সানজিদ সকাল: আপাদমস্তক কবি হেলাল হাফিজ। ষাটের দশকের মূর্তমান বাস্তবতা তৎকালীন বেশ ক’জন কবির জন্য আশীর্বাদস্বরূপ হয়েছিল; তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। তার কবিতায় একদিকে প্রেম, অন্যদিকে দ্রোহ। তিনি মনে করেন, প্রেম তো এক ধরনের দ্রোহ-ই। তার লেখা কবিতাগুলো যেন একেকটি প্রেম আর দ্রোহের। ভাষার এমন সুন্দর ব্যবহার, চমৎকার শব্দ চয়ন, বিমোহিত করে সব কাব্যপ্রেমীকে। কবিতাই তার প্রেম ও সংসার। কবির কবিতায় যেমন আছে ব্যক্তির আবেগ-অনুভূতি, প্রেম-বিরহ তেমনি আছে জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং আশাভঙ্গের কথাও। বাংলা ভাষার একজন বিরল কবি হেলাল হাফিজ। যার লেখা কবিতার এক বড় এলাকা জুড়ে মর্মগ্রাহী দুঃখ ও বেদনার বিস্তার।
মাতৃহীন ছিলেন বলেই বোধহয় বেদনাবোধ এবং শূন্যতা হেলাল হাফিজকে কবি হওয়ার প্রণোদনা জুগিয়েছে। কবিতার জন্য তিনি ২০১৪ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ পেয়েছেন অনেক সাহিত্য পুরস্কার ও সম্মাননা। তিনি অত্যন্ত বিনয়ী, নিরহংকারী এবং নিভৃতচারী এক কুমার। মুক্তি ও দ্রোহের আগুন ছড়ালেও ব্যক্তিজীবনে প্রচণ্ড অভিমানী এ মানুষটি জন্মাবধি নিজের সঙ্গেই কষ্ট ফেরি করে চলেছেন।
কবি হওয়ার তার তেমন কোনো ইচ্ছা ছিল না। ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছা ছিল তার। কিন্তু ডাক্তার হলে পড়াশোনার চাপে আর কবিতা লিখতে পারবেন না বলে ডাক্তারিতে ভর্তি হননি। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে পড়াশোনা করেন। নিজের ভেতরকার হাহাকার মেটাতেই তিনি কবি হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। এই কবিতা দিয়ে তিনি টাকা-পয়সা কামাতে চাননি। তার ভাষায়, ‘কবিতা দিয়ে আমি বিত্ত-বৈভব কামাতে চাইনি, আমার আকাঙ্ক্ষা ছিল এই কবিতা দিয়ে আমি যাতে মানুষ কামাতে পারি। সবাই জমায় টাকা, আমি জমাতে চাই মানুষ!’
কবিতা লিখে মানুষের হৃদয়ে পৌঁছানো সহজ নয়। কিন্তু কবিরা এসব নিয়ে তোয়াক্কা করেন না। আপন মনে তারা শব্দের মালা গেঁথে যান। চিরাচরিত এ পর্যালোচনা আপেক্ষিকভাবে সত্য হলেও কবি হেলাল হাফিজ ব্যতিক্রম। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘যে জ্বলে আগুন জলে’ দিয়েই মানুষের হৃদয়ে আসন করে নিয়েছেন তিনি।
তিনি আজীবন করেছেন দুঃখের চাষাবাদ। বেদনাকে করেছেন নিজের বোন। দু’হাতে দুঃখ দিয়ে ভরিয়ে দিয়েছে তার জীবন। আর যেখানে দুঃখের কিছুটা কম পড়েছে, সেখানে নিজেই নিজের মতো করে দুঃখ বানিয়ে নিয়েছেন। তার কথা—‘বেদনা আমার খুব প্রিয়। আমি মনে করি সুখ আমার জন্য অতটা জরুরি নয়। কারণ সুখ শিল্পের জন্যে তেমন কোনো প্রেরণা দেয় বলে আমি মনে করি না। শিল্পের জন্যে জরুরি হচ্ছে বিরহ, বিচ্ছেদ, বেদনা।’ কষ্টকে কতটুকু কাছ থেকে দেখলে, কতটুকু গভীরে গেলে তিনি এমন উপমা দিতে পারেন, ‘পাথর চাপা সবুজ ঘাসের সাদা কষ্ট’। আবার কখনও কখনও কষ্টের ভারে তার দাঁড়িয়ে থাকাও হয়েছে কঠিন।
অল্প লিখেই গল্প হয়েছেন কবি হেলাল হাফিজ। যে কবির বধূ নেই, ঘর নেই, বাড়ি নেই, নেই কোনো বারামখানা। তিনি কষ্ট দিয়েই বপন করেছেন কবিতার বীজ। তাইতো তিনি লিখেছেন, দুঃখের আরেক নাম হেলাল হাফিজ। কবিকে দেখার মতো নেই কোনো আপনজন! বহু আগেই স্বজন-পরিবার ছেড়ে আস্ত একটা জীবন হোটেলে কাটিয়ে দিয়েছেন।
কবি হেলাল হাফিজ যখন অসুস্থ হয়ে ঢাকা পিজি হসপিটালে ছিলেন, আমি তখন তাকে দেখতে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আপনি কীভাবে সময় কাটাচ্ছেন?’ তিনি বুকে কষ্ট নিয়ে বললেন, ‘হাসপাতালে শুয়ে মনে মনে কত কবিতাই তো পড়ি ও বলি, তা কেউ জানে না। আরও কিছুদিন বাঁচার আমার খুব ইচ্ছা। এখন নিজেকে বড় একা একা মনে হয়। তুমি আমায় দোয়া করো যাতে সুস্থ হয়ে উঠি।’
বেদনার কবিকে এমন প্রশ্ন করাতে তার চোখ থেকে একফোঁটা পানি ছল ছল করে বেরিয়ে এলো। গাছ থেকে ঝরে পড়া পাতার মতো নিঃশব্দে তিনি বললেন, ‘আমি তো এখন হাসপাতালে শুয়ে আছি। এখন কী আর কবিতা লিখব!’ ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশ করার পর আমি আর কবিতা লিখতে চাই না। কারণ আমার মনে হয় এই কবিতাগুলোই আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ কবিতা। এখন কবিতা লিখলেও আর আগের মতো হবে না। সময়, আবহ ও বিষয় আগের মতো নেই। মানুষের জীবনে একটি কবিতাই যথেষ্ট। আমার শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলো আমি লিখে ফেলেছি। তাই আর নতুন কবিতা লিখি না। আমার পুরো জীবনটাই তো কবিতা। তাই কবিতায় আমি বলি—
একবার ডাক দিয়ে দেখো, আমি কতটা কাঙাল,
কতো হুলুস্থুল অনটন আজন্ম ভেতরে আমার।
তুমি ডাক দিলে
নষ্ট কষ্ট সব নিমিষেই ঝেড়ে মুছে
শব্দের অধিক দ্রুত গতিতে পৌঁছুব
পরিণত প্রণয়ের উৎসমূল ছোঁব
পথে এতটুকু দেরিও করব না।
আমি আর আহত হবো না,
কোনো কিছুতেই আমি শুধু আর আহত হবো না।