শফিকুল ইসলাম শামীম: রাজধানীর একটি খালের পাশে দাঁড়ালে দূর থেকে মনে হবে এটি যেন ময়লার ভাগাড়। কাছে গেলে বোঝা যায়, এটি আসলে একটি খাল। যার বুকজুড়ে ভাসছে নিষিদ্ধ পলিথিন, প্লাস্টিকের বর্জ্য এবং গৃহস্থালির আবর্জনা। কোথাও কোথাও পানির অস্তিত্বই চোখে পড়ে না।
খালের প্রবাহ থমকে গেছে, ড্রেনের মুখ বন্ধ হয়ে আছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই পানি উপচে উঠে রাস্তায়, বাজারে এবং আশপাশের এলাকায় সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। এর সঙ্গে বাড়ছে পরিবেশ দূষণ, মশা-মাছির উপদ্রব এবং জনভোগান্তি।
সরকার বহু বছর আগে পাতলা পলিথিন ব্যাগের উৎপাদন, বিপণন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। নিয়মিত অভিযানও পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবচিত্র ভিন্ন।
রাজধানীর প্রায় প্রতিটি কাঁচাবাজার, মুদি দোকান, মাছ-মাংসের দোকান কিংবা ফলের বাজারে এখনও অবাধে ব্যবহার হচ্ছে নিষিদ্ধ পলিথিন। ক্রেতা বাজার করছেন, আর ব্যবসায়ীরা সহজেই পলিথিনে ভরে দিচ্ছেন পণ্য। একবার ব্যবহার শেষে এসব পলিথিনের বড় অংশই চলে যাচ্ছে রাস্তায়, ড্রেনে কিংবা খালে।
ফলে নগরজুড়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংকট আরও তীব্র হচ্ছে। ড্রেন ও খালের মুখ পলিথিনে আটকে গিয়ে পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। সামান্য বৃষ্টিতেই সড়ক ডুবে যাচ্ছে, বাজারে হাঁটাচলা কঠিন হয়ে পড়ছে। প্রতিদিনের এই দুর্ভোগ এখন রাজধানীবাসীর নিত্যসঙ্গী।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, "আমরা এখনো অভ্যস্ত হতে পারিনি। আমার ময়লাটা ডাস্টবিনে ফেলতে হবে। বাইরের যে কোনো দেশে যান, সিঙ্গাপুরে যান, আমরা নিজেরা কিন্তু চকলেট খেয়ে প্যাকেট রাস্তায় ফেলি না। এটা সচেতনতা, এটা আমাদের বোধ। মানুষের মধ্যে এই ধারণা তৈরি করতে হবে। আমাকে আমার জায়গা পরিষ্কার রাখতে হবে।"
মন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, শুধু আইন করলেই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন নাগরিক দায়িত্ববোধ এবং আচরণগত পরিবর্তন।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, বাজার শেষে অনেকেই ব্যবহৃত পলিথিন ও অন্যান্য বর্জ্য ডাস্টবিনে না ফেলে রাস্তার পাশে বা ড্রেনে ফেলে দিচ্ছেন। দোকানিরাও দোকানের আবর্জনা অনেক সময় খালের পাশে বা উন্মুক্ত স্থানে ফেলে রাখছেন। বৃষ্টির পানিতে এসব বর্জ্য ভেসে গিয়ে ড্রেনের মুখ আটকে দিচ্ছে। ফলে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে তৈরি হচ্ছে জলাবদ্ধতা।
জলাবদ্ধতার কারণে শুধু চলাচলই ব্যাহত হয় না, ব্যবসা-বাণিজ্যেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বাজারে ক্রেতার সংখ্যা কমে যায়, পচনশীল পণ্যের ক্ষতি হয়, যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়। অনেক এলাকায় বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় দুর্ভোগ চরমে পৌঁছায়।
সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সবাই সমস্যার কথা জানেন, কিন্তু নিজের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অনেকেই উদাসীন। কেউ কেউ স্বীকার করেন, হাতের কাছে ডাস্টবিন না থাকায় রাস্তায় ফেলে দেন।
আবার অনেকেই বলেন, সবাই যখন ফেলছে তখন তারাও বাধ্য হয়ে একই কাজ করছেন। এই মানসিকতাই সমস্যাকে আরও গভীর করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পলিথিন শুধু জলাবদ্ধতার কারণ নয়, এটি পরিবেশের জন্যও ভয়াবহ হুমকি। মাটিতে মিশতে শত শত বছর সময় লাগে। ফলে কৃষিজমির উর্বরতা কমে যায়, জলাশনের প্রাণবৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং প্রাণীরা খাদ্যের সঙ্গে পলিথিন গ্রহণ করে মৃত্যুর ঝুঁকিতে পড়ে। খোলা জায়গায় পলিথিন পোড়ালে বিষাক্ত গ্যাস বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে, যা মানুষের শ্বাসযন্ত্রসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।
পরিবেশবিদদের মতে, নিষিদ্ধ পলিথিনের সহজলভ্যতা কমাতে উৎপাদন ও সরবরাহ বন্ধে আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাজারে সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী মূল্যে পাট, কাপড় কিংবা অন্যান্য পরিবেশবান্ধব ব্যাগ নিশ্চিত করতে হবে। বিকল্প ব্যবস্থা না থাকলে মানুষ পলিথিন ব্যবহার থেকে পুরোপুরি সরে আসবে না।
তারা আরও মনে করেন, জনসচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকে একযোগে কাজ করতে হবে। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সংরক্ষণের শিক্ষা দিতে হবে। পাশাপাশি প্রতিটি বাজার, বাসস্ট্যান্ড ও জনসমাগমস্থলে পর্যাপ্ত ডাস্টবিন স্থাপন এবং নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ নিশ্চিত করতে হবে।
রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে এখনও দেখা যায়, অধিকাংশ ক্রেতা সবজি, মাছ, মাংস ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পলিথিনে বহন করছেন। অনেকেই নিজের ব্যাগ সঙ্গে আনেন না। ব্যবসায়ীরাও সহজ সমাধান হিসেবে পলিথিন ব্যবহার করছেন। ফলে নিষেধাজ্ঞা কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে এর ব্যবহার বন্ধ হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আইন প্রয়োগ, নিয়মিত অভিযান, বিকল্প ব্যাগের সহজ প্রাপ্যতা এবং নাগরিক সচেতনতা—এই চারটি বিষয় একসঙ্গে কার্যকর করা গেলে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি সম্ভব। শুধু প্রশাসনের ওপর দায় চাপিয়ে দিলে হবে না। প্রতিটি নাগরিককে নিজের দায়িত্বও পালন করতে হবে।
একটি পরিচ্ছন্ন, বাসযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব নগর গড়ে তোলা শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়। রাস্তা, ড্রেন বা খালে একটি পলিথিন ফেলার আগে যদি প্রত্যেকে একবার ভাবেন, তাহলে জলাবদ্ধতার বড় একটি কারণ সহজেই কমিয়ে আনা সম্ভব। সচেতন নাগরিকের ছোট ছোট দায়িত্বশীল আচরণই পারে একটি শহরকে পরিচ্ছন্ন, সুস্থ এবং বাসযোগ্য করে তুলতে। নিষিদ্ধ পলিথিনের ব্যবহার বন্ধ, সঠিক স্থানে বর্জ্য ফেলা এবং পরিবেশবান্ধব অভ্যাস গড়ে তোলার মাধ্যমেই মিলতে পারে দীর্ঘদিনের এই সংকটের টেকসই সমাধান।
—জা. অর্থনীতি/এনজে
