নিজস্ব প্রতিবেদক: তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে নিজস্ব শেয়ার কেনার বা শেয়ার বাইব্যাকের সুযোগ দেওয়াসহ কোম্পানি আইনে একাধিক সংশোধনের প্রস্তাব দিয়েছে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। একই সঙ্গে সিকিউরিটিজ ইস্যুর প্রসপেক্টাসে আর্থিক বিবরণী ব্যবহারের সময়সীমা ১৮০ দিন থেকে বাড়িয়ে ২৭০ দিন করার প্রস্তাব করেছে সংস্থাটি।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর এফবিসিসিআই বোর্ড রুমে কোম্পানি আইন-১৯৯৪-এর খসড়া সংশোধনী নিয়ে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় বিএসইসির পক্ষ থেকে এসব প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) এ সভার আয়োজন করে।
এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হকের সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান, এনডিসি।
সভায় বিএসইসির পক্ষে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক আবুল কালাম বলেন, কোম্পানি আইনকে সময়োপযোগী করতে বড় ধরনের পরিবর্তনের পাশাপাশি বিভিন্ন ধারায় ছোটখাটো সংশোধনও প্রয়োজন। এতে আইনটি আধুনিক ব্যবসা ও করপোরেট ব্যবস্থার সঙ্গে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার বাইব্যাক
কোম্পানি আইনের ৫৮ ধারার প্রসঙ্গ তুলে ধরে আবুল কালাম বলেন, বর্তমান আইনে কোম্পানির নিজস্ব শেয়ার কেনার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রয়েছে। তবে অন্তত তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে নিজস্ব শেয়ার কেনার সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, শেয়ার বাইব্যাকের সুযোগ থাকলে কোম্পানির মূলধন ব্যবস্থাপনা এবং শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষায় নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। এ বিষয়ে ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর বিএসইসির পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেওয়া হলেও খসড়া সংশোধনীতে তা প্রতিফলিত হয়নি। তাই বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে কমিশন।
‘ব্যালান্স শিট’ থেকে ‘বার্ষিক আর্থিক বিবরণী’
কোম্পানি আইনের বিভিন্ন পরিভাষা আধুনিকায়নেরও প্রস্তাব দিয়েছে বিএসইসি। আবুল কালাম বলেন, বর্তমানে ‘ব্যালান্স শিট’-এর পরিবর্তে ‘বার্ষিক আর্থিক বিবরণী’ এবং ‘বোর্ড রিপোর্ট’-এর পরিবর্তে ‘অ্যানুয়াল রিপোর্ট’ ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। তাই কোম্পানি আইনের ভাষাও বর্তমান করপোরেট প্রতিবেদনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা প্রয়োজন।
এ ছাড়া অ্যানুয়াল রিপোর্ট ডিজিটাল পদ্ধতিতে প্রকাশ ও সরবরাহের সুযোগ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে কোম্পানির তথ্য প্রকাশ এবং সংশ্লিষ্টদের কাছে তা পৌঁছানো সহজ হবে বলে মনে করে বিএসইসি।
মার্জারে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা চায় বিএসইসি
তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির একীভূতকরণ, অধিগ্রহণ, ডিমার্জার ও পুনর্গঠনের ক্ষেত্রেও নিয়ন্ত্রক সংস্থার আনুষ্ঠানিক ভূমিকা রাখার প্রস্তাব দিয়েছে বিএসইসি।
আবুল কালাম বলেন, কোম্পানি আইনের ২২৮ ও ২২৯ ধারায় এসব বিষয়ে সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যে একীভূতকরণ বা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে যুক্ত রাখার বিষয়টি খসড়ায় নেই।
তিনি বলেন, কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানি অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির সঙ্গে একীভূত হলে বা এর বিপরীত ঘটনা ঘটলে তালিকাভুক্ত কোম্পানির বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সরাসরি জড়িত থাকে। তাই এ ধরনের সিদ্ধান্তে বিএসইসির মতামত থাকা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে ভারতের আইনের আদলে সিকিউরিটিজ নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে পক্ষ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
প্রসপেক্টাসে আর্থিক বিবরণীর মেয়াদ ২৭০ দিন
প্রসপেক্টাসে আর্থিক বিবরণী ব্যবহারের সময়সীমা বাড়ানোরও প্রস্তাব করেছে বিএসইসি। বর্তমানে কোনো আর্থিক বিবরণী ১৮০ দিনের বেশি পুরোনো হলে তা প্রসপেক্টাসে ব্যবহার করা যায় না।
আবুল কালাম বলেন, বাস্তবে কোনো কোম্পানি আইপিও, রাইট শেয়ার বা বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করতে গেলে নিরীক্ষা, আবেদন ও অনুমোদনসহ বিভিন্ন ধাপ পেরোতে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আর্থিক বিবরণী নিরীক্ষাতেই প্রায় ১২০ দিন লেগে যায়। এরপর আবেদন ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া শেষ করতে ১৮০ দিনের সময়সীমা পার হয়ে যায়।
এ কারণে আর্থিক বিবরণী ব্যবহারের সময়সীমা ১৮০ দিন থেকে বাড়িয়ে ২৭০ দিন করার প্রস্তাব দিয়েছে বিএসইসি।
এফবিসিসিআইয়ের আরও প্রস্তাব
সভায় এফবিসিসিআইয়ের পক্ষে প্রস্তাব তুলে ধরেন ব্যারিস্টার নিহাদ কবির। যেসব কোম্পানির বার্ষিক আয় ৫০ কোটি টাকার বেশি, সেসব কোম্পানিতে কোম্পানি সচিব নিয়োগের প্রস্তাব দেন তিনি। পাশাপাশি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও কোম্পানি সচিবদের মতো সেবা পেশার ব্যক্তিদের কোম্পানির হয়ে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ সীমিত রাখার মত দেন।
এ ছাড়া বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) আয়োজনের ক্ষেত্রে শেয়ারহোল্ডারদের কমপক্ষে ২১ দিন আগে জানানোর পর সভা করার বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়। তবে সভায় উপস্থিত একজন ব্যবসায়ী এ সময়সীমা ২১ দিন থেকে কমিয়ে ১৪ দিন করার প্রস্তাব দেন। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম এ প্রস্তাবের প্রতি সমর্থন জানান।
—জা. অর্থনীতি/এএইচএ
