দস্যু আতঙ্কে বনে যাচ্ছেন না মৌয়ালরা: মধু আহরণ ৬ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন
ছবি সংগৃহীত

খুলনা প্রতিনিধি: চলতি বছর সুন্দরবন থেকে মধু আহরণ গত ৬ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। 

গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান বলছে, সুন্দরবনে মধু আহরণের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০২১ সালে সংগ্রহ হয়েছিল ৪ হাজার ৪৬৩ কুইন্টাল মধু, ২০২২ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৮ কুইন্টালে। ২০২৩ সালে সংগ্রহ হয় ২ হাজার ৮২৫ কুইন্টাল। ২০২৪ সালে কিছুটা বেড়ে হয়েছিল ৩ হাজার ১৮৩ কুইন্টাল, ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ২ হাজার ৭৬ কুইন্টালে। চলতি বছর সেই পরিমাণ আরও কমে হয়েছে ১ হাজার ৭৩৮ কুইন্টাল। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে মধু আহরণ কমেছে প্রায় ৪৫ শতাংশ।

বন বিভাগ বলছে, ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পর্যন্ত চলা মধু আহরণ মৌসুমে সুন্দরবন থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে এক হাজার ৭৩৮ কুইন্টাল মধু। এক বছরের ব্যবধানে পরিমাণ কমেছে ৩৩৮ কুইন্টাল।

চলতি মৌসুমে এক হাজার ৭৩৮ কুইন্টাল মধুর পাশাপাশি ৫২১ কুইন্টাল মৌমাছির মোম সংগ্রহ করা হয়েছে। এ থেকে সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছে ৩৯ লাখ ৩১ হাজার ২৭০ টাকা। গত বছর একই সময়ে মধু সংগ্রহ হয়েছিল ২ হাজার ৭৬ কুইন্টাল।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তুলনামূলকভাবে কমে যাওয়া বৃষ্টিপাত ও ফুলের ঘাটতি উৎপাদনে প্রভাব ফেলেছে।

তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বনদস্যুদের আতঙ্কে অনেক মৌয়াল এবার বনে যেতে সাহস পাননি।

সুন্দরবনের প্রধান মধু আহরণ এলাকা পূর্ব ও পশ্চিম বন বিভাগের আওতাধীন সাতক্ষীরা, খুলনা, চাঁদপাই ও শরণখোলা রেঞ্জ।

জানা গেছে, চলতি বছর সবচেয়ে বেশি ৮৭৭ কুইন্টাল মধু সংগ্রহ হয়েছে সাতক্ষীরা রেঞ্জে। খুলনা রেঞ্জে ৪৪০ কুইন্টাল, চাঁদপাই রেঞ্জে ২৮৮ কুইন্টাল এবং শরণখোলা রেঞ্জে ১৩৩ কুইন্টাল মধু সংগ্রহ করা হয়েছে।

মধু আহরণ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে সামনে এসেছে মৌয়ালের সংখ্যা হ্রাস।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে প্রায় ৮ হাজার মৌয়াল সুন্দরবনে গিয়েছিলেন। ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় প্রায় ৫ হাজারে। আর চলতি বছর বনে গেছেন মাত্র ৩ হাজার ৪৭৯ জন মৌয়াল। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে মৌয়ালের সংখ্যা অর্ধেকের বেশি কমে গেছে।

মৌয়ালদের ভাষ্য, বাঘের চেয়ে তাদের বড় আতঙ্ক বনদস্যুরা।

কয়রার গোবরা গ্রামের মৌয়াল জাহিদুল সানা জানান, ১১ সদস্যের একটি দল নিয়ে বনে যাওয়ার পর তাদের একজনকে জিম্মি করে বনদস্যুরা। মুক্তিপণ হিসেবে দাবি করা হয় এক লাখ ৬৫ হাজার টাকা। পরে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা দিয়ে তাকে ছাড়িয়ে আনতে হয়। 

তবে শুধু বনদস্যুদের আতঙ্ক নয়, পরিবেশগত কারণও মধু উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের প্রধান অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, মধু আহরণ মৌসুমের আগে পর্যাপ্ত বৃষ্টি হলে সুন্দরবনের গাছে বেশি ফুল ফোটে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় ফুলের পরিমাণও কমছে। 

সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জ কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম বলেন, গত বছর আমার রেঞ্জে ৬৯৯ জন মৌয়াল মধু আহরণে গিয়েছিলেন। এবার গেছেন মাত্র ২৬৭ জন। ফলে মধু সংগ্রহ ও রাজস্ব আয়—দুটিই কমেছে।

—জা. অর্থনীতি/এনজে