিতর্ক।

ভারতে মোদী সরকার রাজনৈতিক ছাড়, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং আইনি পদক্ষেপ—বিভিন্ন উপায়ে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু এর সবটাই একটি পূর্বপরিকল্পিত আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ঠেকানোর কৌশল ছিল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো প্রমাণ এখানে এখনও নেই। কিন্তু মানুষের মুখের কথার ওপর তো এই ট্যাক্স বসানো যায় না। তাই এই ধরনের পপুলিস্ট থিওরিও জনপ্রিয় হচ্ছে বেশ।

পর্ব ৫: বিদেশি হাত, ষড়যন্ত্র ও রেজিম চেঞ্জ—কোন প্রশ্নগুলো জরুরি?

এবার সবচেয়ে স্পর্শকাতর প্রশ্ন। শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপাল ও ফ্রান্সের আন্দোলন কি একই আন্তর্জাতিক নকশার অংশ?

একটি সম্ভাব্য ষড়যন্ত্রতত্ত্ব বলবে—প্রথমে এমন একটি ইস্যু বেছে নেওয়া হয়, যা মানুষের আবেগকে স্পর্শ করে। তারপর ছাত্রদের সামনে রেখে আন্দোলন শুরু হয়। ডিজিটাল প্রচারে তা বড় হয়। পরে রাজনৈতিক শক্তি আন্দোলনের নেতৃত্বে আসে এবং শেষ পর্যন্ত সরকারের পতন ঘটানোর চেষ্টা করে।

শুনতে এটি একটি সুসংহত ব্যাখ্যা। কিন্তু একটি ব্যাখ্যা আকর্ষণীয় হলেই সেটি সত্য হয়ে যায় না।

এই তত্ত্ব যাচাই করতে অন্তত পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দরকার।

এক—আন্দোলনের সংগঠকদের সঙ্গে বিদেশি রাষ্ট্র, সংস্থা বা অর্থদাতাদের কোনো প্রমাণিত আর্থিক সম্পর্ক আছে কি?

দুই—একাধিক দেশে একই ধরনের বার্তা বা প্রচার ছড়ানোর পেছনে সমন্বিত নেটওয়ার্কের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ আছে কি?

তিন—কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী আন্দোলনের লক্ষ্য, নেতৃত্ব বা অর্থায়ন নিয়ন্ত্রণ করেছে-এমন নথি, যোগাযোগ বা যাচাইযোগ্য সাক্ষ্য আছে কি?

চার—আন্দোলনের মূল দাবিগুলো বাস্তব সমস্যার সঙ্গে কতটা সম্পর্কিত?

পাঁচ—রাজনৈতিক বিরোধীরা আন্দোলনকে সমর্থন করেছে, নাকি আন্দোলনকে পরিকল্পিতভাবে সৃষ্টি ও পরিচালনা করেছে? এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য কী?

কোনো বিদেশি সংস্থা নাগরিক সমাজকে অর্থায়ন করলেই সরকার পতনের ষড়যন্ত্র প্রমাণিত হয় না। কোনো রাজনৈতিক দল আন্দোলনে যোগ দিলেই আন্দোলনের সূচনা তারাই করেছে, এমন নয়। আবার ডিজিটাল প্রচার স্বতঃস্ফূর্তভাবে ছড়ালেও কেউ সেটিকে পরিকল্পিতভাবে বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে।

অর্থাৎ, প্রভাব বিস্তার সম্ভব-কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রে তা প্রমাণ করতে হবে।

শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক বিপর্যয় ছিল বাস্তব। বাংলাদেশের ছাত্রদের কোটা নিয়ে ক্ষোভ বাস্তব ছিল। নেপালে দুর্নীতি ও কর্মসংস্থান নিয়ে হতাশা ছিল। ফ্রান্সেও শিক্ষা ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষের কথা সংবাদমাধ্যমে এসেছে।

এসব বাস্তব কারণকে উপেক্ষা করে সবকিছুকে বিদেশি ষড়যন্ত্র বললে বিশ্লেষণ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। একইভাবে, বিদেশি প্রভাবের সম্ভাবনা আছে বলেই সেটিকে সর্বত্র সত্য ধরে নেওয়াও ভুল।ড

পর্ব ৬: মোদি সরকার কি সত্যিই বেঁচে গেল?

