প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি

আশরাফুল ইসলাম তুষার, কিশোরগঞ্জ: হাওড়-বাঁওড় আর নদ-নদী বিধৌত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি কিশোরগঞ্জ। ১৩টি উপজেলা নিয়ে গঠিত বাংলাদেশের এই প্রথম শ্রেণির জেলার ৪টি উপজেলাকে সরকার ‘হাওড় উপজেলা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিশোরগঞ্জের চার হাওড় উপজেলা হলো: নিকলী, ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম।

হাওড়ের প্রবেশদ্বার: 
নিকলী উপজেলাকে হাওড়াঞ্চলের প্রবেশদ্বার বলা হয়। জেলা শহরসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে এই উপজেলার সড়কপথে সারা বছর যোগাযোগ রয়েছে। 

অল-ওয়েদার সড়ক: 
ইটনা, মিঠামইন এবং অষ্টগ্রামের জনসাধারণের সারা বছর যাতায়াতের জন্য প্রায় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ৩০ কিলোমিটারের একটি অল-ওয়েদার রোড এবং ১৭ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। তবে এই অল-ওয়েদার সড়কের সঙ্গে জেলা সদরের কিংবা দেশের অন্যান্য প্রান্তের সরাসরি সড়ক সংযোগ এখনও তৈরি হয়নি।

বর্ষার বর্তমান চিত্র: 
সাধারণত জুন মাসে পুরোদমে বর্ষা শুরু হলেও এবার পানির দেখা মিলছে কম। নতুন পানিতে ডুবো সড়কগুলো ডুবে যাওয়ায় গত ১৮ জুন থেকে সরকারি ছয়টি ফেরিঘাট বন্ধ রয়েছে। ফলে বর্তমানে যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম নৌকা বা ট্রলার।

নিকলী হাওড়ের অপরূপ রূপ ও ভ্রমণের উপযুক্ত সময়:
বর্ষার রূপ: বর্ষা শুরু হলে যেদিকে চোখ যায় শুধু দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশি আর উথাল পাথাল ঢেউ। পানিতে গ্রামগুলোকে মনে হয় একেকটি ভাসমান দ্বীপ। স্বচ্ছ জলে জেলেদের মাছ ধরার ব্যস্ততা আর হাওড়ের তরতাজা মাছের স্বাদ ভ্রমণকে করে তোলে অতুলনীয়। শীতের আমেজ: বর্ষা শেষ হলে (অক্টোবরের পর) পানি শুকিয়ে যায়। তখন জেগে ওঠে সবুজ মাঠ ও সোনালি ফসল, যা শীতকালে এক ভিন্ন মনোরম দৃশ্যের অবতারণা করে। 

উপযুক্ত সময়: 
নিকলীসহ কিশোরগঞ্জের পুরো হাওড়াঞ্চল ভ্রমণের সবচেয়ে ভালো সময় জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাস।

ঢাকা ও অন্যান্য জেলা থেকে কীভাবে আসবেন?
ঢাকা, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, নরসিংদী, গাজীপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে মাত্র একদিনেই নিকলী হাওড় ঘুরে আসা সম্ভব।
১. ঢাকা থেকে ট্রেনে (সবচেয়ে সুবিধাজনক)
ট্রেন: কমলাপুর থেকে সকাল ৭:১৫ মিনিটে ছাড়ে আন্তঃনগর ‘এগারো সিন্দুর প্রভাতী’ (বুধবার বন্ধ)। ভাড়া: ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা। 

কোথায় নামবেন: 
কিশোরগঞ্জ স্টেশনের আগে মানিকখালী অথবা গচিহাটা স্টেশনে নামলে সময় বাঁচবে (সকাল ১০:৩০টা)।
স্টেশন থেকে নিকলী: 
ইজিবাইক (জনপ্রতি ১০০/রিজার্ভ ৩০০ টাকা), সিএনজি (জনপ্রতি ৬০/রিজার্ভ ২৫০-৩০০ 
টাকা) বা অটো রিকশায় সময় লাগবে ৪০-৬০ মিনিট।
ফেরা: ওই দিনই ট্রেনে ফিরতে চাইলে বিকাল ৪টার মধ্যে স্টেশনে এসে ‘কিশোরগঞ্জ এক্সপ্রেস’ (মঙ্গলবার বন্ধ) ধরতে হবে।

২. ঢাকা থেকে বাসযোগে:
বাস ও রুট: গোলাপবাগ বা গুলিস্তান থেকে অনন্যা সুপার অথবা মহাখালী থেকে জলসিঁড়ি/উজানভাটি বাসে উঠে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদি বাসস্ট্যান্ডে নামতে হবে। ভাড়া ৩০০ থেকে ৩৮০ টাকা। (ভোর ৫:৩০ থেকে প্রতি ২০ মিনিট পর পর বাস ছাড়ে)।

কটিয়াদি থেকে নিকলী: দূরত্ব ২২ কিমি। লোকাল সিএনজি ভাড়া জনপ্রতি ৮০ টাকা, রিজার্ভ ৫০০ টাকা। সময় লাগবে ৫০ মিনিট।
বিশেষ নোট: দিনে দিন ঘুরে ফিরতে চাইলে সকাল ৬টার আগেই ঢাকা থেকে রওনা হতে হবে এবং সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে কটিয়াদি বা কিশোরগঞ্জ বাস টার্মিনালে পৌঁছতে হবে।

