তেলাপোকার দুধ পুষ্টিকর, এবারের ইগ নোবেল পেল এমন সব উদ্ভট গবেষণা

অনলাইন ডেস্ক: গবেষণাগার বলতেই সাধারণত মাইক্রোস্কোপ, জটিল যন্ত্রপাতি কিংবা বিজ্ঞানীদের সাদা অ্যাপ্রোনের ছবি চোখে ভাসে। কিন্তু বিজ্ঞানের জগতে এমন কিছু প্রশ্নও আছে, যা শুনলে প্রথমে হাসি পেতে পারে। সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা কখনো তেলাপোকার দুধ পরীক্ষা করেছেন, কখনো সাপকে আলতো করে পা দিয়ে চাপ দিয়েছেন, আবার কখনো গবেষণা করেছেন কীভাবে নাক ঝাড়লে সবচেয়ে ভালো হয়।

বৃহস্পতিবার এমন ১০টি গবেষণাকে ইগ নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। আয়োজকদের ভাষ্যমতে, এসব গবেষণা 'প্রথমে মানুষকে হাসায়, পরে ভাবতে বাধ্য করে'।

বার্ষিক এই পুরস্কারের ৩৬তম আসরের অনুষ্ঠান বৃহস্পতিবার সুইজারল্যান্ডের জুরিখে অনুষ্ঠিত হয়। এবারের অনুষ্ঠানের মূল বিষয় ছিল 'ফাঙ্গাই' বা ছত্রাক।

নোবেল পুরস্কারের আদলে মজার ছলে দেওয়া হয় ইগ নোবেল। এটি আয়োজন করে 'অ্যানালস অব ইমপ্রোবাবল রিসার্চ' ম্যাগাজিন।

অনুষ্ঠানে প্রতি বছরের মতো কাগজের বিমান ছোড়ার আয়োজন ছিল। পাশাপাশি নোবেলজয়ীরা মাশরুমের পোশাক পরে ছত্রাক নিয়ে নতুন একটি অপেরার গান পরিবেশন করেন।

অন্য গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চবিত্তরা শিশুদের জন্য রাখা মিষ্টি বেশি নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি অন্যান্য অনৈতিক কাজেও বেশি জড়াতে পারেন। এ গবেষণাটি অর্থনীতি বিভাগে পুরস্কার পেয়েছে।

তেলাপোকার দুধে গরুর দুধের চেয়ে তিন গুণ বেশি শক্তি রয়েছে—রসায়নে পুরস্কার পেয়েছে এমন একটি গবেষণা।

চিকিৎসা বিভাগে পুরস্কার পেয়েছে 'কীভাবে নাক ঝাড়তে হয়', তা এ নিয়ে করা একটি গবেষণা।

চুম্বনের বিবর্তন নিয়ে একটি গবেষণা পেয়েছে বায়োমেকানিক্স পুরস্কার। ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তনবিজ্ঞানী এবং গবেষণাটির সহলেখক মাটিল্ডা ব্রিন্ডল সিএনএনকে বলেন, 'বিজ্ঞান কিছুদিন ধরেই নানা আক্রমণের মুখে। বাণিজ্যিক শিল্প ও প্রযুক্তির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক নেই—এমন গবেষণার ক্ষেত্রগুলোকে ক্রমেই কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে।'

তিনি আরও বলেন, 'অবশ্যই ব্যবহারিক গবেষণা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমরা যদি আমাদের চারপাশের পৃথিবীকে দেখা এবং "কেন?" প্রশ্ন করা বন্ধ করে দিই, তাহলে তা বড় ক্ষতি হবে। শুধু কৌতূহল থেকেই কোনো কিছু জানার চেষ্টা করা বিজ্ঞানের অগ্রগতির জন্য মৌলিক বিষয়।'

প্রস্রাবের ছিটা এড়ানো যায়, এমন ইউরিনাল তৈরির পদ্ধতি নিয়ে গবেষণাটি পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে পুরস্কার পেয়েছে।

অন্যদিকে মশার শুঁড়কে ত্রিমাত্রিক প্রিন্টারের নোজল হিসেবে ব্যবহার করে গবেষণা করেছেন একদল বিজ্ঞানী। 'নেক্রোপ্রিন্টিং' নামে পরিচিত এই প্রক্রিয়ার জন্য তারা প্রযুক্তি বিভাগে পুরস্কার পেয়েছেন।

কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং গবেষণাটির সহলেখক চ্যাংহং কাও বলেন, এই পুরস্কার 'অনুসন্ধানী চিন্তাভাবনাকে বৈধতা দিতে সাহায্য করে'।

সিএনএনকে কাও বলেন, 'কেউ মশার শরীর থেকে ত্রিমাত্রিক প্রিন্টারের নোজল বানানোর পরিকল্পনা নিয়ে গবেষণা শুরু করেন না। এমন কিছুতে গভীর মনোযোগ দেওয়ার মাধ্যমেই আমরা সেখানে পৌঁছেছি, যেটিকে প্রথমে অপ্রাসঙ্গিক মনে হয়েছিল। এরপর সেটি আমাদের কোথায় নিয়ে যায়,তা দেখার জন্য আগ্রহ ধরে রাখা ।'

নর্থ ক্যারোলাইনার হিকরির লেনোয়ার-রাইন বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক কার্লি অ্যান ইয়র্ক এই পুরস্কারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তিনি সিএনএনকে বলেন, ইগ নোবেল 'এমন গবেষণাকে সামনে আনতে কখনো ব্যর্থ হয় না, যা প্রথমে হাসায়, পরে ভাবায়।'

ইয়র্ক বলেন, 'এ বছরের বিজয়ীরা প্রথমে অবাস্তব মনে হওয়া ধারণাগুলোকে বাস্তব ও গ্রহণযোগ্য গবেষণায় পরিণত করেছেন। আর হ্যাঁ, এগুলো সত্যিই বৈজ্ঞানিক গবেষণা।'

ইয়র্ক 'দ্য স্যামন ক্যানন অ্যান্ড দ্য লেভিটেটিং ফ্রগ: অ্যান্ড আদার সিরিয়াস ডিসকভারিজ অব সিলি সায়েন্স' বইটির লেখক।

তিনি আরও বলেন, 'প্রথমে এসব গবেষণাকে হয়তো অর্থহীন মনে হতে পারে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রায় অর্ধেকই মৌলিক গবেষণা থেকে পাওয়া আবিষ্কারের সঙ্গে সম্পর্কিত।'

ইয়র্ক বলেন, 'কে জানে—মশার মুখের ত্রিমাত্রিক মডেল হয়তো ভবিষ্যতে ব্যথাহীনভাবে ওষুধ দেওয়ার নতুন পদ্ধতি তৈরির অনুপ্রেরণা হতে পারে।'

তিনি বলেন, 'তবে আমরা একটি বিষয় জানি—বিষয়টি যতই অদ্ভুত মনে হোক না কেন, জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা কখনোই অর্থহীন নয়।'

—জা. অর্থনীতি/এএইচএ