ইভিতে ছাড়, রিকন্ডিশন্ড গাড়িতে বাড়তি করে উদ্বেগে বারভিডা
ছবি সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক: ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করতে বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি) ও প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির জন্য বড় ধরনের কর ছাড়ের প্রস্তাব দিয়েছে সরকার। তবে একই বাজেটে মধ্যম সারির জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত রিকন্ডিশন্ড গাড়ির ওপর করভার বাড়ানোর প্রস্তাবকে বৈষম্যমূলক আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিক্যালস ইম্পোর্টার্স অ্যান্ড ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বারভিডা)।

সংগঠনটির দাবি, বর্তমান প্রস্তাব কার্যকর হলে দেশের মধ্যবিত্ত ক্রেতারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, সংকটে পড়বে কয়েক হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ এবং শেষ পর্যন্ত সরকারের রাজস্ব আয়ও কমে যেতে পারে।

প্রস্তাবিত বাজেটে ২৫ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত মূল্যের আমদানিকৃত বৈদ্যুতিক যানবাহনের মোট করহার ৯৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬৪ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত মূল্যের ইভির ক্ষেত্রে মোট করভার কমে ৮০ শতাংশ হবে। এছাড়া প্লাগ-ইন হাইব্রিড বৈদ্যুতিক গাড়ির সম্পূরক শুল্ক কমানো এবং ১ হাজার ৮০০ সিসি পর্যন্ত ইঞ্জিন ক্ষমতার গাড়ির ওপর থেকে রেগুলেটরি শুল্ক প্রত্যাহারের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

এর ফলে এক হাজার ৮০০ সিসি পর্যন্ত প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির মোট করহার ৯৩ দশমিক ১৬ শতাংশ থেকে কমে ৭৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ হবে। ২ হাজার সিসি পর্যন্ত প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির ক্ষেত্রে করভার ১৩২ দশমিক ৩৬ শতাংশ থেকে কমে ৯৬ দশমিক ১০ শতাংশে নেমে আসবে। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়াতে আমদানিকৃত ইভি চার্জার ও চার্জিং স্টেশনের ওপর থেকে সব ধরনের শুল্ক ও কর প্রত্যাহারের প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।

সরকার বলছে, দূষণ কমানো, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতের পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতেই এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে একই বাজেটে এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৬০০ সিসি ইঞ্জিন ক্ষমতার জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত রিকন্ডিশন্ড গাড়ির মোট করভার ১৩২ দশমিক ৩৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে প্রায় ১৫৯ দশমিক ৮০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করেছে বারভিডা।

শনিবার রাজধানীর ঢাকা ক্লাবের স্যামসন এইচ চৌধুরী হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সভাপতি আবদুল হক বলেন, ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব বাজেট হিসেবে সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে, বারভিডা সেটিকে স্বাগত জানায়। তবে পরিবহন খাতে কিছু সিদ্ধান্ত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়নি। বিশেষ করে রিকন্ডিশন্ড মোটরযানের ওপর বাড়তি কর আরোপ বিদ্যমান বৈষম্য আরও বাড়াবে এবং একটি বৃহৎ শিল্পকে সংকটের মুখে ফেলবে।

তিনি বলেন, প্রায় ৪ দশক ধরে জাপানের আধুনিক প্রযুক্তির রিকন্ডিশন্ড মোটরযান আমদানির মাধ্যমে দেশের পরিবহন খাতের উন্নয়নে অবদান রেখে আসছে বারভিডা। বর্তমানে এ খাতে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার স্থানীয় বিনিয়োগ রয়েছে। বছরে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব সরকারের কোষাগারে জমা হয়। এছাড়া ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজসহ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। ব্যাংক, লিজিং, বিমা, গাড়ির যন্ত্রাংশ ও সার্ভিসিং শিল্পেরও বড় অংশ এই খাতের ওপর নির্ভরশীল।

সংগঠনটির দাবি, সরকার বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য কর ছাড় দিলেও দেশে এখনো প্রয়োজনীয় চার্জিং অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। অন্যদিকে জ্বালানি সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব হাইব্রিড গাড়ির ব্যবহার, রক্ষণাবেক্ষণ এবং যন্ত্রাংশ সরবরাহের একটি পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামো ইতোমধ্যে দেশে তৈরি হয়েছে। তাই কেবল ইভি নয়, হাইব্রিড ও রিকন্ডিশন্ড প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়িকেও সমান নীতিগত সহায়তা দেওয়া উচিত।