৩. অন্যান্য রুট ও নিজস্ব পরিবহন
কিশোরগঞ্জ শহর থেকে: রেলস্টেশন সংলগ্ন সিএনজি স্টেশন থেকে লোকাল ভাড়া ৮০ টাকা, রিজার্ভ ৪০০থেকে ৪৫০ টাকা (১ ঘণ্টা)। একরামপুর বাসস্ট্যান্ড থেকেও যাওয়া যায়। ভৈরববাজার থেকে: সিএনজি লোকাল ভাড়া ১৫০ টাকা, রিজার্ভ ৭০০ টাকা (দেড় ঘণ্টা)। নিজস্ব গাড়ি: মোটরবাইক, প্রাইভেটকার বা মাইক্রোবাস নিয়ে সরাসরি নিকলী উপজেলা সদরে আসা যায়। সেখানে বেসরকারি পার্কিং ব্যবস্থা রয়েছে।

খাওয়া-দাওয়া ও নৌকা ভ্রমণের গাইডলাইন
খাওয়া-দাওয়া:
নিকলী উপজেলা পরিষদ মোড় এবং নতুন বাজারে বেশ কিছু ভালো মানের খাবারের হোটেল রয়েছে। যেমন: হোটেল সাড়েবাইশ, আল্লাহর দান হোটেল রিজিক, হোটেল সেতু, ক্যাফে ঢেউ। এখানে হাওড়ের তাজা মাছের বিভিন্ন পদ দিয়ে ১৫০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে ভরপেট খাওয়া যায়।

নৌকা ও ট্রলার ভাড়া:
নিকলী বেড়িবাঁধের মাথা অথবা নতুনবাজার ফেরিঘাট থেকে দরদাম করে নৌকা ঠিক করতে হবে।
ছোট নৌকা: ঘণ্টা প্রতি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা।
বড় নৌকা (১০ থেকে ৩০ জন ধারণক্ষমতা): ঘণ্টাপ্রতি ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা।

হাওর ট্যুর: সারাদিনের জন্য ট্রলার রিজার্ভ করলে নিকলীর ছাতিরচরের করচ বাগান (যেখানে করচ গাছগুলো পানিতে ডুবে থাকে), মিঠামইন উপজেলা সদর, অল-ওয়েদার রোড হয়ে অষ্টগ্রাম ও ইটনা ঘুরে আসা সম্ভব।

রাত্রিযাপন ব্যবস্থা:
নিকলীতে পর্যটকদের তুলনায় ভালো হোটেলের সংখ্যা সীমিত। বেড়িবাঁধের কাছেই রয়েছে আলম রিসোর্ট এবং চেয়ারম্যান গেস্ট হাউজ। এছাড়া সরকারি সুযোগ থাকলে উপজেলা ডাকবাংলোতে থাকা যায়। পর্যাপ্ত হোটেল না থাকায় বেশিরভাগ পর্যটক কটিয়াদি বা কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের আবাসিক হোটেলগুলোতে রাত্রিযাপন করেন। নৌকায় বা ক্যাম্পিং করে রাত কাটাতে চাইলে স্থানীয় প্রশাসন বা পর্যটন পুলিশের সহায়তা নেওয়া আবশ্যক।

পর্যটকদের জন্য জরুরি সতর্কতা ও তথ্য:
যানজট এড়াতে: সরকারি ছুটির দিনগুলোতে পর্যটকদের ভিড় অনেক বেড়ে যায়। করগাঁও-নিকলী সড়কটি মাত্র ১০ ফিট প্রশস্ত হওয়ায় ছুটির দিনে ৫-৬ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। তাই ছুটির দিন বাদে অন্য দিনে ভ্রমণ করা উত্তম।
নৌকা চলাচলের সময়সীমা: নিরাপত্তার স্বার্থে মিঠামইন ও নিকলী হাওড় এলাকায় সন্ধ্যা ৬টার পর সব ধরনের পর্যটকবাহী নৌকা বা ট্রলার চলাচল পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নিষিদ্ধ/শিথিল করা হয়েছে।
নিরাপত্তা ও লাইফ জ্যাকেট: সাঁতার না জানলে হাওড়ের পানিতে নামবেন না। ভরা বর্ষায় হাওড়ে গোসল করতে নামলে অবশ্যই লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার করুন। বৈরী আবহাওয়া বা উত্তাল ঢেউ থাকলে দূরবর্তী উপজেলাগুলোতে নৌকা ভ্রমণ পরিহার করুন।

বেড়িবাঁধের বর্তমান অবস্থা: কুর্শা গ্রামের ব্রিজ হতে মোহরকোনা পর্যন্ত প্রায় ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ নিকলী বেড়িবাঁধটি ঘুরে দেখার মতো চমৎকার স্থান। তবে বর্তমানে বাঁধের বেশিরভাগ সোলার স্ট্রিট লাইট নষ্ট বা চুরি হয়ে যাওয়ায় রাতের বেলা যাতায়াতে সতর্ক থাকুন।
আইনি সহায়তা: পর্যটকদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত রয়েছে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন, থানা পুলিশ ও পর্যটন পুলিশ। 
যেকোনো প্রয়োজনে তাদের সাহায্য নিন।