পাঁচদিনে কমল ৩,৮০৩ কোটি টাকার মূলধন

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: বিদায়ী সপ্তাহে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে চার দিনই দরপতনের মধ্য দিয়ে লেনদেন শেষ করেছে দেশের পুঁজিবাজার। সপ্তাহজুড়ে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর কমায় প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক ডিএসএক্স কমেছে প্রায় ৯৮ পয়েন্ট। একইসঙ্গে কমেছে লেনদেনের গতি ও বাজার মূলধন। সপ্তাহের ব্যবধানে ডিএসইর বাজার মূলধন কমেছে ৩ হাজার ৮০৩ কোটি টাকা।

সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস গত বৃহস্পতিবার ডিএসইর বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৩ হাজার ৮১২ কোটি টাকায়। আগের সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে যা ছিল ৭ লাখ ৭ হাজার ৬১৫ কোটি টাকা। ফলে এক সপ্তাহে বাজার মূলধন কমেছে শূন্য দশমিক ৫৪ শতাংশ। 

সপ্তাহজুড়ে ডিএসইর সব প্রধান সূচকই কম ছিল। ডিএসইএক্স ৯৭ দশমিক ৮ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ৭ শতাংশ কমে ৫ হাজার ৭৮৬ পয়েন্টে নেমে আসে। ডিএস-৩০ সূচক ৩০ দশমিক ২ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ৪ শতাংশ কমে ২ হাজার ১৬৩ পয়েন্টে এবং ডিএসই শরিয়া সূচক ২১ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ৮ শতাংশ কমে ১ হাজার ১৫৬ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। 

বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, সপ্তাহের শুরুতেই চূড়ান্ত মার্জিন বিধিমালায় সম্ভাব্য সংশোধন নিয়ে উদ্বেগে সতর্ক অবস্থানে ছিলেন বিনিয়োগকারীরা। পরবর্তী কার্যদিবসগুলোতে এই বিক্রির চাপ আরও বাড়ে। এর সঙ্গে চলমান গ্যাস সংকটের সমাধান না হওয়ায় বিভিন্ন কোম্পানির আয় ও ব্যবসায়িক সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। ফলে শেয়ারে বিনিয়োগ কমিয়ে দেন অনেক বিনিয়োগকারী।

পরে মার্জিন বিধিমালা নিয়ে প্রতীক্ষিত ব্যাখ্যা এলেও বাজারের গতি ঘুরে দাঁড়ায়নি। কিছু কঠোর পদক্ষেপ আসতে পারে এমন গুঞ্জন বিনিয়োগকারীদের আরও সতর্ক করে তোলে। সপ্তাহের শেষ দিকে বাজারে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা দেখা গেলেও সামগ্রিক আস্থা ছিল দুর্বল। দেশের চলমান সংকটের পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তাও বাজারের ঘুরে দাঁড়ানোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

গত সপ্তাহে দরপতনের ব্যাপ্তিও ছিল উল্লেখযোগ্য। সপ্তাহজুড়ে ডিএসইতে ৩৮৪টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের শেয়ার-ইউনিট লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৫২টির দাম বেড়েছে। বিপরীতে ৩১৪টির দাম কমেছে এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ১৮টির। অর্থাৎ লেনদেনে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানের প্রায় পাঁচটির মধ্যে চারটিরই দর কমেছে।

সাপ্তাহিক দর বৃদ্ধির তালিকায় শীর্ষে ছিল এনভয় টেক্সটাইলস। কোম্পানিটির শেয়ারদর ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে। এরপর ছিল আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, রিলায়েন্স ওয়ান এবং আরামিট। অন্যদিকে শার্প ইন্ডাস্ট্রিজের দর ২২ দশমিক ১ শতাংশ কমে সাপ্তাহিক দরপতনের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে। ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং, মালেক স্পিনিং ও ফার্মা এইডও বড় দরপতনের তালিকায় রয়েছে। 

