তাপপ্রবাহে বিপর্যস্ত ইউরোপ, ফ্রান্সে ১৮ জনের মৃত্যু

অনলাইন ডেস্ক: তীব্র তাপপ্রবাহে বিপর্যস্ত ইউরোপের বিভিন্ন দেশ। তীব্র তাপপ্রবাহের কবলে পড়ে ফ্রান্সের বিভিন্ন এলাকায় রোববার (২১ জুন) ও সোমবার (২২ জুন) মাত্র দুই দিনে কমপক্ষে ১৮ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। প্রাণ হারানো এই নাগরিকদের মধ্যে দুই শিশুও রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে দেশটির জরুরি বিভাগ।

একই সময়ে স্পেন, ইতালি ও ব্রিটেনেও তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেই এ ধরনের চরম আবহাওয়া ঘন ঘন দেখা দিচ্ছে ও আরও তীব্র হয়ে উঠছে।

সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে বলছে, ইউরোপজুড়ে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে ফ্রান্সে অন্তত ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে একটি গাড়ির ভেতর পাওয়া দুই শিশুও রয়েছে। আর এর মধ্যেই সোমবার (২২ জুন) দেশটির কয়েকটি শহরে তাপমাত্রা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে।

বিদ্যমান এই পরিস্থিতির কারণে ফ্রান্সের বিভিন্ন স্কুল বন্ধ রাখা হয়েছে অথবা শ্রেণি কার্যক্রমের সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। অন্যদিকে ব্রিটেনের আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করেছেন, চলতি সপ্তাহে দেশটিতে জুন মাসের তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙে যেতে পারে।

সোমবার ফ্রান্সের পশ্চিমাঞ্চলের ওয়াইন উৎপাদনকারী শহর বোর্দোতে তাপমাত্রা গত বছরের আগস্টের রেকর্ড ভেঙে ৪১ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়। মধ্য ফ্রান্সের পোয়তিয়ে শহরে তাপমাত্রা ওঠে ৪১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, যা ১৯৪৭ সালের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে যায়।

স্পেনের উত্তরাঞ্চলের তুলনামূলক শীতল শহর সান সেবাস্তিয়ানে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। রয়টার্স ক্লাইমেট মনিটরের তথ্য অনুযায়ী, এটি ২২ জুনের ঐতিহাসিক গড় তাপমাত্রার দ্বিগুণেরও বেশি।

এদিকে ফ্রান্সের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কার্পন্ত্রা শহরের এক প্রসিকিউটর জানান, ২ ও ৪ বছর বয়সী দুই শিশুকে তাদের মা বাড়ির বাইরে পারিবারিক গাড়ির ভেতরে অচেতন অবস্থায় খুঁজে পান। পরে উদ্ধারকর্মীরা তাদের বাঁচানোর চেষ্টা করলেও সফল হননি।

এছাড়া তাপপ্রবাহজনিত স্বাস্থ্য সমস্যায় বোর্দো অঞ্চলে ৮০ থেকে ৯৫ বছর বয়সী তিনজন বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে বলে গত রোববার রাতে ফ্রান্স টিভিকে জানান স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তা সোফি ব্রোকাস।

অন্যদিকে রোববার থেকে সোমবারের মধ্যে ফ্রান্সে পানিতে ডুবে ১৩ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এ ঘটনার পর ফরাসি সিভিল সেফটি সার্ভিসের মুখপাত্র জেরোম বুলাঞ্জে মানুষকে কেবল নির্দিষ্ট স্থানেই সাঁতার কাটার পরামর্শ দিয়েছেন।

তিনি বলেন, গত বছর তাপপ্রবাহের সময় গরম থেকে বাঁচতে পানিতে নামার প্রবণতা বাড়ায় ফ্রান্সে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা ১৭২ শতাংশ বেড়েছিল।

লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের চরম আবহাওয়া ও জলবায়ুবিষয়ক গবেষক ক্লেয়ার বার্নস বলেন, ইউরোপের বিস্তীর্ণ এলাকায় যে তাপপ্রবাহ চলছে, সেটি ‘ওমেগা ব্লক’ নামে পরিচিত। তিনি বলেন, ‘এটি উত্তর আফ্রিকার সাহারা মরুভূমি থেকে উষ্ণ বায়ু টেনে আনছে। এ কারণেই আমরা এত তীব্র গরম অনুভব করছি। এই আবহাওয়ার ধরণ খুব ধীরগতিতে পরিবর্তিত হয়, ফলে স্বস্তি দেয়ার মতো বাতাসও পাওয়া যাচ্ছে না।’

ব্রিটেনের জাতীয় আবহাওয়া দপ্তর মেট অফিস জানিয়েছে, চার দিনের তাপপ্রবাহের কারণে দেশটির কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যেতে পারে। স্পেনের আবহাওয়া সংস্থা এইমেটের মুখপাত্র রুবেন দেল কাম্পো বলেন, ‘বছরের এই সময়ে স্বাভাবিকের তুলনায় ৫ থেকে ১০ ডিগ্রি বেশি তাপমাত্রা দেখা যাচ্ছে। উত্তরাঞ্চলের কিছু এলাকায় তা গড়ের চেয়েও ১০ ডিগ্রির বেশি।’

এদিকে তাপপ্রবাহের কারণে সোমবার ইতালির ১২টি শহরে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এছাড়া বেলজিয়ামের তেমপ্লু শহরে অবস্থিত বন্যপ্রাণী পুনর্বাসন কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা রোমেন দে জায়েগেরে বলেন, অস্বাভাবিক গরমে ছাদের কার্নিশে বাসা বাঁধা সুইফট, সোয়ালো, চড়ুই ও স্টারলিংসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

তার ভাষায়, ‘কখনও কখনও ছাদের তাপমাত্রা ৫০ থেকে ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে যায়। ফলে বাসায় পুড়ে মারা যাওয়ার বদলে পাখিগুলো নিচে ঝাঁপ দেয়’। তিনি জানান, গত তিন দিনে তাদের আশ্রয়কেন্দ্রে ১৫০টি প্রাণী আনা হয়েছে।

তার মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপপ্রবাহ ও ঝড় আরও তীব্র হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন তাপমাত্রা বাড়ছে, অন্যদিকে বৃষ্টিপাতও বেশি হচ্ছে।

—জা. অর্থনীতি/এএইচএ