ইউটিউবকে টেক্কা দিতে আসছে বিলিবিলি

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: আপনি কি জানেন—কোনো ওয়াচ টাইম বা সাবস্ক্রাইবারের শর্ত ছাড়াই, প্রথম ভিডিও আপলোড করেই টাকা ইনকাম করা সম্ভব? হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন! এতদিন ধরে ইউটিউবের কড়া নিয়ম-কানুন সহ্য করে যারা কনটেন্ট বানিয়ে আসছেন, তাদের জন্য চলে এসেছে এক অবিশ্বাস্য বিকল্প। চীন ভিত্তিক নতুন ভিডিও প্ল্যাটফর্ম 'বিলিবিলি' দাবি করছে—তারা কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের প্রথম দিন থেকেই মনিটাইজেশন দেবে এবং আয়ের পরিমাণ নাকি ইউটিউবের চেয়েও বেশি হবে! কিন্তু প্রশ্ন হলো, গুগলের মতো বিশাল রাজত্ব ভেঙে বিলিবিলি কি সত্যিই পারবে ইউটিউবকে টেক্কা দিতে? নাকি এটা শুধুই এক সাময়িক হাইপ?

টেক দুনিয়া থেকে শুরু করে সোশ্যাল মিডিয়া—সর্বত্র এখন একটাই আলোচনা। কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের মুখে মুখে ঘুরছে 'বিলিবিলি' অ্যাপের নাম। বিশেষ করে বাংলাদেশে এই অ্যাপটিকে নিয়ে যেন এক অলিখিত উন্মাদনা তৈরি হয়েছে। কারণ একটাই—ইউটিউবে ভিডিও বানিয়ে আয় করতে হলে আপনাকে হাজারো কঠিন শর্ত পূরণ করতে হয়। চার হাজার ঘণ্টার ওয়াচ টাইম, এক হাজার সাবস্ক্রাইবার, আর্নিং পলিসি, চ্যানেল রিভিউ—আরও কত কী! কিন্তু বিলিবিলি অ্যাপ বাজারে আসার আগেই ঘোষণা দিয়েছে, তারা এসব ঝামেলায় যাচ্ছে না। প্রথম দিন থেকেই ক্রিয়েটররা টাকা পাবেন।

কিন্তু আসল রহস্যটা ঠিক কী? বাংলাদেশে বসে কি সত্যিই এই অ্যাপ থেকে লাখ লাখ টাকা আয় করা সম্ভব?

আজকের বাস্তব সত্যটা যাচাই করা যাক। আপনি যদি এখনই অ্যানড্রয়েড ব্যবহারকারী হিসেবে গুগল প্লে-স্টোরে গিয়ে ‘Bilibili’ লিখে সার্চ করেন, তবে হতাশ হতে হবে। প্লে-স্টোরে সরাসরি অ্যাপটি বাংলাদেশের জন্য পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি ক্রোম ব্রাউজারে বা গুগলে সার্চ করে প্লে-স্টোর লিংকে ঢুকলেও একটি চিরচেনা বার্তা ভেসে উঠছে—"দিস আইটেম ইজ নট অ্যাভেইলেবল ইন ইউর কান্ট্রি"। অর্থাৎ, আমাদের দেশে অফিশিয়ালি এখনও এই অ্যাপটি অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারকারীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়নি।

তবে অ্যাপল ব্যবহারকারীদের জন্য পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। আইফোনের অ্যাপ স্টোরে গিয়ে সার্চ করলে কিন্তু বিলিবিলি অ্যাপটি পাওয়া যাচ্ছে এবং ইনস্টলও করা যাচ্ছে। কিন্তু ইনস্টল করার পর ভেতরের ইন্টারফেস দেখলে কিছুটা খটকা লাগবে। অনেকটা ফেসবুকের নিউজফিডের মতো সাজেস্টেড ভিডিও স্ট্রাকচার থাকলেও—সেখানকার শতভাগ কনটেন্টই চায়নিজ ভাষায় তৈরি।

