৪৩ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে প্রবাসে, গুলিতে প্রাণ গেল নোয়াখালীর রাজুর
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

নোয়াখালী প্রতিনিধি: সংসারের অভাব ঘোচাতে প্রায় ৪৩ লাখ টাকা ঋণ করে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীর ইউসুফ রাজু (৪৪)। স্বপ্ন ছিল ঋণ শোধ করে পরিবারকে স্বচ্ছল করবেন, ভাঙা ঘরটি নতুন করে গড়বেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই নিউইয়র্কে বন্দুকধারীর গুলিতে প্রাণ হারালেন তিনি। রাজুর মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে পুরো এলাকায়।

সোমবার (২৪ আগস্ট) দুপুরে রাজুর বাড়ি সোনাইমুড়ী উপজেলার আমিশাপাড়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কংশনগর গ্রামের পাইকার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। স্ত্রী, দুই কন্যাসন্তান ও বৃদ্ধ বাবা-মাকে নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে পরিবারটি।

নিহত ইউসুফ রাজু ওই গ্রামের মোহাম্মদ উল্যার ছেলে। স্ত্রী পলি আক্তার ও দুই মেয়ে জান্নাতুল নাঈমা (১৩) এবং রাইসা আক্তারকে (২) রেখে গেছেন তিনি।

স্বজনরা জানান, দীর্ঘদিন কাতারে কাজ করার পর উন্নত জীবনের আশায় ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান রাজু। বিদেশ যাওয়ার জন্য তাকে প্রায় ৪৩ লাখ টাকা ঋণ করতে হয়। নিজের জমানো অর্থও ব্যয় করেন। কিন্তু মৃত্যুর আগে সেই ঋণের বড় অংশই পরিশোধ করতে পারেননি তিনি।

রেস্টুরেন্টে ঢুকে গুলি, নিহত রাজু

স্থানীয় সময় শনিবার (২২ আগস্ট) রাত সাড়ে ১১টার দিকে নিউইয়র্ক সিটির ব্রুকলিনের রাউনসভিল এলাকায় ‘আমেরিকান বেস্ট উইংস অ্যান্ড পিৎজা’ নামের একটি রেস্টুরেন্টে এ ঘটনা ঘটে।

নিহতের ছোট ভাই আপন জানান, ওই রাতে কর্মস্থলে ছিলেন রাজু। হঠাৎ এক বন্দুকধারী রেস্টুরেন্টে ঢুকে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। এতে রাজুর বুকে গুলি লাগে। পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়।

এ ঘটনায় রাজুর সহকর্মী মো. রাসেলও আহত হয়েছেন। তার বাড়ি কুমিল্লার মেঘনা উপজেলায়। তিনি বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

বাবাকে দেখেনি ছোট মেয়ে

স্বজনরা জানান, রাজু যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সময় তার স্ত্রী পলি আক্তার সন্তানসম্ভবা ছিলেন। তিনি বিদেশে যাওয়ার পর জন্ম নেয় ছোট মেয়ে রাইসা। ফলে দুই বছরের এই শিশুটি কখনো বাবাকে সামনে থেকে দেখার সুযোগ পায়নি।

অবসর পেলেই স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলতেন রাজু। ভবিষ্যতে পরিবারকে যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়ারও পরিকল্পনা ছিল তার। সেই পরিকল্পনা এখন থেমে গেছে।

রাজুর শ্যালক মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন রাজু। তার স্ত্রী ও দুই মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা সবাই উদ্বিগ্ন। ছোট মেয়েটা বাবাকে দেখেনি, বাবাকে কী জিনিস সেটাও বুঝতে পারেনি। আমরা এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই।’

ঋণের বোঝা, ভাঙা ঘরেই পরিবার

আমিশাপাড়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আব্দুল আজিজ বলেন, বিদেশ যাওয়ার সময় রাজু অনেক টাকা ঋণ করেছিলেন। পরিবারের ভাঙা ঘরটিও ঠিক করতে পারেননি। ঋণের বড় একটি অংশ এখনও বাকি রয়েছে। এমন অবস্থায় তার মৃত্যু পরিবারটিকে চরম অসহায় করে দিয়েছে।

রাজুর বাবা মোহাম্মদ উল্যা বলেন, ‘ছেলের সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় প্রায় ৪৩ লাখ টাকা ঋণ করে তাকে বিদেশ পাঠিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, সে সংসারের অভাব দূর করবে, ঋণ শোধ করবে এবং আমাদের জরাজীর্ণ ঘরটি নতুন করে গড়ে তুলবে। কিন্তু সব স্বপ্ন ভেঙে দিয়ে আজ সে লাশ হয়ে ফিরছে। আমরা এখনও ভাঙা ঘরেই বসবাস করছি, ঋণের বোঝাও মাথায় রয়ে গেছে। এখন শুধু ছেলের মরদেহটা দেশে ফিরিয়ে এনে শেষবারের মতো দেখতে চাই।’

রাজুর বাবা-মা ছেলের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন। একই দাবি জানিয়েছেন তার স্ত্রী পলি আক্তারও।

তদন্তে নিউইয়র্ক পুলিশ

এদিকে ঘটনার পর নিউইয়র্ক পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। রেস্টুরেন্টের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে আটক করা হয়নি বলে জানা গেছে।

রাজুর আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বজন ও এলাকাবাসী দ্রুত তার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়াতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

সোনাইমুড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাছরিন আক্তার বলেন, ‘বিদেশে জীবিকার সন্ধানে গিয়ে এমন মর্মান্তিক মৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক। ইউসুফ রাজুর মৃত্যুতে আমরা গভীর শোক প্রকাশ করছি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি। মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ ও সহযোগিতার চেষ্টা করা হচ্ছে। পাশাপাশি পরিবারটি যাতে প্রয়োজনীয় সহায়তা পায়, সে বিষয়েও প্রশাসনের পক্ষ থেকে খোঁজখবর রাখা হচ্ছে।’

—জা. অর্থনীতি/এলএটি