শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে উন্মুক্ত খেলার মাঠ নিশ্চিত করা হোক

শিশুর শৈশবের সঙ্গে খেলার মাঠের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। মাঠে দৌড়ানো, খেলাধুলা করা, বন্ধুদের সঙ্গে মেশা— এসব কেবল বিনোদনের বিষয় নয়, বরং শিশুর শারীরিক সুস্থতা, মানসিক বিকাশ, সামাজিক দক্ষতা ও সৃজনশীলতা গড়ে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। অথচ রাজধানী ঢাকায় শিশু-কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য সেই সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। শহরে খেলার মাঠের সংখ্যা থাকলেও সেগুলোর বড় অংশে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার নেই। কোথাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ, কোথাও আবাসিক কলোনির বিধি-নিষেধ, আবার কোথাও ক্লাবের দখল ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড মাঠের স্বাভাবিক ব্যবহার বাধাগ্রস্ত করছে। ফলে মাঠের হিসাব থাকলেও শিশুদের খেলার অধিকার নিশ্চিত হচ্ছে না।

গতকাল ‘জাতীয় অর্থনীতি’র এক প্রতিবেদনে ‘কাগজে-কলমে ঢাকায় খেলার মাঠ ২৩৫, উন্মুক্ত মাত্র ২৪টি’ ঢাকা শহরের খেলার মাঠের স্পষ্ট চিত্র ফুটে উঠেছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) প্রতিবেদন বলছে, এর মধ্যে ১৪১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের, ২৪টি আবাসিক কলোনির এবং ১২টি ঈদগাহ মাঠ। ১৬টি সরকারি মাঠ বিভিন্নভাবে দখল হওয়ার তথ্যও রয়েছে। সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত মাঠের সংখ্যা মাত্র ৪২টি। অন্যদিকে দুই সিটি করপোরেশনের নিজস্ব খেলার মাঠ মাত্র ২৪টি। অর্থাৎ রাজধানীর বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য উন্মুক্ত খেলার জায়গা অত্যন্ত সীমিত।

রাজধানীর ১২৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৪১টিতে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত কোনো খেলার মাঠ নেই। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১০টি এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩১টি ওয়ার্ডে এই সংকট রয়েছে। বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার (ড্যাপ) খসড়ায় প্রতি ১২ হাজার ৫০০ মানুষের জন্য একটি মাঠের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। দুই সিটির প্রায় ১ কোটি ৮৪ লাখ মানুষের হিসাবে প্রয়োজনীয় মাঠের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় দেড় হাজার। 

এই সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার শিশু-কিশোররা। শহরের অনেক শিশুর বেড়ে ওঠা এখন চার দেওয়ালের মধ্যে রয়ে গেছে। শিশুরা বাড়ি থেকে বিদ্যালয়, বিদ্যালয় থেকে কোচিং, এরপর মুঠোফোন কিংবা কম্পিউটারের পর্দায় সময় কাটাচ্ছে। নিরাপদ ও সহজলভ্য খেলার জায়গা না থাকায় তাদের স্বাভাবিক শারীরিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ নেই বললেই চলে। নিয়মিত খেলাধুলার অভাবে শারীরিক সক্ষমতা, দলগতভাবে কাজ করার অভ্যাস, নেতৃত্বের গুণ এবং পরাজয় মেনে নেওয়ার মানসিকতা গড়ে ওঠার সুযোগও সংকুচিত হচ্ছে। মাঠ শিশুদের শুধু শরীরচর্চার জায়গা নয়, এটি পারস্পরিক সহযোগিতা, সহনশীলতা ও সামাজিক বন্ধন তৈরিরও  বড় ক্ষেত্র।

সুস্থ বিনোদন, সামাজিক মেলামেশা ও গঠনমূলক কর্মকাণ্ডের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়লে শিশু-কিশোরদের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই মাঠ রক্ষা ও উন্মুক্ত করার বিষয়টি কেবল নগরসৌন্দর্য বা অবসর বিনোদনের প্রশ্ন নয়, এটি জনস্বাস্থ্য, শিশু অধিকার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এই বাস্তবতায় আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ৪০টি এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ৯০টি মাঠ খেলাধুলার উপযোগী করার সরকারি উদ্যোগ ইতিবাচক। প্রতি দুই থেকে তিনটি ওয়ার্ডের জন্য অন্তত একটি মাঠ নিশ্চিত করার নির্দেশনাও গুরুত্বপূর্ণ। তবে ঘোষণার চেয়ে বাস্তবায়নই এখানে বেশি জরুরি। শুধু মাঠ সংস্কার বা সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না, মাঠগুলোতে শিশু-কিশোরসহ সাধারণ মানুষের নিয়মিত ও নির্বিঘ্ন প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

এজন্য প্রথমেই বিদ্যমান মাঠগুলোর পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করে মালিকানা, বর্তমান ব্যবহার, দখল ও প্রবেশাধিকারের অবস্থা প্রকাশ করা প্রয়োজন। অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে থেকে ব্যবস্থা নিতে হবে। রাজউক, দুই সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠ নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে স্থানীয় শিশু-কিশোরদের জন্য উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে নতুন আবাসন ও নগর উন্নয়ন পরিকল্পনায় মাঠের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা সংরক্ষণ করতে হবে। মাঠগুলো যেন পার্কিং, বাজার, মেলা কিংবা বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের স্থায়ী জায়গায় পরিণত না হয় তা নিশ্চিত করাও জরুরি।

ঢাকাকে শিশুদের বাসযোগ্য শহর করতে হলে তাদের খেলার অধিকারকে নগর পরিকল্পনার কেন্দ্রে রাখতে হবে। মাঠের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যমান মাঠগুলোকে মানুষের ব্যবহারের উপযোগী করে তুলতে হবে। যে শহরে শিশুরা প্রাণ খুলে দৌড়াতে পারে না, সেখানে সুস্থ ও মানবিক প্রজন্ম গড়ে তোলার প্রত্যাশা পূরণ করা কঠিন ব্যাপার। তাই মাঠের মালিকানা নয়, মাঠ ব্যবহারের অধিকার নিশ্চিত করাই হোক সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।