নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: সদ্য সমাপ্ত সপ্তাহে দেশের পুঁজিবাজারে প্রধান সূচকের সামান্য উত্থান হলেও লেনদেনের গতি কমেছে। পাঁচ কার্যদিবসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) মোট লেনদেন আগের সপ্তাহের তুলনায় বাড়লেও কার্যদিবস বেশি থাকায় দৈনিক গড় লেনদেন কমেছে প্রায় ১৬ শতাংশ। একই সঙ্গে দরপতন হওয়া কোম্পানির সংখ্যা দরবৃদ্ধিকারী কোম্পানির চেয়ে বেশি ছিল। ফলে সূচকের উত্থান সত্ত্বেও বাজারের সার্বিক অংশগ্রহণে তেমন শক্তিশালী গতি দেখা যায়নি।
সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ছিল ৫ হাজার ৮৬০ দশমিক ৯৬ পয়েন্টে। সপ্তাহ শেষে ২২ দশমিক ৯৫ পয়েন্ট বা শূন্য দশমিক ৩৯ শতাংশ বেড়ে সূচকটি দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৮৮৩ দশমিক ৯১ পয়েন্টে। এ সময়ে বাছাই করা ৩০টি কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএস-৩০ সূচক শূন্য দশমিক ৮৮ পয়েন্ট বা শূন্য দশমিক ০৪ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ১৯২ দশমিক ৭৩ পয়েন্টে অবস্থান করছে। বিপরীতে শরিয়াভিত্তিক কোম্পানিগুলো নিয়ে গঠিত ডিএসইএস সূচক ৩ দশমিক ৫৬ পয়েন্ট বা শূন্য দশমিক ৩০ শতাংশ কমে ১ হাজার ১৭৭ দশমিক ১৫ পয়েন্টে নেমেছে।
সপ্তাহজুড়ে ডিএসইতে পাঁচ কার্যদিবস লেনদেন হয়েছে। আগের সপ্তাহে কার্যদিবস ছিল চারটি। এ কারণে আলোচ্য সপ্তাহে মোট লেনদেন কিছুটা বেড়ে ৪ হাজার ৯৮৭ কোটি ৮২ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে। আগের সপ্তাহে এ পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৭২৭ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। তবে দৈনিক গড় হিসাবে চিত্রটি ছিল ভিন্ন। গত সপ্তাহে ডিএসইর মূল বাজারে প্রতিদিন গড়ে ৯৯৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের সপ্তাহের ১ হাজার ১৮১ কোটি ৮৪ লাখ টাকার তুলনায় দৈনিক গড় লেনদেন কমেছে ১৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ।
বাজারের পরিধির দিক থেকেও সপ্তাহজুড়ে তেমন ইতিবাচক চিত্র দেখা যায়নি। ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ৩৯৯টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ১৬২টির দর বেড়েছে। বিপরীতে দর কমেছে ২০৮টির। অপরিবর্তিত ছিল ১৭টির দর। আর ২৪টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের কোনো লেনদেন হয়নি। অর্থাৎ সূচক সামান্য বাড়লেও অধিকসংখ্যক কোম্পানির শেয়ারে দরপতন হয়েছে।
সপ্তাহ শেষে ডিএসইর বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৭ হাজার ৬১৫ কোটি টাকা। আগের সপ্তাহের তুলনায় বাজার মূলধন কমেছে শূন্য দশমিক ০৪ শতাংশ। এতে বোঝা যায়, সূচকের সীমিত উত্থান বাজারের সামগ্রিক মূল্যস্তরে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারেনি।
খাতভিত্তিক লেনদেনেও বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ছিল কয়েকটি নির্দিষ্ট খাতে কেন্দ্রীভূত। সপ্তাহের মোট লেনদেনে বস্ত্র খাতের অবদান ছিল সর্বোচ্চ ২২ দশমিক ১৭ শতাংশ। এরপর সাধারণ বিমা খাত থেকে এসেছে ১৮ দশমিক ৫১ শতাংশ লেনদেন। ওষুধ ও রসায়ন খাতের অবদান ছিল ৯ দশমিক ০৬ শতাংশ। অর্থাৎ বড় মূলধনি ও অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল খাতের পরিবর্তে কয়েকটি নির্দিষ্ট খাতে লেনদেনের ঘনত্ব বেশি ছিল।
বাজারের সূচক ও লেনদেনের এই ভিন্নমুখী প্রবণতা থেকে দেখা যায়, সপ্তাহজুড়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার জোরালো প্রত্যাবর্তন ঘটেনি। সূচককে কিছুটা ওপরে ধরে রাখার মতো ক্রয়চাপ থাকলেও তা পুরো বাজারে বিস্তৃত হয়নি। বরং কমসংখ্যক শেয়ারে লেনদেনের সক্রিয়তা এবং অধিকসংখ্যক শেয়ারে দরপতন বাজারের ভেতরের দুর্বলতাকেই সামনে এনেছে।
এদিকে সপ্তাহের শীর্ষ দরবৃদ্ধিকারী কোম্পানিগুলোর তালিকায় স্বল্প মূলধনি ও কম দামের শেয়ারের আধিপত্যও ছিল লক্ষণীয়। বিপরীতে দরপতনের শীর্ষে ছিল আর্থিক খাতের কয়েকটি দুর্বল কোম্পানি। ফলে একদিকে নির্দিষ্ট কিছু শেয়ারে জল্পনানির্ভর আগ্রহ, অন্যদিকে দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানি থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহারের প্রবণতা, দুই ধরনের আচরণই বাজারে দেখা গেছে।
সব মিলিয়ে গত সপ্তাহে ডিএসইর সূচকের সামান্য উত্থানকে বাজারের ব্যাপকভিত্তিক শক্তি ফিরে আসার প্রতিফলন হিসেবে দেখার সুযোগ কম। দৈনিক গড় লেনদেনের পতন, দরপতনকারী কোম্পানির আধিক্য এবং বাজার মূলধনের সামান্য সংকোচন বরং বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থানেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে। আগামীদিনে বাজারের স্থিতিশীলতা নির্ভর করবে লেনদেনের বিস্তৃতি, বড় মূলধনি কোম্পানিতে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ এবং সামগ্রিকভাবে ক্রয়চাপ কতটা শক্তিশালী হয় তার ওপর।