তাহলে কি ভারতে মোদি সরকার আবারও একটি বড় রাজনৈতিক সংকট থেকে বেঁচে গেছে?

২০২৬ সালের নির্দিষ্ট ছাত্র ও তরুণদের বিক্ষোভ কি এখন পর্যন্ত শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ বা নেপালের মতো সরকার পতনের পরিস্থিতি তৈরি করেছে, তাহলে ঘটনাগুলোর মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। ভারতে কেন্দ্রীয় সরকার ক্ষমতায় রয়েছে, কিন্তু বিক্ষোভ, রাজনৈতিক বিরোধিতা এবং প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়ে বিতর্ক চলেছে।

আর যদি প্রশ্ন হয়, ভারত কি কোনো গোপন আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ করে দিয়েছে, তাহলে তার পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছাড়া নিশ্চিত দাবি করা যাবে না।

তবে ভারতের রাজনৈতিক কাঠামো, রাজ্যগুলোর প্রশাসনিক ভূমিকা, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং বিভিন্ন অঞ্চলের ভিন্ন বাস্তবতা—এসবই দেশের অস্থিরতা কীভাবে ছড়ায় বা নিয়ন্ত্রণে আসে, তা নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে।

সরকারের জন্য সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরক্ষা শুধু ব্যারিকেড নয়। বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছ পরীক্ষা, নিরপেক্ষ তদন্ত, নাগরিকের অভিযোগের সমাধান এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকারও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

কারণ আন্দোলন দমন করে সাময়িক নীরবতা আনা আর আন্দোলনের পিছনের সমস্যার সমাধান করা এক জিনিস নয়।

সমাপ্তি

ছোটবেলায় সংখ্যার সিরিজের পরের সংখ্যাটি খুঁজে বের করার খেলায় একটা আনন্দ ছিল। কারণ নিয়মটা বুঝে গেলে পরের ধাপের আন্দাজ করা যেত।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও প্যাটার্ন দেখা জরুরি। কোথায় ক্ষোভ জমছে, কীভাবে তা ছড়াচ্ছে, কারা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে, কোন পর্যায়ে দাবি বদলে যাচ্ছে এবং প্রশাসন কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে—এই প্রশ্নগুলো ভবিষ্যতের ঝুঁকি বুঝতে সাহায্য করে।

কিন্তু প্যাটার্ন আর ষড়যন্ত্র এক জিনিস নয়। একই ফলাফল একাধিক কারণে ঘটতে পারে। একই কৌশল বিভিন্ন গোষ্ঠী স্বাধীনভাবেও ব্যবহার করতে পারে।

তাই চোখ খোলা রাখুন। আবেগের পাশাপাশি তথ্য যাচাই করুন। আন্দোলনের দাবি শুনুন, রাষ্ট্রের বক্তব্যও পরীক্ষা করুন। বিদেশি মদতের অভিযোগ উঠলে প্রমাণ চান। আর প্রশাসনের পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি থাকলেও তার বৈধতা ও আনুপাতিকতা নিয়ে প্রশ্ন করার অধিকার বজায় রাখুন।

কারণ যে জাতি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে পারে, সে শুধু পরের চাল অনুমান করতেই শেখে না-ভুল চাল থেকে নিজেকেও রক্ষা করতে শেখে।

দাবার বোর্ডে কে খেলছে, কী উদ্দেশ্যে খেলছে এবং চালটি আসলে কোথায় গিয়ে শেষ হবে-সেটা বুঝতে হলে শুধু সন্দেহ নয়, দরকার প্রমাণ।

আর সেটাই হতে পারে একটি দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা।  

—জা. অর্থনীতি/এলএটি