'কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে'—পথভ্রষ্ট শিক্ষার্থীদের গুরুভক্তির পাঠ

রফিকুল ইসলাম |  আমার ছেলে আব্দুন নূর, সে ইংরেজি প্যারাগ্রাফ 'A Good Teacher' মানে 'একজন ভালো শিক্ষক' অনুচ্ছেদটি পড়ছিল।  স্মৃতি উঁকি দেয় মনের জানালায়, অন্যদের মতো আমারও তো শৈশবে 'Good Teacher' ছিলেন। কৃতজ্ঞে মন ভরে ওঠে। দু'কলম লেখার তাওফিক সৃষ্টিকর্তা যখন দিয়েছেন, তখন একটু চেষ্টা করে দেখা যাক না, এ থেকে যদি নতুন প্রজন্ম দিশা পায়!

‘কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে’ - শৈশবের কাঁচা মনে এই দর্শনের বীজ রোপণ করে গেছেন যিনি, তিনি হলেন পরম শ্রদ্ধাভাজন মো. আবুল হাসিম স্যার।

এই বক্ষমান নিবন্ধটি বর্তমান পরিস্থিতিতে 'কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে' - হাসিম স্যারের আপ্তবাক্যটি বখে যাওয়া  শিক্ষার্থীদের নৈতিক অবক্ষয় রোধে এবং সঠিক পথ দেখাতে একটি শক্তিশালী ও রূপান্তরমূলক জীবনদর্শন হিসেবে কাজ করতে পারে। এই ঐতিহ্যবাহী আপ্তবাক্যটি শুধু জাগতিক সাফল্যের চাবিকাঠি নয়, বরং এটি একদল পথভ্রষ্ট শিক্ষার্থীকে শৃঙ্খলা, ধৈর্য এবং গুরুভক্তির পাঠ শেখাতে সক্ষম।

'কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে'—এই আপ্তবাক্যটি কেবল একটি প্রবাদ নয়, এটি একটি জীবন গঠনের মূলমন্ত্র। একজন আদর্শ শিক্ষক যখন স্নেহ, মমতা এবং দৃঢ়তার সাথে এই মন্ত্রটি শিক্ষার্থীদের মনে বুনে দিতে পারবেন, তখনই শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের মর্যাদা বুঝবে এবং সমাজ এই চরম নৈতিক পতন থেকে মুক্তি পাবে।

আবুল হাসিম স্যার পেশায় একজন আদর্শ শিক্ষক ছিলেন। শিক্ষকতাকে কেবল একটি পেশা বা চাকরি হিসেবে নেননি, বরং এটিকে জীবনের একটি মহান ব্রত, আদর্শ ও সাধনা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। এতে তাঁর মধ্যে কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা গেছে। তন্মধ্যে আদর্শনিষ্ঠা, নিস্বার্থ ত্যাগ, সহানুভূতি, জ্ঞান বিতরণ অন্যতম।

আবুল হাসিম স্যার আমার মতো অনেকের শিক্ষক ছিলেন। একসময় কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা গোপদিঘী ইউনিয়নে অবস্থিত ১নং বগাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন তিনি। তাঁর বাড়ি নিকটবর্তী ধলাই গ্রামে।

'কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে' - হাসিম স্যারের এই আপ্তবাক্যটি কেবল একটি প্রচলিত কথন নয়, এটি মানবজীবনের চরম এক সত্যের দলিল। এছাড়া কাঙ্ক্ষিত সাফল্যে সত্যিকারের মানুষ গড়তে যেন এক মন্ত্র। যে কথা বা উপদেশ সন্দেহাতীতভাবে সত্য ও পালনযোগ্য বলে ধরে নেওয়া হয়, তা-ই আপ্তবাক্য।

হাসিম স্যার বলতেন, শৃঙ্খলাবোধ, নৈতিকতা, কঠোর পরিশ্রম, ত্যাগ এবং নিষ্ঠা ছাড়া জীবনে কোনো মহৎ বা স্থায়ী অর্জন সম্ভব নয়। 