কেন এমন? কারণ এই বিলিবিলি মূলত চীনে তৈরি এবং দীর্ঘদিন ধরে কেবল চায়নিজ নাগরিকদের জন্যই এটা সীমাবদ্ধ ছিল। আমরা সবাই জানি, চীনে ইউটিউব সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তাই নিজেদের দেশের বিপুল জনসংখ্যার কথা চিন্তা করে তারা নিজস্ব এই প্ল্যাটফর্মটি গড়ে তোলে। কিন্তু অতি সম্প্রতি বিলিবিলি কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দিয়েছে, তারা চীন ছাড়িয়ে পুরো বিশ্বে অফিশিয়ালি অ্যাপটি লঞ্চ করতে যাচ্ছে। আর বিশ্বব্যাপী আত্মপ্রকাশের অংশ হিসেবেই তারা কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের টানতে কোনো শর্ত ছাড়া প্রথম দিন থেকেই আয়ের সুবিধার কথা জানিয়েছে।

শুনতে যতই আকর্ষণীয় মনে হোক না কেন—ইউটিউব বনাম বিলিবিলির বাস্তব লড়াইটা কিন্তু মোটেও এত সহজ নয়। টেকনিক্যাল দিক থেকে বিচার করলে বিলিবিলি এখনও ইউটিউবের চেয়ে অনেক অনেক পিছিয়ে আছে।

প্রথমত, সার্চ ইঞ্জিনের শক্তি। বিশ্বের এক নম্বর সার্চ ইঞ্জিন গুগল, আর দুই নম্বর সার্চ ইঞ্জিন হলো ইউটিউব। দুটোই একই প্রতিষ্ঠানের। ইউটিউবে আপনি যেকোনো বিষয় লিখে সার্চ করলে মুহূর্তে নির্ভুল তথ্য বা ভিডিও পেয়ে যান। বিলিবিলির সার্চ মেকানিজম এখনও ইউটিউবের ধারেকাছেও নেই।

দ্বিতীয়ত, মনিটাইজেশন সহজ হলেও অডিয়েন্স কোথায়? ইউটিউবের সূচনালগ্নেও মনিটাইজেশন খুব সহজ ছিল, পরে অডিয়েন্স বাড়ার পর নিয়ম কঠিন করা হয়েছে। ধরুন, বিলিবিলি আপনাকে প্রথম দিনেই ফ্রি মনিটাইজেশন দিলো, কিন্তু সেখানে তো আন্তর্জাতিক বা বাংলা ভাষার অডিয়েন্সই নেই! আপনি ভিডিও আপলোড করার পর যদি ভিউ আসে পাঁচটা, দশটা বা একশোটা—তবে দিনশেষে ইনকাম দাঁড়াবে শূন্যের কোঠায়। অথচ একই ভিডিও ইউটিউবে দিলে অন্তত হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছায়। অডিয়েন্স না থাকলে ফ্রিতে পাওয়া মনিটাইজেশন কোনো কাজেই আসবে না।

তৃতীয়ত, ভাষার বৈচিত্র্য ও ভিডিওর ধরন। ইউটিউবে পৃথিবীর প্রায় সব ভাষার কনটেন্ট পাওয়া যায়। আপনি বাংলায় না পেলেও ইংরেজি বা হিন্দিতে সমাধান পেয়ে যাবেন। কিন্তু বিলিবিলিতে তাৎক্ষণিকভাবে সব ভাষার কনটেন্ট বা বিশাল অডিয়েন্স তৈরি হওয়া অসম্ভব। এতে সময় লাগবে বছরের পর বছর। পাশাপাশি, ইউটিউবে লং এবং শর্ট—দুই ধরনের কনটেন্টই দারুণভাবে কাজ করে, যা বিলিবিলিতে এখনও ব্যালেন্সড নয়।

সর্বশেষ এবং সবচেয়ে বড় বিষয়—ইকোসিস্টেম। গুগল, জিমেইল, অ্যান্ড্রয়েড এবং ইউটিউব মিলে যে বিশাল ডিজিটাল নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে, কোনো নতুন অ্যাপের পক্ষে রাতারাতি সেই শক্তিশালী ইকোসিস্টেম ভেঙে ফেলা একেবারেই অসম্ভব।

তাই দিনশেষে কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য পরামর্শ হলো—সাময়িক হাইপে ভেসে যাবেন না। আপনার প্রধান প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ইউটিউবকেই রাখুন, দ্বিতীয়ত ফেসবুককে প্রাধান্য দিন। আর বিলিবিলি যদি বিশ্বব্যাপী পুরোপুরি কার্যকর হয়, তবে সেখানে ব্যাকআপ বা থার্ড প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ শুরু করতে পারেন। প্রযুক্তি আপডেট পেতে সাথেই থাকুন।

—জা.অর্থনীতি/জেআরটি