বাংলা উপন্যাসের শিল্পিত রূপটি প্রথম খুঁজে পান বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-১৮৯৪)। তার হাতেই বাংলা উপন্যাস মুক্তি পেল। সমাজ-রাজনীতি-অর্থনীতিক বাস্তবতা সবকিছু অবারিতভাবে উপন্যাসে উঠে এলো। উপন্যাসের যে কাহিনি গদ্য সেটি বঙ্কিমচন্দ্রই সর্বপ্রথম উপন্যাসে প্রযুক্ত করলেন। বাংলা উপন্যাসের এই সফলস্রষ্টা সফল হয়েছিলেন দুটো কারণে। এক. সমাজ ভাঙনকে উপন্যাসে স্পষ্ট করে, দুই. ‘ব্যক্তি’ মানুষকে জীবন সম্ভাব্য প্রকরণে তুলে এনে। এখনও যেহেতু বাংলা উপন্যাস অদ্যাবধি এমন শর্তকে অঙ্গীভূত করেই এগিয়ে চলেছে। এর আগে বাংলা উপন্যাস সৃষ্টি হলেও সার্থক উপন্যাস পেতে আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে বঙ্কিম পর্যন্ত। হ্যানা ক্যাথেরিন ম্যুলেন্সের ‘ফুলমণি ও করুণার বিবরণ’, কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের ‘বিজয় বসন্ত’ ও প্যারীচাঁদ মিত্রের ‘আলালের ঘরের দুলাল’ বাংলা উপন্যাসের অভিযাত্রায় বিরাট ভূমিকা পালন করে। বঙ্কিমচন্দ্র বাংলা উপন্যাসে রীতিমতো বিপ্লব ঘটান। তার উপন্যাসগুলো ‘দুর্গেশনন্দিনী’ (১৮৬৫), ‘কপালকুণ্ডলা’ (১৮৬৬), ‘মৃণালিনী’ (১৮৬৯), ‘বিষবৃক্ষ’ (১৮৭৩), ‘ইন্দিরা’ (১৮৭৩), ‘যুগলাঙ্গুরীয়’ (১৮৭৪), ‘চন্দ্রশেখর’ (১৮৭৫), ‘রজনী’ (১৮৭৭), ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ (১৮৭৮), ‘আনন্দমঠ’ (১৮৮২), ‘রাজসিংহ’ (১৮৮২), ‘দেবী চৌধুরানী’ (১৮৮৪), ‘রাধারানী’ (১৮৮৬), ‘সীতারাম’ (১৮৮৭)। ইংরেজি উপন্যাস ‘রাজমোহনস ওয়াইফ’ (১৮৬৪)।
বাংলা উপন্যাস মুক্তি পায় বঙ্কিমচন্দ্রে। আগে বিবিধ চেষ্টা চলেছে। এবারে সিদ্ধি এলো। ১৮৬৫ সালে ‘দুর্গেশনন্দিনী’ প্রকাশিত হয়। এ উপন্যাসের আগে বাংলা অন্য যেকোনো উপন্যাসের তুলনায় এটা পূর্ণাঙ্গ বিস্তৃত উপন্যাস। ‘দুর্গেশনন্দিনী’র গল্প, নায়ক-নায়িকা জগৎসিংহ-তিলোত্তমা-আয়েষা, শিল্পমান পাঠকের মনে বিশেষ জায়গা করে নেয়। ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করে। কী অবিশ্বাস্য নারী হৃদয়ের অবিশ্বাস্য আকুতির সাহসী প্রকাশ ‘এই বন্দীই আমার প্রাণেশ্বর’। বাংলা উপন্যাসের নারীর চিরাচরিত গতানুগতিকতা ভাঙা এক উচ্চারণ ধ্বনিত হলো— যা বাংলা সাহিত্যে শুধু নতুন নয়, বাঙালি নারীর হৃদয়ের এই প্রকাশও নতুন। এখানে শক্তিমত্তার অবিশ্বাস্য প্রকাশ ঘটেছে। নকখানি মর্যাদা দিয়ে দেখা দরকার, না হলে অনেক স্বাদ মুঠোর ফাঁক দিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে– এরূপ স্পষ্ট চিন্তা আজকাল আসছে।
বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসে পাশ্চাত্য প্রভাব আছে। প্রধানত বঙ্কিমকে ‘বাংলার স্কট’ বলার যে আখ্যা সেটি এ কারণেই এসেছে। তবে উপনাসের পাশ্চাত্যরীতি বঙ্কিম যতই গ্রহণ করুন না কেন, দেশীয় ঐতিহ্য ও প্রবণতা তিনি অস্বীকার করেননি। আর তা করলে বঙ্কিম উপন্যাস এত জনপ্রিয়ও হতো না, হয়ত শিল্পসমৃদ্ধিও পেত না। বঙ্কিম সমসাময়িককালে অনেকেই উপন্যাস লিখেছেন কিন্তু কেউই তেমন জনপ্রিয় হননি। অথচ বঙ্কিমের জনপ্রিয়তা উত্তুঙ্গস্পর্শী। বঙ্কিমচন্দ্র তার উপন্যাসে সেকালের সামাজিক পরিবর্তনের সমস্যা-জটিলতা তুলে ধরেছেন। নানা রকমের উপন্যাস লেখেন বঙ্কিমচন্দ্র। ঐতিহাসিক-সামাজিক-পারিবারিক-রাজনৈতিক উপন্যাস। এসব উপন্যাসে নতুন আত্মপ্রত্যয় ধ্বনিত হয়। জীবনের রোমাঞ্চ ও রোমান্টিকতা সম্পর্কে দেওয়া হয় নতুন প্ররোচনা। এসব উপন্যাসে বঙ্কিম জীবন সমাজ ও সামগ্রিক বিশ্বাসকে সত্যে পরিণত করেন। তবে এটা সত্য যে, বঙ্কিমের উপন্যাসের জীবন রূপায়ণ সে সময়ে খুব সহজ কাজ ছিল না। কারণ সমাজের অন্ধকারাচ্ছন্নতা, কুসংস্কার ও শাস্ত্রীয় রীতি– তার সময়ে ছিল উন্মুখর। এগুলো শিল্পরচনার ক্ষেত্রে অবশ্যই ছিল দ্বিধা এবং বাধার দ্যোতক। যে দ্বিধাগ্রস্ত সময়ে তিনি উপন্যাস লিখতে উদ্যত হন তখন তার জীবনও ছিল সংশয়পূর্ণ। কিন্তু অদম্য শিল্পক্ষুধা তাকে প্রণোদনা জোগায়। বিশেষত পাশ্চাত্য উপন্যাসগুলো তাকে নানাভাবে উদ্দীপিত করে। বঙ্কিমের প্রায় সব উপন্যাসেই ইতিহাসের আঁচড় আছে। ইতিহাসের প্রতি অনুরাগবশত যতটা, তার চেয়ে বেশি ছিল নিজের উপন্যাস লেখার জন্য তীব্র উৎসাহ। ইতিহাসকে পটভূমি হিসেবে রেখে তিনি কাহিনি গদ্য রচনায় প্রবৃত্ত হন। তার রচিত প্রায় সব উপন্যাসে ইতিহাস আছে এবং এর ভেতর দিয়ে তিনি পৌঁছাতে চেয়েছেন আবেগ ভক্তির নির্বিচার তোষণ পরিচর্যা অস্বীকার করে জীবনের উল্লাসকে ধারণ করতে।
‘চন্দ্রশেখর’ উপন্যাসে জনসন ও গলস্টন প্রতাপের গৃহদ্বারের রুদ্ধ কপাটে যেভাবে পদাঘাত করেছিল, সেই পদাঘাত ছিল ভারতে প্রথম যুগের ইংরেজদের বলদৃপ্ত, মদগর্বিত আত্মাভিমানের যেন মূর্ত বিকাশ– এই এক পদাঘাতেই ব্রিটিশদের আসল রহস্যটি আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে ওঠে। ‘মৃণালিনী’তে মুসলমান বিপ্লবের পর বখতিয়ার খিলজির সম্মুখে প্রভুদ্রোহী, বিশ্বাসঘাতক পশুপতির যে