প্রতিটি মানুষের জীবনের প্রথম দিকনির্দেশক হলেন তাঁর প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকেরা। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ থাকেন স্বভাবগতভাবে অত্যন্ত কড়া, নিয়মানুবর্তী এবং আপসহীন। কিন্ত এই কঠোরতার আড়ালেই লুকিয়ে থাকে এক সুগভীর আদর্শবাদ ও শিক্ষার্থীদের প্রতি অকৃত্রিম স্নেহ ও ভালোবাসা। তেমনই একজন শিক্ষক হলেন আবুল হাসিম স্যার।

একজন কড়া অথচ আদর্শবাদী শিক্ষকের মুখ থেকে শোনা 'কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে’ - এ আপ্তবাক্যটি কীভাবে একজন শিশুদের জীবনকে আমূল বদলে দিতে পারে এবং সমাজ বিনির্মাণে ভূমিকা রাখে, এই নিবন্ধে সেই জীবনদর্শনই উন্মোচিত হয়েছে।

'কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে'—এই ছোট্ট আপ্তবাক্যটির ভেতরে লুকিয়ে আছে জীবনের এক গভীর বাস্তব সত্য।

হাসিম স্যার আমাদের বুঝাতেন, এখানে ‘কষ্ট’ মানে শুধু শারীরিক পরিশ্রম নয়; বরং ধৈর্য, অধ্যবসায়, ত্যাগ এবং বারবার ব্যর্থ হয়েও আবার ওঠে দাঁড়ানোর মানসিক শক্তি। আর ‘কেষ্ট’ বলতে বোঝানো হয়েছে সাফল্য, প্রাপ্তি বা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য। অর্থাৎ, জীবনে কোনো কিছু সহজে আসে না—যা মূল্যবান, তা অর্জন করতে হলে প্রয়োজন সময়, শ্রম এবং দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি।

বাস্তব জীবনের উদাহরণ টেনে আমাদের বলতেন, যারা বড় কিছু অর্জন করেছেন, তারা কেউই সহজ পথ বেছে নেননি। তারা বাধা, সমালোচনা, ব্যর্থতা—সবকিছুকে সহ্য করে সামনে এগিয়েছেন। অনেক সময় মানুষ মাঝপথে হাল ছেড়ে দেয়, কারণ সে তৎক্ষণাৎ ফল পায় না। 

হাসিম স্যারের এই আপ্তবাক্যটি আমাদের শেখিয়েছে—সফলতার ফল পেতে হলে ধৈর্য ধরে লেগে থাকতে হয়। যেমন একটি বীজ বপন করার পর সঙ্গে সঙ্গে গাছ পাওয়া যায় না; সময়, যত্ন আর নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে একদিন তা ফল দেয়।

হাসিম স্যারের পাঠদান অনুযায়ী এই আপ্তবাক্যটি আমাদের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—সঠিক পথে কষ্ট করা জরুরি। তাছাড়া শুধু কষ্ট করলেই হবে না, সেই কষ্ট হতে হবে সৎ ও সঠিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত। অন্যায় বা শর্টকাট পথ হয়তো সাময়িক লাভ এনে দিতে পারে, কিন্তু তা স্থায়ী সাফল্য দেয় না। প্রকৃত ‘কেষ্ট’ তখনই পাওয়া যায়, যখন পরিশ্রমের সাথে সততা ও নৈতিকতা যুক্ত থাকে।

হাসিম স্যারের 'কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে' - এ আপ্তবাক্যটি শুধু একটি কথা নয়, এটি একটি জীবনদর্শন। শিক্ষার্থী যারা এই দর্শনকে হৃদয়ে ধারণ করে পরিশ্রম করেছে, তারা তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছেছে। 

