মহাকাশে প্রথম কোরআন তিলাওয়াতকারী আফগানীর ইন্তেকাল
ছবি: সংগৃহীত

মহাকাশের বুক থেকে ভেসে আসছিল পবিত্র কোরআনের সুর, আর প্রথমবার মহাশূন্যে প্রতিধ্বনিত হয়েছিল পশতু ভাষা। কোটি কোটি আফগান নাগরিকের চোখে জল আর গর্বের মিশ্রণ এনে দেওয়া সেই ঐতিহাসিক মহাজাগতিক যাত্রার নায়ক আর নেই। দীর্ঘদিন ক্যানসারের সাথে লড়াই করে জার্মানির স্টুটগার্ট শহরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেছেন আফগানিস্তানের প্রথম নভোচারী আবদুল আহাদ মোমান্ড। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৭ বছর। তার এই প্রয়াণে বিশ্বজুড়ে মহাকাশপ্রেমী ও আফগান সম্প্রদায়ের মাঝে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

১৯৫৯ সালের ১ জানুয়ারি আফগানিস্তানের গজনি প্রদেশে জন্ম নেওয়া এই বীর সন্তান তরুণ বয়সেই তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নে সামরিক বিমান চালনার ওপর উচ্চতর শিক্ষা নেন। দেশে ফিরে আফগান বিমান বাহিনীতে যুদ্ধবিমানচালক হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করে দ্রুতই নিজের মেধার স্বাক্ষর রাখেন।

তবে তার জীবনের এবং আফগান ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায়টি রচিত হয় ১৯৮৮ সালের ২৯ আগস্ট। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘সয়ুজ টিএম-৬’ মহাকাশযানে চড়ে তিনি পাড়ি জমান পৃথিবীর কক্ষপথে। এর মাধ্যমে বিশ্বের দরবারে প্রথম আফগান মহাকাশচারী হিসেবে নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখেন মোমান্ড। মীর স্পেস স্টেশনে টানা ৯ দিন অবস্থান করে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও আফগানিস্তানের ভূপ্রাকৃতিক ছবি তুলে ৭ সেপ্টেম্বর তিনি সফলভাবে পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তন করেন।

এই ঐতিহাসিক অভিযানের সময় আবদুল আহাদ মোমান্ড বেশ কিছু অনন্য রেকর্ড গড়েন, যা ইতিহাসে আজীবন অমর হয়ে থাকবে। গভীর শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের প্রতীক হিসেবে তিনি মহাকাশে নিজের সঙ্গে পবিত্র কোরআনের একটি কপি নিয়ে গিয়েছিলেন। মহাকাশ স্টেশন থেকে প্রথম ব্যক্তি হিসেবে কোরআন তিলাওয়াত করার গৌরব অর্জন করেন তিনি। একই সাথে মহাকাশ থেকে প্রথম মানুষ হিসেবে নিজের মাতৃভাষা 'পশতু'তে কথা বলে বিশ্ব দরবারে আফগান সংস্কৃতিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান।

তৎকালীন ভূরাজনীতিতেও এই অভিযানের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। ১৯৮৮ সালে আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত সেনা প্রত্যাহারের চূড়ান্ত মুহূর্তে মোমান্ডের এই মহাকাশযাত্রাকে দুই দেশের মধ্যকার বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার এক অনন্য প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও এই ঘটনাটি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

দুর্ভাগ্যবশত, নব্বইয়ের দশকে আফগানিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গৃহযুদ্ধের কারণে এই মহানায়কের অবদান অনেকটাই আড়ালে চলে যায়। বাধ্য হয়ে তিনি সপরিবারে জার্মানিতে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন এবং জীবনের বাকি সময় প্রবাসেই কাটিয়ে দেন। বর্তমান তালেবান শাসিত আফগানিস্তানের রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাষ্ট্রীয়ভাবে এই অর্জন খুব বেশি আলোচিত না হলেও, বিশ্ব ইতিহাস তাঁকে ভোঁলেনি। রাজনৈতিক পটভূমি যা-ই হোক না কেন, প্রতিকূলতার মাঝেও আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখানো আবদুল আহাদ মোমান্ড আগামী প্রজন্মের আফগান তরুণদের জন্য সর্বদা এক চিরউজ্জ্বল নক্ষত্র ও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবেন।

জা. অর্থনীতি/ উমার