নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা : ঢাকা শহরের ফুটপাথে যত্রতত্র হকার বসার ফলে সাধারণ মানুষের চলাচলে বেশ সমস্যা হচ্ছিল। এমনকি রাজধানীর গুলিস্তান, নিউ মার্কেটসহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ এলাকার ফুটপাথ ছাড়াও মেইন রাস্তায় হকাররা দোকান নিয়ে বসায় সেসব রাস্তায় সবসময় যানজট লেগেই থাকে। এ নিয়ে দুই সিটি করপোরেশন নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করলেও অভিযান শেষে আবারও দোকান নিয়ে হকারদের বসে যেতে দেখা যায়। এর স্থায়ী সমাধান হিসেবে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরশেন (ডিএনসিসি ও ডিএসসিসি) হকারদের পুনর্বাসনের নানা উদ্যোগ নিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) ডিএনসিসি ও ডিএসসিসির এলাকার ৩০২ জন হকারকে ডিজিটাল পরিচয়পত্র প্রদান করা হয়েছে। মিরপুরের হকারদের নির্ধারিত স্থানে ব্যবসার জন্য ২০২ জন হকারকে এবং গুলিস্তান এলাকার ১০০ জন হকারকে এই ডিজিটাল পরিচয়পত্র দেওয়া হয়।
ডিএনসিসি রাজধানীর মিরপুর ১০, মিরপুর ১ এবং মিরপুর ২ এর মুলসড়কের ভ্রাম্যমান ২ শতাধিক ব্যবসায়ীর (হকার) মাঝে ডিজিটাল পরিচয়পত্র বিতরণ করেছে। এই পরিচয়পত্রের মাধ্যমে ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীদের বৈধতা দেয়াসহ ব্যবসার জন্য বিকল্প স্থান নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার গুলশানে ডিএনসিসির নগর ভবনে হকারদের ডিজিটাল পরিচয়পত্র প্রদান অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান।
উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রশাসক বলেন, আমরা আগেই হকারদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের মতামত নিয়েছি। তারা নিজেরাও অবৈধভাবে ব্যবসা করতে চান না। সে অনুযায়ী পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতায় একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। তালিকা ধরে পর্যায়ক্রমে হকারদের বিকল্পস্থানে স্থানান্তর করা হবে। আজ মোট ২০২ জন হকারের মাঝে ডিজিটাল পরিচয়পত্র বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১০২ জনকে মিরপুর-১০ এলাকা থেকে মিরপুর-১৩ ওয়াসা রোডে এবং বাকি ১০০ জনকে গাবতলী কাজা বাজার সংলগ্ন ফাঁকা স্থানে স্থানান্তর করা হচ্ছে।
তালিকাভুক্ত মোট হকারের সংখ্যা ৮২৯ জন। বাকি হকারদেরও পর্যায়ক্রমে পরিচয়পত্র প্রদান করে নির্ধারিত স্থানে স্থানান্তর করা হবে বলে জানিয়েছে ডিএনসিসি। প্রশাসক জানান, প্রাথমিকভাবে রাজধানীর ৬ মাঠে হকার পুনর্বাসনের প্রস্তাব পেয়েছিলাম। কিন্তু সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, এসব মাঠে শিশু-কিশোররা খেলাধুলা করে। তাই মাঠগুলো পুনর্বাসনের জন্য ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে হকারদের জন্য পৃথক ‘হকার্স মার্কেট’ গড়ে তোলার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে বলে প্রশাসক জানান।
এদিকে ঢাকা মহানগরীর ফুটপাথে পথচারীদের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করা এবং হকারদের সুশৃঙ্খলভাবে পুনর্বাসনের লক্ষ্যে বৃহস্পতিবার ডিএসসিসি নগর ভবন অডিটোরিয়ামে প্রস্তাবিত “ঢাকা শহরের হকার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০২৬” এর আওতায় হকার পুনর্বাসন কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক শুভ উদ্বোধন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এই কার্যক্রমের শুভ উদ্বোধন করেন প্রশাসক মো. আবদুস সালাম। অনুষ্ঠানে গুলিস্তান এলাকায় ১০০ জন হকারকে রমনা ভবন সংলগ্ন রিংক রোড এলাকায় পুনবার্সনের জন্য ডিজিটাল পরিচয়পত্র হস্তান্তর করা হয়।