দরপতনের পাশাপাশি বাজারে লেনদেনের গতি কমেছে। সপ্তাহজুড়ে ডিএসইতে মোট ৪ হাজার ৫২৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। আগের সপ্তাহে হয়েছিল ৪ হাজার ৯৮৭ কোটি ৮২ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক সপ্তাহে লেনদেন কমেছে ৪৫৯ কোটি ২৭ লাখ টাকা।

প্রতিদিনের গড় লেনদেনও ৯ দশমিক ২ শতাংশ কমে ৯০৫ কোটি ৭১ লাখ টাকায় নেমেছে। আগের সপ্তাহে যা ছিল ৯৯৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। গড় লেনদেনের পাশাপাশি গড় শেয়ার লেনদেনের সংখ্যা ও গড় লেনদেনের পরিমাণও কমেছে। 

খাতভিত্তিক লেনদেনে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ছিল টেক্সটাইল খাত। সপ্তাহের মোট লেনদেনের ২১ দশমিক ২ শতাংশ এসেছে এ খাত থেকে। এরপর সাধারণ বিমা খাত ১৭ দশমিক ৯ শতাংশ এবং প্রকৌশল খাত ৯ দশমিক ৬ শতাংশ লেনদেনের অংশ দখল করেছে। ফার্মাসিউটিক্যালস ও কেমিক্যালস খাতে লেনদেনের অংশ ছিল ৯ দশমিক ১ শতাংশ। 

তবে লেনদেনে সক্রিয় থাকলেও অধিকাংশ খাতেই বিনিয়োগকারীরা মুনাফায় ছিলেন না। সপ্তাহে ২০টি খাতের মধ্যে ১৯টিই নেতিবাচক রিটার্ন দিয়েছে। জুট খাতের দর সবচেয়ে বেশি ৪ দশমিক ৬ শতাংশ কমেছে। এরপর পেপার অ্যান্ড প্রিন্টিং ৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মিউচুয়াল ফান্ড ৪ দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে। টেক্সটাইল খাতও ৩ দশমিক ৪ শতাংশ দর হারিয়েছে। একমাত্র সার্ভিসেস অ্যান্ড রিয়েল এস্টেট খাত শূন্য দশমিক ২ শতাংশ ইতিবাচক রিটার্ন দিয়েছে। 

সপ্তাহের গড় লেনদেনে শীর্ষে ছিল আইপিডিসি ফাইন্যান্স। কোম্পানিটির শেয়ারে গড়ে ২৭ কোটি ৯৭ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। এরপর ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং, বেক্সিমকো, মালেক স্পিনিং ও শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ ছিল সক্রিয়। এনভয় টেক্সটাইলসের শেয়ারে গড়ে ১৪ কোটি ১০ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। 

অন্যদিকে বাজারের বড় মূলধনী কোম্পানিগুলোর মধ্যে গ্রামীণফোন, ব্র্যাক ব্যাংক ও স্কয়ার ফার্মার শেয়ারের ওপর সূচকের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ছিল। সপ্তাহের সূচক টানার তালিকায় ব্র্যাক ব্যাংক ও শার্প ইন্ডাস্ট্রিজের নাম সামনে এসেছে। 

অন্য শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) সপ্তাহজুড়ে ছিল দরপতনের চাপ। সিএএসপিআই ১ দশমিক ৯৭ শতাংশ এবং সিএসসিএক্স ২ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ কমেছে। সিএসই-৩০ সূচক কমেছে ১ দশমিক ৫৫ শতাংশ এবং সিএসআই ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ। সিএসই-৫০ সূচকও ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ কমেছে।

তবে ডিএসইর বিপরীতে সিএসইতে লেনদেন বেড়েছে। সপ্তাহজুড়ে সেখানে ৩০৯ কোটি ৮৬ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে, আগের সপ্তাহে যা ছিল ২০২ কোটি ১ লাখ টাকা। অর্থাৎ লেনদেন বেড়েছে ১০৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। তবে দরপতনের বিস্তৃতি ছিল ডিএসইর মতোই। বাজারটিতে ৩২১টি লেনদেন হওয়া প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৬৮টির দর বেড়েছে, ২৪১টির কমেছে এবং ১২টির অপরিবর্তিত রয়েছে।