২০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ইতালি, কফিনবন্দী হয়ে ফিরে বাবার পাশে চিরনিদ্রায়
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

নোয়াখালী প্রতিনিধি: পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা ফেরানো আর সোনালী ভবিষ্যতের আশায় প্রায় ২০ লাখ টাকা ঋণ করে ইউরোপের দেশ ইতালিতে পাড়ি দিয়েছিলেন নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের তরুণ তোফায়েল আহমেদ। ভাগ্য পরিবর্তনের দূরন্ত স্বপ্ন বুক চিরে জেগে থাকলেও ইতালি পৌঁছানোর পর অধরাই থেকে গেল সেই স্বপ্ন। শেষমেশ লাশ হয়ে কফিনবন্দী দেহে জন্মভূমিতে ফিরেছেন তিনি। অশ্রুসিক্ত নয়নে জানাজা শেষে তাকে বাবার কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়েছে।

সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকালে তোফায়েলের মরদেহ বিদেশ থেকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এবং পরবর্তীতে বেগমগঞ্জের নিজ গ্রামে পৌঁছায়। 

নিহত তোফায়েল আহমেদ বেগমগঞ্জ উপজেলার ১ নম্বর আমানউল্লাহপুর ইউনিয়নের গোবিন্দের খিল মীন কাজী হাওলাদার বাড়ির মৃত জয়নাল আবেদীনের ছেলে। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী ও চার সন্তানসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

বিকেলবেলা গ্রামের বাড়ির আঙিনায় তার জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। এতে স্থানীয় সর্বস্তরের মানুষের ঢল নামে। জানাজা পরিচালনা করেন মাওলানা আবু সুফিয়ান। জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে বাবা মরহুম জয়নাল আবেদীনের কবরের পাশেই তাকে দাফন করা হয়।

রোববার ও সোমবারের মধ্যে মরদেহের কফিন গ্রামে পৌঁছানোর খবর ছড়িয়ে পড়লে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনেরা। প্রিয় মানুষটিকে শেষবারের মতো দেখতে বাড়িতে ভিড় জমান প্রতিবেশী ও দূর-দূরান্তের শত শত মানুষ। তোফায়েলের আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো আমানউল্লাহপুর ইউনিয়নে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

স্বজন ও পরিবার সূত্রে জানা গেছে, সংসারের দারিদ্র্য ঘোচাতে আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয়দের কাছ থেকে প্রায় ২০ লাখ টাকা সুদে ও ধারদেনা করে ইতালি পাড়ি দেন তোফায়েল। তবে প্রবাসে থিতু হয়ে সেই অর্থ পরিশোধের আগেই ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে প্রাণ হারান তিনি। তার এই অকাল মৃত্যুতে বিশাল অঙ্কের ঋণের বোঝা এবং চার নাবালকের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে পরিবারটি।

তোফায়েলের মা মনসুরা বেগম বুক চাপড়ে কেঁদে উঠে বলেন, "সংসারের অভাব কাটাতে ধারদেনা করে ছেলেকে সুদূর ইতালিতে পাঠিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম ছেলে উপার্জন করে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাবে। কিন্তু সেই ছেলে আজ কফিনবন্দী হয়ে ফিরল! কোনো মায়ের কাঁধে যেন সন্তানের লাশ না ওঠে। এখন ওর স্ত্রী আর চার অবুঝ সন্তানকে নিয়ে আমরা কোথায় যাব, কে দেখবে ওদের?"

স্থানীয় প্রতিবেশী দেলোয়ার হোসেন বঙ্গ মুন্সী, বাবু মাস্টার ও সাইফুল ইসলাম জানান, তোফায়েল অত্যন্ত নম্র ও পরিশ্রমী মানুষ ছিলেন। পরিবারের সুখের জন্য এত বড় ঝুঁকি নিয়ে ঋণ করে বিদেশে গিয়েছিলেন। তার এই মৃত্যুতে পরিবারটি সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। তারা বিত্তবান ও সরকারের কাছে তোফায়েলের ঋণের বোঝা লাঘবে এবং এতিম সন্তানদের পাশে দাঁড়ানোর জোরালো আহ্বান জানান।

এ বিষয়ে বেগমগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. কায়েসুর রহমান গভীর শোক প্রকাশ করে জানান, প্রবাসে মৃত তোফায়েলের পরিবারের সার্বিক খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটি যেন প্রয়োজনীয় অনুদান ও সহায়তা পায়, তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।  

—জা. অর্থনীতি/এলএটি