রশীদ এনাম।।
'মানুষ বড় কাঁদছে, তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও, মানুষ ফাঁদ পাতছে, তুমি পাখির মতে পাশে দাঁড়াও, মানুষ বড় একলা, তুমি তাহার পাশে দাঁড়াও, ভেসে দাঁড়াও ভালোবেসে দাঁড়াও' কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় ১৯৫২, ৬৯,৭১ দেখেনি রাজধানীর বুকে বসে ২৪ আন্দোলন খুব কাছ থেকে দেখেছি। আহা মানুষকে আমি ফানুস হতেও দেখলাম। মানুষের মায়ামমতা, ভালোবাসার বন্ধন, আদর-স্নেহ একে অপরকে সম্মান করা, সম্প্রীতি সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক বিলীনের পথে।
মানুষ কি আজ সত্যি রঙিন ফানুসে পরিণত হলো? জীবনে খারাপ সময় আসলে ভালোমানুষও চেনা যায়, আবার খারাপ মানুষও চেনা যায়। কথাসাহিত্যিক আহমদ ছফা বলেছিলেন, 'একটা মানুষের মধ্যেই গোঁজামিল থাকে। কিন্তু যে সাপ সে হান্ড্রেড পার্সেন্ট সাপ। যে শিয়াল সে হান্ড্রেড পার্সেন্ট শিয়াল। মানুষ সাপও হইতে পারে, শিয়ালও হইতে পারে, পাখিও হইতে পারে। মানুষেরই বিভিন্ন চরিত্র নেওয়ার ক্ষমতা আছে। বুঝছো গ্রাম দেশে আগে সাপ আর শিয়াল পাওয়া যাইতো এগুলো নাই এখন। কারণ সাপ, শিয়াল এরা মানুষ হিসাবে জন্মাইতে আরম্ভ করেছে।'
পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর শহরগুলোর একটি চট্টগ্রাম, হরিকেল থেকে চট্টগ্রাম। প্রায় দেড় হাজার বছরের প্রাচীন শহর সৃষ্টিকর্তার তুলির স্পর্শে অপরূপা করে ঢেলে সাজিয়েছেন চট্টগ্রামকে। পাহাড়, নদী, দরিয়ানগর বেষ্টিত দেশের প্রবেশদ্বার বন্দর নগরী চট্টগ্রাম। এই শহরে আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমিয়ে পড়ে। সবুজ অরণ্যানীতে নানা রকমের পশুপাখির অভয়ারণ্য। দেশের প্রবেশদ্বার ব্যবসার প্রাণকেন্দ্র বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম।
ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, ৫২-র ভাষা আন্দোলন, ৭১-র স্বাধীনতা আন্দোলন, বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার, স্বৈরাচার আন্দোলন প্রত্যেকটি আন্দোলনের সূচনা কিন্তু চট্টগ্রাম থেকে, মা মাটি ও মাতৃভূমির জন্য মাস্টারদা সূর্যসেন ও প্রীতিলতার মতো আরও অনেক বীর প্রসবিনী চট্টগ্রামের কৃতী সন্তানদের ভূমিকা অস্বীকার করা যাবে না। আমাদের মাতৃভাষার ৪০% অনুজ্ঞাসূচক ক্রিয়া কিন্তু চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা থেকে উৎপত্তি। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ যিনি কি না পুথি সংগ্রহ করে দেশের সাহিত্যাঙ্গনকে অন্ধকার থেকে আলোয় এনে নিমজ্জিত করেছেন। প্রথম আঞ্চলিক ভাষার অভিধান এবং আঞ্চলিক ভাষার চ্যানেলও চট্টগ্রাম থেকে শুরু।
আমাদের রয়েছে নিজস্ব লোকজ সংস্কৃতি বলীখেলা, মেজবান, বেলা বিস্কুট, শুঁটকি, সাম্পান, মধুভাত। আমাদের রয়েছে একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র হালদা নদ। সিআরবি (চট্টগ্রাম রেলওয়ে বিল্ডিং বা বোর্ড) আমাদের শেকড় চট্টগ্রামে ঐতিহ্য ও নান্দনিক প্রাচীন স্থাপত্য প্রাকৃতিক হাসপাতাল যাকে বলা হয় চট্টগ্রামের ফুসফুস। আমাদের আছে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন দ্বীপ, পার্কি বিচ, পতেঙ্গা বিচ, গন্ডামারা বিচ, ইকোপার্ক, সাজেক ভ্যালি ও বান্দরবান এবং রাঙামাটি। দেশের অর্থনৈতি বৃহত্তম জোন মিরসরাই। এজন্য বোধহয় ভারতের জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধি (মোহন দাশ করমচাঁদ) বাংলাদেশ সফর করতে এসে চট্টগ্রামকে নিয়ে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করতে গিয়ে বলেছিলেন, Chittagong to the fore - চট্টগ্রাম সর্বত্রে এগিয়ে শিল্প উদ্যোক্তা ব্যবসায়ও কিন্তু চট্টগ্রাম প্রথম। সমগ্র দেশে শিক্ষাদীক্ষা সংস্কৃতিতেও চট্টগ্রামের মানুষ কিন্তু মেধার স্বাক্ষর রেখে চলেছে। চট্টগ্রামে উন্নয়ন মানে সমগ্র দেশের আর্থিক উন্নয়ন। দেশের আয়খাতে সিংহভাগ আসে চট্টগ্রাম থেকে।
