কোটি কোটি টাকার পোশাক আটকে যাচ্ছে সমুদ্রে
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

অনলাইন ডেস্ক: চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পোশাকের চালান যখন জাহাজে ওঠে, তখন তার মূল গন্তব্য থাকে ইউরোপের বাজার। সাধারণত এই জাহাজগুলো ভারত মহাসাগর, লোহিত সাগর এবং সুয়েজ খাল হয়ে খুব দ্রুত পৌঁছায়। কিন্তু নিরাপত্তা সংকটে এই রুট ব্যাহত হলে বিকল্প হিসেবে জাহাজকে আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে যেতে হয়। এতে বাড়ে প্রায় সাড়ে সাত হাজার কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ।

তবে সুয়েজ খাল কিন্তু পুরোপুরি বন্ধ নয়। পরিস্থিতি নিয়মিত পরিবর্তন হচ্ছে। কিছু শিপিং লাইন বিকল্প পথে যাচ্ছে, আবার ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে কিছু বড় কোম্পানি সুয়েজ রুটে ফেরার ঘোষণাও দিয়েছে।

একটি সাধারণ টি-শার্টের উদাহরণ ধরা যাক। গাজীপুরে তৈরি হয়ে সেটি চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সরাসরি বা অন্য আঞ্চলিক হাব ঘুরে ইউরোপের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। দীর্ঘ কেপ অব গুড হোপ রুট ব্যবহার করতে হলে যাত্রার সময় ১৫-৩০ দিন পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।

পোশাক শিল্পে সময়ের দাম সবচেয়ে বেশি। বড়দিন বা শীতের কাপড় যদি মৌসুম শেষ হওয়ার পর দোকানে পৌঁছায়, তবে ক্রেতা দাম কমিয়ে দেয় বা অর্ডার বাতিল করে। বাংলাদেশে তৈরি পোশাক রপ্তানির ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশই হয় এফওবি শর্তে, যেখানে মূল জাহাজ ভাড়া বিদেশি ক্রেতা বহন করে। কিন্তু বাস্তব বাজারে সময়মতো পণ্য না পৌঁছালে বা পরিবহন খরচ বাড়লে বড় ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশি কারখানার ওপর চাপ তৈরি করে। ফলে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোর মুনাফা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ে।

জরুরি চালান সময়মতো পৌঁছাতে বিমানে পণ্য পাঠানো আরেকটি বিকল্প, তবে তাতে খরচ অনেক বেড়ে যায়। একই সঙ্গে ইউরোপ থেকে আসার সময় কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির আমদানিও বিলম্বিত হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নে যখন ইতিমধ্যে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমে এসেছে, তখন এই ধরনের পরিবহন জটিলতা প্রতিযোগীদের সুবিধাজনক অবস্থানে বসিয়ে দিতে পারে।

তাই মূল চ্যালেঞ্জ শুধু দীর্ঘ পথের দূরত্ব নয়; আসল ভয় হলো সময় নষ্ট, অতিরিক্ত খরচ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতার আস্থা হারানো।

১টি ভুলের কারণে বাতিল হচ্ছে ইউরোপের কোটি টাকার পোশাকের অর্ডার?

আপনার পরা টি-শার্টটি ইউরোপ পৌঁছাতে ১৫ থেকে ৩০ দিন বাড়তি সময় লাগছে! সুয়েজ খালের বিকল্প হিসেবে আফ্রিকা ঘুরে দীর্ঘ সাড়ে সাত হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে শিপিং জাহাজগুলোকে। ফলে শীতের পোশাক ইউরোপে পৌঁছাচ্ছে শীত শেষ হওয়ার পর! এতে বিদেশি ক্রেতারা অর্ডার বাতিল করছেন বা চরম মূল্যছাড় দাবি করছেন। ক্ষতিটা কার হচ্ছে? চুক্তি অনুযায়ী ভাড়া ক্রেতা দেওয়ার কথা থাকলেও, দিনশেষে দরকষাকষিতে দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে বাংলাদেশের ছোট ছোট পোশাক কারখানাগুলো!

টি-শার্টের দাম ৫০% বৃদ্ধি? লোহিত সাগরের আসল সত্য জেনে নিন!

লোহিত সাগরের সংকটে কি ইউরোপের দোকানে বাংলাদেশের টি-শার্টের দাম রাতারাতি দ্বিগুণ হয়ে যাবে? উত্তর হলো, না! সমুদ্রের জাহাজ ভাড়া বাড়লেও একটা কাপড়ের মোট দামে তার প্রভাব পড়ে খুব সামান্য। তবে আসল বিপদ লুকিয়ে আছে অন্য জায়গায়। কাঁচামাল সময়মতো না আসা এবং বিমানে চড়া দামে পণ্য পাঠানোর কারণে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার মুনাফা। দূরত্ব নয়, সময় আর আন্তর্জাতিক ক্রেতার আস্থাই এখন বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ!    

 

—জা. অর্থনীতি/এলএটি