তাই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের উচিত ধৈর্য, পরিশ্রম এবং আত্মবিশ্বাসকে সঙ্গী করে এগিয়ে চলা—কারণ কষ্টের পথই শেষ পর্যন্ত সাফল্যের দরজা খুলে দেয়।

কড়া শিক্ষক বলতে আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে হাসিম স্যারের গম্ভীর মুখচ্ছবি। তাঁর হাতে হয়তো থাকে একটি বেত কিংবা চোখে থাকে চশমার ওপর দিয়ে তাকানো এক তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। ক্লাসে তাঁর প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই এক পিনপতন নিরবতা নেমে আসত। বাড়ির পড়া শিখে না এলে, পড়া না পারলে কিংবা হাতের লেখা বাড়ি থেকে না করে আসলে তাঁর শাসন থেকে রেহাই পেত না কেউ।

কিন্তু হাসিম স্যারের এই বাহ্যিক কঠোরতা কোনো নিষ্ঠুরতা ছিল না। এটি আসলে একজন দক্ষ ভাস্করের হাতুড়ির আঘাতের মতো, যা পাথর কেটে সুন্দর শিল্পকর্ম তৈরি করে। 

কড়া শাসনের পর হাসিম স্যার নরম ও মায়াবী গলায় বলতেন, শৈশবের কাদা মাটিকে যদি সঠিক সময়ে শক্ত শাসনে রূপ না দেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যতের ঝড়-ঝাপটায় তা ভেঙে পড়বে। 

এই জন্যই হয়তো তাঁর এই ‘কড়া’ রূপটির পেছনে ছিল একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য—শিক্ষার্থীদের অলসতা ও উদাসীনতা দূর করে তাদের ভেতর লুকিয়ে থাকা প্রতিভাকে জাগিয়ে তোলা। 

হাসিম স্যার একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে এই কথাগুলোই বারবার তাঁর শিক্ষার্থীদের স্মরণ করিয়ে দিতেন। এছাড়া কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়ার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার মানসিকতা গড়ে তুলতে এবং ফাঁকিবাজি না করে নিজের কাজের প্রতি যত্নবান ও সৎ থাকতে বলতেন। কেননা, সস্তা বা সহজ উপায়ে যা পাওয়া যায়, তার স্থায়িত্ব কম। প্রকৃত আনন্দ ও গৌরব লুকিয়ে থাকে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্জিত সাফল্যের মধ্যে।

কড়া ওই হাসিম স্যারের ক্লাসের দিনগুলোর কথা মনে পড়লে আজও গা শিউরে ওঠে, আবার শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে। 

আমি ক্লাস ওয়ান থেকে ফাইভ পর্যন্ত ফার্স্টবয় ছিলাম। বরাবরই বাড়ির পড়া সম্পন্ন করে স্কুলে যেতাম। একদিন হলো কি, বাড়ির পড়ায় আটকে যায়। আর অমনিই কানমলা আর পিটুনি কারে কয়!

আমি একটু প্রভাব প্রতিপত্তিশালী পরিবারের সন্তান ছিলাম। তাই শিশুসুলভ মনে স্যারকে একহাত নিতে বাড়িতে এসে কাুঁদুকাঁদু হয়ে আব্বার কাছে বিচার দিলাম।

এতে আব্বা জানতে চাইলেন, স্যারে মারছে কিয়ের লাইগ্যা?

বললাম, পড়া একটু পারছিলাম না।

আব্বা ফের আমার কাছে জানতে চাইলেন, দোষটা তাইলে কার?

আমার নিরবতা দেখে আব্বা আমাকে বজ্রপাতের মতো গর্জে থাবা দিয়ে ধরে স্যারের সামনে নিয়ে আছাড় মেরে ফেলে দিয়ে বলেন - 'এই মাস্টর, নেও তোমার ছাত্র। আব্বা আবার আমাকে মারতে ধরার জন্য তেড়ে আসেন।

শেষে আব্বার হাত থেকে আমাকে বাঁচিয়ে হাসিম স্যার নিজ দায়িত্বের অটল হাসি হেসে বললেন - কীরে, কোন মাইরটা মজা বেশি?

