যশোরের মাটিতে জাপানি পার্সিমনের সাফল্য
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

যশোর প্রতিনিধি: বিদেশি জাতের নতুন ফল চাষে আগ্রহ থেকেই জাপানি ফল পার্সিমন চাষে সাফল্য পেয়েছেন যশোরের চৌগাছার কৃষি উদ্যোক্তা জুলফিকার সিদ্দিক। তার বাগানে এখন গাছে গাছে ঝুলছে কমলা রঙের পার্সিমন। ফল দেখতে ও স্বাদ নিতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন বিভিন্ন এলাকার মানুষ।

নার্সারি ও কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে ১৯৯৫ সালে পথচলা শুরু করেন জুলফিকার। নতুন কিছু করার আগ্রহ থেকেই ২০২০-২১ সালে নাটোরের মডার্ন হর্টিকালচার থেকে ২২ হাজার টাকা দিয়ে তিনটি পার্সিমনের চারা কিনে আনেন তিনি। পরে পাঁচ কাঠা জমিতে ৩০টি চারা রোপণ করেন। বিভিন্ন কারণে বর্তমানে টিকে আছে ২২টি গাছ। এর মধ্যে ১৭টি গাছে এবার আশানুরূপ ফল ধরেছে।

চারা রোপণের এক বছর পর থেকেই ফল পাওয়া শুরু হয়। প্রথম দিকে ফলন কম থাকলেও গত বছর থেকে উৎপাদন বাড়তে থাকে। চলতি মৌসুমে সবচেয়ে বেশি ফল ধরেছে বলে জানান জুলফিকার।

তার হিসাব অনুযায়ী, ১৭টি গাছ থেকে এবার প্রায় ১৭ মণ পার্সিমন পাওয়ার আশা করছেন তিনি। বিদেশি জাতের তুলনায় বাগানের ফল কিছুটা ভিন্ন হলেও স্বাদ ও মানের দিক থেকে ভালো বলে দাবি তার।

জুলফিকার জানান, পার্সিমন চাষে খরচও তুলনামূলক কম। জৈব ও রাসায়নিক সার এবং ফুল আসার পর কয়েক দফা স্প্রে মিলিয়ে চলতি মৌসুমে তার ব্যয় হয়েছে পাঁচ হাজার টাকারও কম। গাছের বাড়তি পরিচর্যাও তেমন প্রয়োজন হয় না। তবে ডাল কাটার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হয়। ডাল কেটে দিলে ফলন কমে যায়।

বর্তমানে প্রতি কেজি পার্সিমন ১ হাজার ২০০ টাকা দরে বিক্রি করছেন জুলফিকার। তবে বাগানে আসা দর্শনার্থীদের বিনামূল্যে ফল খাওয়ার সুযোগ দিচ্ছেন তিনি। এরই মধ্যে যশোরের এক ফল ব্যবসায়ী ১০০ কেজি পার্সিমন পাইকারি দামে কিনে নিয়েছেন। ভবিষ্যতে আরও ফল নেওয়ার আগ্রহও জানিয়েছেন ওই ব্যবসায়ী।

জুলফিকার বলেন, গত দুই বছর তিনি মূলত ফল বিক্রির চেয়ে মানুষকে বাগানে এনে ফল দেখানো ও স্বাদ নেওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। দর্শনার্থীদের কেউ ফলের স্বাদ পছন্দ করেছেন, আবার কেউ তেমন সন্তুষ্ট হননি। বর্তমানে বাগানে আসা দর্শনার্থীরাই তার অন্যতম নিয়মিত ক্রেতা।

তার ভাষ্য, ফেব্রুয়ারি মাসে পার্সিমন গাছে ফুল আসে। এরপর আগস্ট-সেপ্টেম্বরের দিকে ফল খাওয়ার উপযোগী হয়। চলতি মৌসুমের ফলও দ্রুত বাগান থেকে তুলে নেওয়া হবে।

পার্সিমনের সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী হলেও কৃষকদের সতর্ক করেছেন এই উদ্যোক্তা। তার মতে, দেশে এখনও এই ফলের বড় বাজার তৈরি হয়নি। তাই শুধু বেশি দামে বিক্রির আশায় বড় পরিসরে চাষে নামা ঠিক হবে না।

জুলফিকার বলেন, “ট্রায়াল বেসিসে শুরু করেছি। যারা পার্সিমনের বাগান করতে চান, তাদের বুঝেশুনে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। ভবিষ্যতে এই ফল অনেক বেশি দামে বিক্রি হবে-এমন নিশ্চয়তা এখনই দেওয়া যায় না।”

পার্সিমনের চারা উৎপাদন ও বিক্রিও করছেন জুলফিকার। প্রতি পিস চারা ৩ হাজার টাকা করে বিক্রি করছেন তিনি। নার্সারিতে একসময় বিপুলসংখ্যক চারা তৈরি করলেও বেশিরভাগই মারা গেছে। বর্তমানে তার কাছে ৭০০ থেকে ৮০০টির মতো চারা রয়েছে।

দূর-দূরান্ত থেকেও জুলফিকারের বাগানে পার্সিমন দেখতে ছুটে আসছেন মানুষ। পাশের উপজেলা ঝিকরগাছা থেকে আসা যুবক মাসুদুর রহমান বলেন, আশপাশের জেলা বা উপজেলা বাজারে আগে এই ফল দেখেননি। চৌগাছায় এসে প্রথমবার দেখে ও খেয়ে বেশ ভালো লেগেছে তার।

চৌগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুসাব্বির হোসাইন জানান, উপজেলায় ড্রাগন, মাল্টা, কমলা, পেয়ারা, বরইসহ বিভিন্ন ধরনের ফলের চাষ হচ্ছে। এরই মধ্যে হিজলি গ্রামে পার্সিমন চাষ করে নতুন সম্ভাবনার দিক উন্মোচন করেছেন একজন কৃষক।

তিনি বলেন, বর্তমানে যে জাতের পার্সিমন চাষ হয়েছে, সেটি খুব উন্নত জাত নয়। তবে যশোরের মাটিতে পার্সিমন চাষ সম্ভব- এ পরীক্ষায় তা প্রমাণিত হয়েছে। সঠিক জাত নির্বাচন ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি অনুসরণ করা গেলে ভবিষ্যতে আরও উন্নত জাতের পার্সিমন চাষের সুযোগ রয়েছে।

কৃষি কর্মকর্তা আরও বলেন, নতুন ও সম্ভাবনাময় ফলের চাষ সম্প্রসারণে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। সঠিক পদ্ধতিতে পার্সিমন চাষ করা গেলে এটি স্থানীয় কৃষকদের জন্য সম্ভাবনাময় বিকল্প ফসল হয়ে উঠতে পারে।  

 —জা. অর্থনীতি/এলএটি