বিবেকভীরু, কর্তব্যবিমূঢ়, অর্ধ-অনুশোচনা, অর্ধ-আত্মপ্রসাদমিশ্রিত ভাব তা ঠিক ঐতিহাসিক সত্য না হলেও উচ্চমার্গের ঐতিহাসিক কল্পনার পরিচয় দিয়েছে। ‘রাজসিংহ’ উপন্যাসে আরঙ্গজেবের যে কুটিলতা, হাসির আবরণের মধ্যে বজ্রকঠিন প্রকৃতির পরিচয় আছে। এই সব ক্ষেত্রে বঙ্কিমচন্দ্র একটি প্রমাণনিরপেক্ষ সহজ সংস্কারের দ্বারা ইতিহাসের একেবারে মর্মস্থানে আঘাত করেন।
বঙ্কিমের উপন্যাসের মাধ্যমে পাঠক এক নতুন জগতের সন্ধান পান; যে জগত তাদের নিজস্ব। কিন্তু তা অচেনা ও অজানা ছিল অথবা প্রকাশের আড়ালেই পড়ে ছিল। রীতিবিরুদ্ধ যে মানবসম্পর্ক সমাজ-ধর্মকে তোয়াক্কা না করে সমাজ-ধর্মের ভেতরেই বেড়ে উঠছিল, বঙ্কিমচন্দ্র সেটিকে উপন্যাসের উপজীব্য করে পাঠকের সম্মুখে তুলে আনেন। ‘বিষবৃক্ষ’ ও ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ বাংলা সাহিত্যে এক নতুন বার্তা হয়ে ওঠে। বিধবাদেরও যে আশা-আকাঙ্ক্ষা, কামনা-বাসনা, আবেগ, আশা-নিরাশার দ্বন্দ্ব, স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণা, ক্ষত-বিক্ষত হৃদয় যে থাকে, বিয়ে-বহির্ভূত সম্পর্ক যে তাদের জীবনেরও অংশ– তার অসাধারণ রূপায়ণ ঘটান কুন্দনন্দিনী ও রোহিনী চরিত্র সৃষ্টির মাধ্যমে। নগেন্দ্র বিবাহিত জীবনে স্ত্রী সূর্যমুখীকে নিয়ে সুখী জীবন কাটানো অবস্থায় কুন্দনন্দিনী তাদের জীবনে ঢুকে পড়ে। ঢুকে পড়ে বলার চেয়ে বোধহয় এটা বলাই যৌক্তিক হবে যে, নগেন্দ্র কুন্দনন্দিনীর প্রতি অসম্ভব রকম মুগ্ধ হয়ে কৌশলগতভাবে নিজের জীবনে জড়িয়ে নিয়েছে— যা তাদের সংসার জীবনে বিষবৃক্ষের জন্ম দেয়, যা সমাজজীবনের রীতির বিরুদ্ধে প্রবল একটা ধাক্কাস্বরূপ। যেখানে রূপ-লাবণ্য-মোহ প্রধান শক্তি হয়ে ধর্ম ও রীতিতে বন্দি স্বামী-অন্তপ্রাণ সূর্যমুখীকে সংসারচ্যুত করেছে, যদিও সে পরে ফিরে এসেছে। কিন্তু বাঁচতে পারেনি কুন্দ। নগেন্দ্রনাথের অদম্য মোহের বলি হয়েছে সে। নগেন্দ্রকে বিশ্বাস করে বিধবা কুন্দ তাকে ভালোবেসেছে, বিয়ে করেছে এবং বিষপানে তাকে হত্যা করা হয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্র রীতির পক্ষে, নীতির পক্ষে, সমাজের পক্ষেই দাঁড়িয়ে থেকেছেন, যেখানে জীবন তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি। নীতিবাদী বঙ্কিমের কাছে শিল্পী বঙ্কিমের মৃত্যু হয়েছে। দেবেন্দ্রের পাপাচারী যে জীবন সে জীবনও সমাজবিরুদ্ধ। দেবেন্দ্রের জীবনের জটিলতা, নারীর প্রতি অদম্য