নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি: সেতু আর কালভার্টগুলো দাঁড়িয়ে আছে ঠিকই, কিন্তু যে খালের ওপর সেগুলো নির্মিত হয়েছিল, সেই খালের অস্তিত্ব আজ অনেক স্থানেই বিলীন। কোথাও খালের জায়গা দখল করে গড়ে উঠেছে বাড়িঘর-দোকানপাট, আবার কোথাও মাটি ও বালু ফেলে খাল ভরাট করে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে আশপাশের জমির সঙ্গে। ফলে একসময়ের সচল নৌপথ এখন কেবল পুরোনো সেতু, কালভার্ট আর প্রবীণদের স্মৃতিতেই টিকে আছে।
মেঘনা, শীতলক্ষ্যা ও পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত সোনারগাঁ একসময় নদী-খালের সমৃদ্ধ জনপদ হিসেবে পরিচিত ছিল। স্থানীয়দের মতে, উপজেলায় একসময় শতাধিক খাল ছিল, যা কৃষিকাজ, নৌ-যোগাযোগ, পানি নিষ্কাশন এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। কিন্তু বছরের পর বছর অবৈধ দখল, ভরাট, অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ ও দূষণের কারণে অধিকাংশ খাল এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়—পানাম খাল, মারিখালী খাল, মোগরাপাড়া খাল, বারদী খাল, বৈদ্যেরবাজার খাল, জামপুর খাল, সাদীপুর খাল ও সনমান্দী খালসহ বিভিন্ন শাখা খাল দীর্ঘদিন ধরে দখল ও ভরাটের শিকার। পৌর এলাকার বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের সামনে দিঘিরপাড় এবং বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নের সাহাপুর এলাকায় কালভার্ট থাকলেও নিচ দিয়ে খালের স্বাভাবিক পানি প্রবাহের কোনো চিহ্ন নেই।
খাল দখলের এই প্রত্যক্ষ প্রভাব এখন পড়ছে জনজীবনে। পানি দ্রুত নিষ্কাশনের পথ না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় তীব্র জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। এতে সড়ক, বসতবাড়ি ও কৃষিজমিতে দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকায় জনদুর্ভোগ বাড়ার পাশাপাশি কৃষি উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। মারিখালী খাল দখলের বিষয়টি একসময় উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়ালেও, স্থানীয়দের দাবি—অধিকাংশ খাল দখলমুক্ত ও পুনরুদ্ধারে এখনো কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন সোসাইটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, "নদী, খাল ও বিল দখল ও ভরাট করা মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার কেড়ে নেওয়া। দখলকৃত খাল উদ্ধারে আমি প্রশাসনের নিকট জোর দাবি জানাচ্ছি।"
সোনারগাঁয়ের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ কমিটির আহ্বায়ক কবি ও প্রাবন্ধিক শাহেদ কায়েস বলেন, "খাল দখল মানে শুধু জলপথ দখল নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা ও পরিবেশকেও বিপন্ন করা। অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে খালকে তার স্বাভাবিক রূপ ফিরিয়ে দেওয়া এখন সময়ের দাবি। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।"
এ বিষয়ে সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসিফ আল জিনাত বলেন, "বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই খাল খনন ও পুনরুদ্ধারকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। উপজেলা প্রশাসনও এ বিষয়ে পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করছে। উপজেলার বেশ কয়েকটি খাল দখল হয়ে যাওয়ার খবর আমাদের কাছে রয়েছে এবং সেগুলো দখলমুক্ত করে পুনরুদ্ধারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কাজের অগ্রগতি দৃশ্যমান হলে গণমাধ্যমকে বিস্তারিত জানানো হবে।"
—জা. অর্থনীতি/এলএটি