এতে কি আর কোনো জবাব আছে!

যারা পড়া পারত না, তাদের তিনি শুধু শাস্তিই দিতেন না, বরং বাড়তি সময় নিয়ে যত্নে বুঝিয়ে দিতেন। 

তাঁর এই শাসনের পেছনে কোনো ব্যক্তিগত আক্রোশ ছিল না, ছিল দায়বদ্ধতা। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রতিটি শিশুই সম্ভাবনাময়; শুধু তাদের অলসতার দেয়ালটি ভেঙে দেওয়া প্রয়োজন। সকালের কড়া রোদ যেমন দুপুরের ফসল ফলায়, শিক্ষকের সেই কড়া শাসনও তেমনি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলেছেন।

একজন আদর্শ প্রাইমারি স্কুলশিক্ষক শিশুদের কচি মন গড়ে তোলেন। হাসিম স্যার তেমনি একজন বরেণ্য শিক্ষক। তাঁর মধ্যে ছিল অগাধ ধৈর্য, মাতৃসুলভ স্নেহ, সহজ ও আকর্ষণীয় পাঠদান ক্ষমতা, শিশুমনস্তত্ত্বের জ্ঞান এবং উচ্চ নৈতিক চরিত্র। 

তিনি ছাত্রজীবনে হবিগঞ্জ জেলার মাটিকাটা পীর সাহেবের খেদমতে ও সান্নিধ্যে দীর্ঘদিন কাটিয়ে ধর্মীয় বিষয়েও পাণ্ডিত্য লাভ করেছিলেন, সমাজেও যার প্রতিফলন ঘটিয়েছিলেন।

এছাড়া হাসিম স্যার তাঁর অসাধারণ নেতৃত্বের গুণাবলি, দূরদর্শিতা এবং দিকনির্দেশনামূলক দক্ষতার জন্য সবার কাছে অত্যন্ত বরেণ্য ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। একজন সফল শিক্ষক নেতা হিসেবে তিনি অনুসারীদের অনুপ্রাণিত করার এবং যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার এক অনন্য ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন।

সেইসাথে তিনি শুধু শ্রেণিকক্ষেই সীমাবদ্ধ না থেকে সমাজের কল্যাণে কাজ করে গেছেন এবং গ্রামীণ বা স্থানীয় সালিশি বিচারব্যবস্থায় একজন সত্যনিষ্ঠ এবং ন্যায়পরায়ণ বিচারক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি কোনো লোভ বা পক্ষের দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে সত্যের ভিত্তিতে সমাজ থেকে অন্যায় দূর করতে ভূমিকা রেখে গেছেন।

আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা ও এই দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা আজকের যুগে শিক্ষাদানের পদ্ধতি অনেক বদলেছে। 'শাস্তিমুক্ত শিক্ষা' বা 'আনন্দময় শিখন' এখনকার মূলমন্ত্র। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে এর একটি অন্ধকার দিকও রয়েছে। 

বর্তমানের অনেক শিক্ষার্থী অত্যন্ত অল্পতেই ধৈর্য হারিয়ে ফেলে। সামান্য ব্যর্থতায় তারা বিষণ্ণতায় ভোগে। কারণ, তাদের জীবনের শুরুতেই ‘কষ্ট করার’ বা ‘ধৈর্য ধরার’ মানসিক প্রস্তুতি গড়ে ওঠে না।

এই পরিমণ্ডলে সেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কড়া শিক্ষকের ‘কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে’ নীতিটি আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। 

