সুন্দরগঞ্জে একাডেমিক সুপারভাইজারের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ
ছবি সংগৃহীত

গাইবান্ধা প্রতিনিধি: গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার বেলাল হোসেনের বিরুদ্ধে।

অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত সরকারি বিধি-বিধান অনুসরণ না করে কার্যালয়ে বসেই অর্থের বিনিময়ে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের কমিটি গঠন করা হচ্ছে। যোগসাজশে কমিটি গঠনের বিষয়ে অভিভাবক সদস্য ও এলাকাবাসীর স্বাক্ষরিত একটি লিখিত অভিযোগ গত ১৬ এপ্রিল মাদ্রাসা বোর্ডের রেজিস্ট্রার বরাবর দাখিল করা হয়।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা একাডেমিক শিক্ষা অফিসার বেলাল হোসেন দীর্ঘ প্রায় ১ যুগ ধরে সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তারই ধারাবাহিকতায় গোপনে আঁতাত করে অর্থের বিনিময়ে প্রায় সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কমিটির নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। তার চাহিদা মতো অর্থ দিতে ব্যর্থ হলেই ক্ষমতা রেখে মানুষিক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে ভুক্তভোগীদের।

এদিকে তার বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ উঠলেও প্রশাসনিকভাবে কোন ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন অনেকে। অতিদ্রুত তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। 

অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, কোনো ধরনের প্রচার-প্রচারণা ছাড়াই এবং অভিভাবকদের অবগত না করে মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত সুপার মো. আব্দুল ওয়াহেদ মিয়া ও একাডেমিক সুপারভাইজারের যোগসাজশে কমিটি গঠন করা হয়েছে।

স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ও সংশ্লিষ্টদের দাবি, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে তফসিল ঘোষণা, প্রচার-প্রচারণা, মনোনয়নপত্র বিতরণ ও গ্রহণ, যাচাই-বাছাইসহ একটি স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণ বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে এসব প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে কমিটি গঠনের অভিযোগ উঠেছে, যা শিক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়, যেসব প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ দিতে সক্ষম হচ্ছে, তাদের কমিটি দ্রুত অনুমোদন পাচ্ছে।

অন্যদিকে, যারা অর্থ দিতে পারছে না, তাদের ক্ষেত্রে বিভিন্ন জটিলতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। এতে প্রতিষ্ঠান প্রধান ও শিক্ষকদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বাড়ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সাঁচা নাছিরন নেছা দাখিল মাদ্রাসায় ম্যানেজিং কমিটি গঠন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে জটিলতা রয়েছে। ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে আব্দুর রাজ্জাক সরকার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। তবে ২০১২ সালে তাকে বাদ দিয়ে শামস উদ্দিন আকন্দকে প্রতিষ্ঠাতা সদস্য দেখিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়।

এ ঘটনায় আব্দুর রাজ্জাক সরকার ২০১৩ সালে গাইবান্ধা সহকারী সিনিয়র জজ আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন (মামলা নং: অন্য-২১০/১৩)। দীর্ঘ শুনানি শেষে ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২১ তারিখে আদালত ওই কমিটিকে অবৈধ ঘোষণা করেন এবং তাকে আজীবন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে বহাল রাখার নির্দেশ দেন।

অভিযোগ রয়েছে, আদালতের রায় থাকা সত্ত্বেও ২০২৫ সালের শেষ দিকে নতুন করে ভোটার তালিকা প্রণয়ন ছাড়াই পূর্বের আদলে একটি ম্যানেজিং কমিটি গঠন করা হয়। এতে প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের পদ শূন্য দেখানো হয়েছে বলে দাবি উঠেছে, যা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে নতুন করে প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রিজাইডিং অফিসারের দায়িত্বে থাকা একাডেমিক সুপারভাইজার কার্যালয়ে বসেই এই কমিটি গঠন করেছেন, যা আইনগতভাবে কতটা বৈধ—তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রতিষ্ঠান প্রধান বলেন, নির্ধারিত অর্থ দিতে না পারায় আমাদের প্রতিষ্ঠানে নিয়ম অনুযায়ী কমিটি গঠন করা হলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি করা হচ্ছে।”

এ বিষয়ে জানতে চাইলে একাডেমিক সুপারভাইজার বেলাল হোসেন বলেন, প্রতিষ্ঠান প্রধানকে দায়িত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে। তবে শিক্ষক প্রতিনিধি নির্বাচনে তার উপস্থিতি না থাকা প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে তিনি স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেননি।

এদিকে বিষয়টি নিয়ে অভিভাবক ও সচেতন মহলে উদ্বেগ বিরাজ করছে। তাদের আশঙ্কা, এ ধরনের অনিয়ম চলতে থাকলে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে এবং শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এ বিষয়ে গাইবান্ধা জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মো. আতাউর রহমানের বলেন, এ বিষয়ে অভিযোগ পেলে তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে অফিসিয়াল ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইফফাত জাহান তুলি জানান, তিনি বিষয়টি জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শিক্ষাকে বিষয়টি অবহিত করেছেন। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

—জা. অর্থনীতি/এনজে