গত ৫ আগস্টের ২৪ পর গত দেড়বছরে একটি রাজনৈতিকদলে দিকনির্দেশনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর প্রতিহিংসা এবং ব্যক্তিগত আক্রোশে চট্টগ্রামের স্বনামধন্য একটি গ্রুপের ট্যাগদিয়ে ছয়টি প্রাইভেট ব্যাংক থেকে সম্পূর্ন উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে চট্টগ্রাম বিদ্বেষী মনোভাব নিয়ে প্রতিহিংসাবশত চট্টগ্রাম বিভাগের প্রায় দশ হাজারের অধিক সম্ভাবনাময়ী মেধাবী তরুণ-তরুণীদেরকে নানাভাবে হয়রানি করে বিনা নোটিশে বিভিন্ন অজুহাতে চাকরিচ্যুত করেছেন।
বিশ্বের ব্যাংকিং ইতিহাসে এটা নজিরবীহিন ঘটনা। একাত্তরের পর অতীতে কোন গভর্নর এভাবে বেপরোয়া হয়ে চাকরিচ্যুত করেনি। নিরঅপরাধ চাকরিচ্যুত ব্যাংকাররা সবাই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স মাস্টার্স /বিবিএ/ এমবিএ পাশ করা এবং অনেকে দি ইনস্টিটিউট অব ব্যাংকারস অব বাংলাদেশ থেকে ডিপ্লোমাইড করা। এদের মধ্যে ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকউরিটি ইসলামী ব্যাংক, স্যোশাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, আলআরাফাহ ইসলামী ব্যাংক পিএলসিতে গত বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে চাকরি করে আসছেন আবার অনেকের চাকরি বয়স এক থেকে পাঁচ বছর। উল্লেখিত ছয়টি ব্যাংকের কর্মকর্তা/নির্বাহীদের কতো স্বপ্ন, প্রত্যাশা নিয়ে চাকরিতে যোগদান করেছেন।
চাকরিজীবি সন্তানদের নিয়ে বাবামায়ের এবং তাঁদের প্রিয়জনদের কতো আশা আকাঙ্ক্ষা। চাকরিচ্যুতদের মধ্যে অনেকে বিয়ে-শাদি করে নতুন সংসার পেতেছে। কারও বা শিশুা সন্তানও রয়েছে। কেউ বা পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। দশহাজার ব্যাংকারের বেতনের টাকা প্রায় লক্ষাধিক মানুষের সংসার চলে। গত দুই বছর ধরে চাকরিচ্যুত ব্যাংকারদের পরিবারের কথা একবার ভেবে দেখেছেন এই দশ লক্ষ মানুষের সংসার কিভাবে চলছে? মজলুম ব্যাংকারদের মধ্যে কেউ কেউ আজ না ফেরার দেশে অভাব-অনটনের কারণে অনেকে আজ মানবেতর জীবন যাপন করছে কেউ বেঁচে নিয়েছে অন্য পেশা অনেকে অসুস্থ অনেকে কিন্তু সবার একটাই আশা আমাদের প্রধানমন্ত্রী মহোদয় চট্টগাম সফরে গিয়ে আশ্বাস দিয়েছে মজলুমদের পক্ষে কথা বলেছেন সবার প্রত্যাশা চাকরী ফিরে পাবে।
গত ১৩ সেপ্টেম্বর ইসলামী ব্যাংক পিএলসি প্রধান কার্যালয়ের সামনে দেখা গেছে একটি রাজনৈতিক দলের ভাড়া করা কিছু গুন্ডা বাহিনী "গ্রাহক ফোরামের" নামে মাসিক বেতনধারী সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ভাড়া করে নামে লাঠিসোটা সন্ত্রাসী লালন পালন করে ব্যাংক পাহাড়া দেয়া এটা টক অব দা কান্ট্রি। সম্প্রতি ভুয়া গ্রাহক ফোরামের গুন্ডারা বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা পায়ের পাড়া দিয়ে জাতীয় পতাকার অবমাননা করেছে। যা সত্যি উদ্বেগজনক।
একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক দেশে এটা কোনভাবে মেনে নেয়া যায় না। একাত্তরে লক্ষমানুষের রক্তে লাল সবুজের পতাকা আমাদের মা মাটি মাতৃভূমি। ওরা জাতীয় পতাকায় পাড়া দেয়নি পাড়া দিয়েছে এদেশের লক্ষকোটি মায়ের বুকে। দেশদ্রোহী কুলাঙ্গারদের কঠোর শাস্তি হওয়া জরুরি। ১৪ সেপ্টম্বর সকাল সাড়ে নয়টায় মজুলম চাকরীচ্যুত ব্যাংকারদের উপর ন্যাক্কারজনকভাবে অতর্কিতভাবে হামলা চালায়। রক্তাক্ত হয় মতিঝিল দিলকুশার ব্যাংক পাড়া। এতে ৩০ জনের অধিক আহত হয় এবং ৬ জন গুরুতর আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেলসহ কয়েকটা প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। ওরা সবাই সকালবেলা শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করছিল। নিরহ নিরাপরাধ নির্দোষ চাকরিচ্যুত ব্যাংকারদের অপরাধ কী? জাতী জানতে চাই।
বাংলাদেশ ব্যাংক 'ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ' এ নির্দেশনা আছে, সুনির্দিষ্ট ও প্রমাণিত অভিযোগ ছাড়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকুরিচ্যুত করা যাবে না। এ ছাড়া অদক্ষতা অজুহাত দেখিয়ে কর্মীদের পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত অথবা পদত্যাগে বাধ্য না করারর নির্দেশনা আছে। প্রাইভেট ব্যাংকে এ্যাসিস্টেন্ট অফিসার/ক্যাশ বা এন্ট্রি লেভেলে কর্মকর্তাদের বেতন স্কেল উল্লেখ করা আছে।
কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় উল্লেখিত প্রাইভেট ব্যাংকসমুহের কর্তৃপক্ষ কোন কারণ ছাড়া ইচ্ছেকৃতভাবে প্রতিহিংসাবশত কর্মকর্তা এবং নির্বাহীদের চারকিচ্যুত করেছে যা অত্যন্ত দুঃখজনক। একটা স্বাধীন দেশে নজিরবিহীন ঘটনা এবং সম্পূর্ন বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম নিতী লংঘন করে এই ঘৃনিত কাজ। এটা ব্যাংক কর্তৃপক্ষের জন্য যেমন লজ্জাকর, ঠিক তেমন দেশের জন্য হুমকি সরূপও বটে। চট্টগ্রামের সম্মানিত অনেক জনপ্রতিনিধি সংসদ অধিবেশনে দাঁড়িয়ে চাকরিচ্যুত ব্যাংকারদের চাকরী ফিরিয়ে দেয়ার কথা উপস্থাপন করলেও তা আজও বাস্তবায়ন হয়নি।
আপনাদের কাছে আমার প্রশ্ন আগামীর প্রজন্ম আপনাদের কাছ থেকে কী শিখবে? ভেবে দেখেছেন? দেশের ভাবমূর্তি অন্যদেশে কীভাবে উপস্থাপন হচ্ছে? ভালো কাজটি যেমন মা মাটি মাতৃভূমিকে সম্মানিত করে আবার খারাপ কাজও কিন্তু যুগে যুগে ইতিহাস হয়ে থাকবে। "প্রকৃতির মাইর" বলে একটা কথা আছে। আগামী প্রজন্মরা এসব জেনে লজ্জিত হবে। বাংলাদেশ যেন আজও এক খোলা সিন্দুক। দরজার খিলবিহীন এক আজব তন্দ্রা ঘর। রাতে ঘুমাতে পারে না মানুষ। গুলির শব্দে কেঁপে উঠে শহর, ডাকাত ছিনতাইকারী আতংক। কি বিভীষিকাময় দিন পার করছে মানুষ। বিচার হয় না। প্রতিদিন খুন-খারাপনি হয়।
প্রতিদিন লাশ পাওয়া যায় দেশের বিভিন্ন জেলায়। প্রতিহিংসা সংঘাত-সহিংসতা, অপরাজনীতি, মারামারি, হানাহানি, ভয়ভীতি, হুমকি ধামকি, চাঁদাবাজী, দুষ্কৃতকারীদের যাতাকলে পিষ্ট আজ ব্যাংকাররা। আগামী প্রজন্মদের ভবিষ্যত কী এই সোনার বাংলায়। মজলুম চাকরীচ্যুত ব্যাংকাররা এই দেশের সন্তান কারও ভাই কারও বাবা কারও মা ওদের অপরাধ কি? বিনা অপরাধে ওরা কেন মার খাই? ওরা এই দেশের নাগরিক নয় কি? প্রধানমন্ত্রী মহোদয় আপনি বলেছেন সবার আগে বাংলাদেশ। দেশের মানুষ যদি ভালো না থাকে কিভাবে বাংলাদেশটা সবার আগে থাকবে? আপনা কাছে আমার সবিনয় নিবেদন। চট্টগ্রামের শান্তপ্রিয় মানুষ সংঘাত-সহিংসতা চাই না। ওদের রুটি-রুজির চাকরি ফেরত চাই। ফিরিয়ে দেয়া হোক চাকরি ইনশাআল্লাহ সবাইকে নিয়ে আগামীর বাংলাদেশ।