প্রযুক্তির যুগে সবকিছু যেখানে ‘ইনস্ট্যান্ট’ বা তাৎক্ষণিক, সেখানে জীবন গঠন কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে হয় না। চরিত্র গঠন, মেধার বিকাশ এবং কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার জন্য আজও সেই প্রাচীন নিয়মানুবর্তিতা ও কঠোর পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। ফাঁকিবাজি করে সাময়িক পার পাওয়া গেলেও জীবনের চূড়ান্ত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া যায় না।

সমাজ গঠনে হাসিম স্যারের এই আপ্তবাক্যের প্রভাব
একজন আদর্শ শিক্ষকের দেওয়া এই শিক্ষা শুধু শ্রেণিকক্ষেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তা ছড়িয়ে পড়ে পুরো সমাজে। যে শিশুটি শিক্ষকের ভয়ে এবং পরে শ্রদ্ধায় অনুপ্রাণিত হয়ে কষ্টের পথ বেছে নিতে শিখেছে, সে বড় হয়ে একজন সৎ ও পরিশ্রমী নাগরিক হয়েছে।

আদর্শ শিক্ষক যখন ‘কষ্ট’ শব্দটির কথা বলেন, তখন তিনি কেবল শারীরিক শ্রমের কথা বলেন না। তিনি বোঝান মনের একাগ্রতা, ইচ্ছাশক্তি এবং লোভ-লালসা বিসর্জন দেওয়ার কষ্টকে। সুতরাং, সঠিক দিশা বা দিকনির্দেশনা যুক্ত কষ্টই মানুষকে প্রকৃত সাফল্যের চূড়ায় নিয়ে যায়। হাসিম স্যার সেই শিক্ষাই দিয়ে গেছেন আমাদের।

হাসিম স্যারের ১৯৬০ সালে অষ্ট্রগ্রামের বাঙ্গালপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মহান শিক্ষকতা জীবনের পথচলা শুরু। পরে নতুন বগাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এবং শ্যামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিষ্ঠার সাথে পেশাগত দায়িত্ব পালন করে গেছেন।

তিনি সর্বশেষ শ্যামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ১৯৯৭ সালের জানুয়ারিতে এলপিআর-এ এবং ১৯৯৮ সালের জানুয়ারিতে পূর্ণ অবসরে যান।

নিঃসন্দেহে হাসিম স্যারের মতো নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকরাই সমাজের প্রকৃত আলোকবর্তিকা। তিনি যেখানেই দায়িত্ব পেয়েছেন, সেখানেই নিজের মেধা, সততা ও আন্তরিকতা দিয়ে শিক্ষার্থীদের জীবন গড়ে তুলেছেন এবং শিক্ষার পরিবেশের ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছেন। একজন আদর্শ শিক্ষকের সবচেয়ে বড় সার্থকতা এটাই, যা যুগ যুগ ধরে শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করবে এবং শিক্ষার্থীদের মাঝে বেঁচে থাকবেন।

জীবনের বহু বছর পেরিয়ে এসে, কর্মক্ষেত্রের নানা চড়াই-উতরাই পার হওয়ার পর যখন পেছনে ফিরে তাকাই, তখন সেই কড়া শিক্ষকের মুখচ্ছটিই সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে। 

আজ বুঝতে পারা যায়, সেদিন যদি তিনি পড়া না পারার জন্য দাঁড় করিয়ে না রাখতেন, টেবিলের নিচে মাথা না দিয়ে রাখতেন কিংবা ভেংচি কেটে কয়েক ঘা না লাগাতেন, তবে আজ হয়তো জীবনের এই অবস্থানে পৌঁছানো সম্ভব হতো না।

তাঁর সেই বজ্রকণ্ঠের বাণী—'কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে'—আজও জীবনের প্রতিটি সংকটে মন্ত্রের মতো কাজ করে। যখনই কোনো কাজে বাধা আসে, যখনই মনে হয় হাল ছেড়ে দিই, তখনই কানে ভেসে আসে হাসিম স্যারের ভেংচি, চোখ রাঙানি ও গম্ভীর কণ্ঠস্বর।