সংবাদ সম্মেলনে বারভিডা জানায়, প্রস্তাবিত বাজেটে পূর্বের এক থেকে এক হাজার ৫০০ সিসি স্ল্যাব ভেঙে এক থেকে এক হাজার ২০০ সিসি এবং এক হাজার ২০১ থেকে এক হাজার ৬০০ সিসি নামে নতুন স্ল্যাব তৈরি করা হয়েছে। একই সঙ্গে সবচেয়ে বেশি বিক্রীত ও জ্বালানি সাশ্রয়ী গাড়িগুলোর সম্পূরক শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। এতে মধ্যবিত্তের সবচেয়ে জনপ্রিয় গাড়িগুলোর দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাবে।

সংগঠনটির হিসাবে, কর বৃদ্ধির কারণে একটি ফুয়েলচালিত রিকন্ডিশন্ড টয়োটা প্রিমিওর দাম প্রায় ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত এবং একটি টয়োটা এক্সিওর দাম প্রায় আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। এতে মধ্যবিত্তের জন্য ব্যক্তিগত গাড়ি কেনা আরও কঠিন হয়ে পড়বে। পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ অনিশ্চয়তায় পড়বে এবং বিক্রি কমে যাওয়ায় সরকারের রাজস্ব আদায়ও কমে যেতে পারে।

বারভিডা আরও অভিযোগ করে, প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির ক্ষেত্রে নতুন গাড়ির জন্য সরকার কর সুবিধা দিলেও রিকন্ডিশন্ড গাড়ির ক্ষেত্রে সেই সুবিধা দেওয়া হয়নি। নতুন প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির জন্য রেগুলেটরি শুল্ক প্রত্যাহার করা হলেও রিকন্ডিশন্ড গাড়ির ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক বহাল রাখা হয়েছে।

সংগঠনটির মতে, এটি একই প্রযুক্তির দুটি গাড়ির মধ্যে অযৌক্তিক বৈষম্য সৃষ্টি করেছে এবং এর ফলে একটি বিশেষ ব্যবসায়ী গোষ্ঠী সুবিধা পেলেও রিকন্ডিশন্ড আমদানিকারকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

বারভিডা বলেছে, প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির সুবিধা শুধু নতুন গাড়ির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে রিকন্ডিশন্ড গাড়ির ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য করতে হবে। একই সঙ্গে এ সুবিধা মাইক্রোবাসের জন্যও কার্যকর করা প্রয়োজন। এছাড়া ২ হাজার ১ থেকে ২ হাজার ৫০০ সিসি পর্যন্ত প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির সম্পূরক শুল্ক ৩০ শতাংশ নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

তাদের মতে, এই সেগমেন্টে জাপানের উন্নত প্রযুক্তির বহু জ্বালানি সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব মডেল রয়েছে, যা বাংলাদেশের বাজারের জন্য উপযোগী।

নতুন ও রিকন্ডিশন্ড গাড়ির শুল্কায়ন ব্যবস্থায় বৈষম্যের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরে বারভিডা।

সংগঠনটির দাবি, বর্তমানে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানিতে ন্যূনতম ১৫৯ দশমিক ৮০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ এক হাজার ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক দিতে হয়। শুল্কায়ন মূল্যের এই বৈষম্যের কারণে অনেক ক্ষেত্রে রিকন্ডিশন্ড গাড়ির দাম নতুন গাড়ির চেয়েও বেশি হয়ে যাচ্ছে, যা বাজারে অসম প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করছে।

সংবাদ সম্মেলনে আবদুল হক সরকারের প্রতি ৩টি প্রধান দাবি তুলে ধরেন। এগুলো হলো—মধ্যম সারির জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত রিকন্ডিশন্ড গাড়ির ওপর আরোপিত বাড়তি কর প্রত্যাহার, ব্র্যান্ড নিউ ও রিকন্ডিশন্ড প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির জন্য সম্পূরক ও রেগুলেটরি শুল্ক সমান হারে নির্ধারণ এবং প্লাগ-ইন হাইব্রিডের মতো জ্বালানি সাশ্রয়ী হাইব্রিড গাড়িকেও একই ধরনের শুল্ক সুবিধার আওতায় আনা।

—জা. অর্থনীতি/এনজে