নির্লজ্জ লোভ, হীরার অপ্রতিরোধ্য প্রেমাকাঙ্ক্ষা, ঈর্ষার আগুনে ভস্মীভূত মন, প্রতিশোধপরায়ণতা– এসবই সেই সমাজের রীতি ভাঙার দুঃসাহসী প্রয়াস। একই ঘটনা কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসেও ঘটেছে। ভ্রমরের সঙ্গে গোবিন্দলালের যে দাম্পত্যজীবন ছিল, তাতে কোনো সমস্যা ছিল না, বরং সুখেরই ছিল। রোহিনীকে কেন্দ্র করে তাদের দাম্পত্যজীবনে ভয়াবহ সংকট ও সমস্যা তৈরি হয়েছে। গোবিন্দলাল সমাজ-ধর্ম, রীতি-নীতি সব ভেঙে তছনছ করে রোহিনীর সঙ্গে থেকেছে। তাকে সেবাদাসী করে রেখেছিল। স্ত্রীর মর্যাদা দেয়নি। শেষপর্যন্ত তাকে হত্যাও করেছে। রূপজ মোহের কাছে সব ভেঙে পড়েছে। সে সময়ে পরিবার-সমাজ-ধর্মের বাইরে বেরিয়ে এসে কোনো নারীর সঙ্গে এভাবে অবাধ থাকাটা সহজ বিষয় ছিল না, যেটা গোবিন্দলাল করে দেখিয়েছে। এতে গোবিন্দলালের ভোগবাদী মানসিকতার নগ্ন প্রকাশ ঘটেছে। কিন্তু রোহিনীর স্বপ্ন ছিল একটি সংসার, শুধু শরীরী ভোগ-পিপাসা নয়। সে কারণে রোহিনী গোবিন্দলালের সঙ্গে প্রসাদপুরে গিয়ে থেকেছে।
প্রসাদপুরকে একেবারে আলাদা এক ভূখণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা যায়। গোবিন্দলালের সঙ্গে সেখানে স্বামী-স্ত্রীর মতো জীবন ভোগ করলেও বাস্তবে স্বামী-স্ত্রী হতে পারেনি তারা। রোহিনী নিজেকে বিলিয়ে দিয়েও তা লাভ করতে পারেনি। কারণ দুজনের চাওয়া ছিল দু’রকমের। একজন পরিবারে বন্দি হতে চেয়েছে স্ত্রীর অধিকারে– পরিপূর্ণ একটি সংসার লাভে বৃহৎজীবনে। অন্যদিকে গোবিন্দলাল সম্পূর্ণভাবে ভোগে মত্ত থেকেছে; শরীরলোভী। সেখানে পরিবার-সমাজ-ধর্ম-রীতি-নীতির কোনো ধার ধারেনি সে। কিন্তু তার মনের ভেতরে পুরোটাই থেকেছে ভ্রমর। রোহিনী যখন বুঝতে পেরেছে বাস্তবে গোবিন্দলালকে স্বামী হিসেবে পাওয়া সম্ভব নয়, গোবিন্দলালের সেবাদাসী ভিন্ন সে অন্য আর কিছু নয়, তখনই সে নিশিকান্তের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছে, সেখানেও স্বপ্ন ছিল স্বামী-সংসার। আর এটাই অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে ভোগবাদী গোবিন্দলালের কাছে। যার শাস্তি নির্ধারিত হয়েছে মৃত্যু। মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে রোহিনী তার মনের বাসনা স্পষ্ট করে গোবিন্দলালকে জানিয়েছে। কিন্তু গোবিন্দলাল তাতে কোনো গুরুত্ব না দিয়ে তাকে হত্যা করেছে। সমাজবিরুদ্ধ এ ধরনের উপন্যাসের ভিত মূলত বঙ্কিমের হাতেই প্রথম প্রতিষ্ঠা পায়।