শফিক আহমদ শফি, সিলেট: আগামী ১০ অক্টোবর থেকে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী শাহি ঈদগাহ মাঠে মাসব্যাপী বাণিজ্য মেলা আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছে সিলেট উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদন সাপেক্ষে মেলা আয়োজনের প্রশাসনিক প্রস্তুতি চললেও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর বিরোধিতা ও নানা তৎপরতায় অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
প্রায় তিন বছর পর সিলেটে বাণিজ্য মেলা আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নারী উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প উদ্যোক্তাদের পণ্য প্রদর্শন ও বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরির পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতে গতি আনতে এ মেলার আয়োজন করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা। তবে মেলার ঘোষণা আসার পর থেকেই এর বিরোধিতা করে মাঠে নেমেছে কয়েকটি ব্যবসায়ী সংগঠন। গত ২০ সেপ্টেম্বর ‘বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি সিলেট জেলা’ ও ‘সিলেট জেলা ব্যবসায়ী ঐক্য কল্যাণ পরিষদ’-এর ব্যানারে একদল ব্যবসায়ী জেলা প্রশাসকের কাছে মেলা বন্ধের দাবি জানিয়ে স্মারকলিপি দেন। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিভিন্ন পরীক্ষা ও বিদ্যুৎ সংকটসহ কয়েকটি কারণ দেখিয়ে তারা মেলা আয়োজনের বিরোধিতা করছেন। এদিকে মেলা আয়োজনকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ী সংগঠন ও ইভেন্ট ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পুরোনো বিরোধের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের দাবি, অতীতে মেলার ব্যবস্থাপনা ও আয়োজক নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছে। তবে বর্তমান বিরোধের পেছনে কোনো ইভেন্ট ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ বা ‘সিন্ডিকেট’ কাজ করছে—এমন অভিযোগ স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পরিস্থিতি আরও আলোচনায় আসে ২৬ সেপ্টেম্বর সিলেট-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবং শ্রম ও প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর একটি বক্তব্যের পর। ‘সিলেট মহানগর ব্যবসায়ী ঐক্য কল্যাণ পরিষদ’-এর একটি অনুষ্ঠানে তিনি মেলাটিকে অসময়ের আয়োজন হিসেবে উল্লেখ করে শৃঙ্খলার মধ্যে আনার কথা বলেন। তার বক্তব্যের পর মেলা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। মেলা আয়োজনে থাকা সিলেট উইমেন চেম্বারের পরিচালনা পর্ষদে মন্ত্রীর সহধর্মিণী সামা হক চৌধুরীও রয়েছেন। এ কারণে মেলা নিয়ে মন্ত্রীর বক্তব্যকে ঘিরে ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট মহলে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর রাজনৈতিক বিরোধ বা অন্য কোনো কারণের সঙ্গে মেলা আয়োজনের সম্পর্ক রয়েছে—এমন দাবির পক্ষে নির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে মেলা আয়োজনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন নারী উদ্যোক্তারা। গত ২২ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসক ও সিলেটে সফররত বাণিজ্যমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দেয় উইমেন চেম্বার। সংগঠনটির নেতারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে স্থবির থাকা নারী উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প উদ্যোক্তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণে এ ধরনের মেলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তাদের অভিযোগ, একটি মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মেলা আয়োজন বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে। তবে এ অভিযোগেরও স্বাধীন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। উইমেন চেম্বারের নেতারা জানিয়েছেন, মেলা আয়োজনের অধিকার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে তারা কর্মসূচি দেবেন।
সব মিলিয়ে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর বিরোধিতা, আয়োজকদের অনড় অবস্থান এবং প্রশাসনিক অনুমোদনের বিষয়টি সামনে রেখে ১০ অক্টোবরের মেলা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। শেষ পর্যন্ত মেলা নির্ধারিত সময়ে শুরু হবে কি না, তা নিয়ে অপেক্ষায় রয়েছেন উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী ও নগরবাসী।
সিলেটের জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, মেলা বন্ধের কোনো পরিকল্পনা নেই। মেলার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এর মাধ্যমে সারা দেশের প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের জন্য একটি বাজার ও পণ্য প্রদর্শনের সুযোগ সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি মেলা বিনোদনেরও একটি অংশ।
ব্যবসায়ীদের স্মারকলিপি প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক বলেন, তাদের যুক্তিও অমূলক নয়। তবে সারা দেশের ছোট ছোট উদ্যোক্তা, বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের বিষয়টিও ব্যবসায়ীদের বিবেচনায় রাখা দরকার। তিনি আরও বলেন, মেলা বন্ধে সরকারের কোনো নির্দেশনা এলে সে অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।