১৯৪১ সালে জন্ম নেওয়া শ্রদ্ধেয় মো. আবুল হাসিম স্যার ২০০০ সালে সবাইকে কাঁদিয়ে মহান রবের পরম সান্নিধ্য লাভে চলে যান।

হাসিম স্যার আজ বেঁচে নেই, কিন্তু তাঁর দেওয়া জীবনদর্শন আজও বেঁচে আছে হাজারো শিক্ষার্থীর হৃদয়ে। ‘কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে’—এই একটিমাত্র বাক্যের মধ্যে লুকিয়ে আছে মানব সভ্যতার এগিয়ে যাওয়ার মূল রহস্য। আরাম-আয়েশ আর অলসতার মোহ ত্যাগ করে যারা কষ্টের আগুনে নিজেদের পুড়িয়ে খাঁটি সোনা করতে পারে, দিনশেষে সাফল্য বা ‘কেষ্ট’ তাদের গলাতেই বরমাল্য পরিয়ে দেয়। 

এই মহান সত্যটি যিনি আমাদের জীবনের প্রথম অধ্যায়ে শিখিয়েছিলেন, সেই আদর্শ শিক্ষক হাসিম স্যারের চরণে জানাই শতকোটি সালাম। তাঁর কঠোরতাই ছিল আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ আশীর্বাদ।

একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে তিনি শুধু অক্ষরজ্ঞানই দেননি, বরং একটি আদর্শ প্রজন্মের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে গেছেন। তাঁর পাঠদান পদ্ধতি ছিল সহজ, আনন্দময় এবং বাস্তবমুখী। তিনি যান্ত্রিক পড়াশোনার চেয়ে শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর জোর দিতেন।

একজন আদর্শ প্রাইমারি স্কুল শিক্ষক হিসেবে হাসিম স্যারের পাঠদান পদ্ধতি ছিল সহজ, আনন্দময় এবং বাস্তবমুখী। তিনি যান্ত্রিক পড়াশোনার চেয়ে শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর জোর দিতেন।

প্রাচীনকাল থেকেই শিক্ষকের সান্নিধ্যে থেকে জ্ঞান অর্জনের জন্য যে 'কষ্ট' বা তিতিক্ষা স্বীকার করতে হতো, তা-ই শিক্ষার্থীকে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতো। হাসিম স্যারেের এই গৌরবময় কর্মজীবন আমাদের চিরকাল অনুপ্রাণিত করবে। তাঁর স্মরণে শ্রদ্ধাঞ্জলি -

"শ্রেণিকক্ষের সেই চেনা ডাস্টার, চকের মিষ্টি ঘ্রাণ,
হাসিম স্যারের হাত ধরেই চিনেছি অক্ষরের সন্ধান।
ভুল করে যখনই থমকে দাঁড়িয়েছি মাঝপথে,
স্নেহের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন এক অদ্ভুত মায়াতে।

শাসন নামের সেই ভেংচি ও পিটুনি আজ বড়ই মধুর লাগে,
আবুল হাসিম স্যারের শিক্ষা আজও মনের কোণে জাগে।
কঠিন পড়া সহজ হতো আপনার জ্ঞানগর্ভের ছোঁয়ায়,
জীবন গড়ার মন্ত্র দিলেন আপনিই তো এ ধরায়।

আজ আমরা ছড়িয়ে গেছি দূর-দূরান্তের দেশে,
তবুও হাসিম স্যারের ছবি ভাসে স্মৃতির ক্যানভাসে।
মাথা নত করি আপনার চরণে, হে আলোর দিশারী,
আপনার ঋণ শোধ করার সাধ্য কি আর রাখি!"

জীবন চলার পথে বাবা-মার পরেই শিক্ষকের স্থান। মরহুম হাসিম স্যারের খোদার দিদার লাভ এবং জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব হোক।

লেখক: সহযোগী সম্পাদক, আজকের সূর্যোদয়, ঢাকা