ডিএসসিসির প্রস্তাবিত নীতিমালার অধীনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় হকারদের জন্য সুনির্দিষ্ট স্থান ও সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হবে। প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত এলাকাসমূহ হলো গুলিস্থানে রমনা ভবনের লিংক রোডে দৈনন্দিন ডে টু ডে মার্কেট, মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের বিপরীত পাশে এজিবি কলোনি মাঠে সান্ধ্যকালীন মার্কেট (সন্ধ্যা ৬টা হতে রাত ১০টা), মতিঝিল ইসলাম চেম্বারের সামনে ও আশেপাশের এলাকায় সান্ধ্যকালীন মার্কেট (সন্ধ্যা ৬টা হতে রাত ১০টা), রাজউক ভবনের পেছনে দৈনন্দিন ডে টু ডে মার্কেট, গুলিস্তান টুইন টাওয়ার গলি, দৈনন্দিন ডে টু ডে মার্কেট, বাইতুল মোকাররম পূর্বগেইট সংলগ্ন লিংক রোড, দৈনন্দিন ডে টু ডে মার্কেট, নিউ মার্কেটের দক্ষিণ গেট সংলগ্ন এক পাশে, দৈনন্দিন ডে টু ডে মার্কেট, শাজাহানপুর রেলওয়ে কলোনির অভ্যন্তরে মাঠ সংলগ্ন রাস্তা, দৈনন্দিন ডে টু ডে মার্কেট।
সভাপতির বক্তব্যে ডিএসসিসি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘আজ ১০০ হকারকে কিউআর কোড সম্বলিত ডিজিটাল পরিচয়পত্র প্রদান করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে নীতিমালা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সংখ্যক সকল হকারকে প্রদান করা হবে। এর মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। এছাড়া, ট্রাফিক পুলিশ সহজেই তাদের বৈধতা ও বসার স্থান যাচাই করতে পারবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘হকার বসার পরও ফুটপাথে পথচারীদের চলাচলের জন্য নূন্যতম ৫-৬ ফুট জায়গা উন্মুক্ত রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।’
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় আমরা ঢাকা শহরে হকার ব্যবস্থাপনা শুরু করেছি। এর ফলে একদিকে যেমন নিরাপদ ও পথচারী বান্ধব ফুটপাত নিশ্চিতকরণ ও সড়কে শৃঙ্খলা আনয়ন সম্ভব হবে। অন্যদিকে হকার নিবন্ধন ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন হবে।
এই উদ্যোগকে মানবিক ও যুগান্তকারী উল্লেখ করে তিনি বলেন, হকার, পুলিশ, সিটি কর্পোরেশন ও সাধারণ মানুষ সবাই মিলে সহযোগিতা করলে এই ঢাকা শহরকে সুন্দরভাবে ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব।’ উদ্বোধনকালে জানানো হয়, খেলার মাঠ, স্কুল মাঠ বা ধর্মীয় উপাসনালয়ের সামনে কোনো বাজার বসানো যাবে না। এছাড়া কোনো স্থায়ী অবকাঠামো তৈরি করা যাবে না। নীতিমালা লঙঘনকারী বা লাইসেন্সবিহীন অবৈধ হকারদের যেকোনো সময় উচ্ছেদের পূর্ণ এখতিয়ার কর্তৃপক্ষ সংরক্ষণ করবে। এছাড়া হকারদের কাছ থেকে অবৈধ চাঁদাবাজি বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর তদারকি করবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার বিভাগের নগর উন্নয়ন অনুবিভাগের যুগ্মসচিব জনাব পরিমল সরকার এবং ডিএমপি’র অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক)ন মো. আনিছুর রহমান। বক্তারা এই উদ্যোগকে 'ক্লিন সিটি, গ্রিন সিটি' বিনির্মাণের পথে একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেন।