সাতক্ষীরায় ১০ মাসে পানিতে ডুবে ২২ মৃত্যু, ১৯ জনই শিশু
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি: সাতক্ষীরায় পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর ঘটনা থামছে না। চলতি বছরের ১০ মাসে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পুকুর, নদী, খাল ও মাছের ঘেরে ডুবে প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ২২ জন। তাদের মধ্যে ১৯ জনই শিশু। পরিবারের সদস্যদের অগোচরে খেলতে গিয়ে কিংবা গোসল করতে নেমে এসব দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে বেশির ভাগ শিশু।

জানুয়ারি থেকে ১ অক্টোবর পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জানুয়ারিতে একজন, ফেব্রুয়ারিতে দুজন, মার্চে তিনজন, এপ্রিলে একজন, মে মাসে দুজন, জুনে তিনজন, জুলাইয়ে চারজন, আগস্টে তিনজন, সেপ্টেম্বরে ছয়জন এবং ১ অক্টোবর দুজন পানিতে ডুবে মারা গেছে। নিহতদের মধ্যে ১৯ শিশু ছাড়াও একজন বৃদ্ধা, একজন বৃদ্ধ ও একজন অজ্ঞাত ব্যক্তি রয়েছেন। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুম ও এর পরবর্তী সময়ে মৃত্যুর ঘটনা বেড়েছে।

গত ১৫ সেপ্টেম্বর এক দিনেই জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পানিতে ডুবে পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়। তাদের মধ্যে আশাশুনির বামনডাঙ্গা গ্রামের ১৩ মাস বয়সী ঈশিতা সানা, কলারোয়ার কেড়াগাছির দুই বছরের ইরফান খাঁ, শ্যামনগরের চণ্ডীপুরের কিশোর ফয়সাল হোসেন, সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ফিংড়ীর এক কন্যাশিশু এবং কালিগঞ্জের ইন্দ্রনগরের ১৯ মাস বয়সী লামিসা খাতুন রয়েছে।

এর তিন দিন পর, ১৮ সেপ্টেম্বর কালিগঞ্জের দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের সোনাতলা গ্রামে নানাবাড়ির পাশের পুকুরে ডুবে মারা যায় দুই শিশু। তারা হলো আজগার আলীর ছেলে আব্দুল্লাহ (৮) ও বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের আমিনুর বিশ্বাসের ছেলে ইকবাল হোসেন (৭)। ২৭ সেপ্টেম্বর তালার মহান্দী গ্রামে বাড়ির পাশের পুকুরে ডুবে মারা যায় তিন বছরের শিশু রাফসান হোসেন।

সর্বশেষ ১ অক্টোবর কলারোয়ার জালালাবাদ ইউনিয়নের সিংহলাল গ্রামে পুকুরের পানিতে ডুবে দুই সহোদর জান্নাতুল (৩) ও সানজাদুলের (২) মৃত্যু হয়। দুপুর ১২টার দিকে পরিবারের সদস্যদের অগোচরে পানিতে পড়ে যায় তারা। একসঙ্গে দুই সন্তানকে হারিয়ে শোকের ছায়া নেমে আসে পরিবার ও এলাকায়।

শুধু সাতক্ষীরায় নয়, সারা দেশেই পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর চিত্র উদ্বেগজনক। ডিজাস্টার ফোরামের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশের বিভিন্ন জেলায় পানিতে ডুবে ৫৮২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ১ থেকে ৫ বছর বয়সী ২৫২ জন এবং ৬ থেকে ১০ বছর বয়সী ১৫১ জন। এর আগে ২০২৫ সালে সারা দেশে পানিতে ডুবে মারা যায় ১ হাজার ৩১১ জন। তাদের মধ্যে ১ হাজার ১৮৪ জনই শিশু, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৯১ শতাংশ। ওই বছর পুকুরে ডুবে ৭৬৫ জন, নদীতে ১৮৫ জন এবং মাছের ঘের ও ডোবার পানিতে ১০৬ জনের মৃত্যু হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, ছয় বছর বয়সে সাঁতার শেখানো হলে একটি শিশুর পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ৯০ দশমিক ৩ শতাংশ কমানো সম্ভব। ২০৩৫ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে পানিতে ডুবে মৃত্যুর হার ৩৫ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, অভিভাবকদের অসচেতনতা, শিশুদের প্রতি পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব এবং সাঁতার না জানার কারণে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে। শিশুদের নিরাপত্তায় পারিবারিক সচেতনতার পাশাপাশি সাঁতার প্রশিক্ষণ ও জলাশয়ে সুরক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

সাতক্ষীরা জেলা শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা রিয়াজুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি সাতক্ষীরা স্থানীয় এনজিও উত্তরণের মাধ্যমে দেবহাটা ও শ্যামনগর উপজেলায় আইসিবিসি নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছিল। শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধের পাশাপাশি তাদের মানসিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশ ছিল প্রকল্পটির উদ্দেশ্য। ২০২৫ সালে প্রকল্পটি শেষ হয়েছে। এখন এর দ্বিতীয় ধাপ শুরুর অপেক্ষায় রয়েছি। বর্তমানে সাতক্ষীরায় আমাদের কোনো প্রকল্প চলমান নেই।

তিনি আরও বলেন, ‘আজকের শিশু আগামীর ভবিষ্যৎ। অভিভাবকদের অবশ্যই শিশুদের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে এবং পাঁচ বছর বয়সের পর তাদের সাঁতার শেখানোর ব্যবস্থা করতে হবে।’ প্রকল্পের আওতায় দুটি উপজেলায় ৫০টি পুকুরের মাধ্যমে ২২ হাজার ৫০০ শিশুকে সাঁতার শেখানো হয়েছে। পাশাপাশি অরক্ষিত পুকুর ও জলাশয়ে সুরক্ষাবেষ্টনী দেওয়া হয়েছিল।

—জা. অর্থনীতি/এলএটি