হাসান আরিফ, ব্যাংকক থেকে: আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নতুন কর্মসূচির আওতায় তিন বছরে ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ নিতে চায় বাংলাদেশ। আগামী ডিসেম্বর থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩৬ মাসের এ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চলছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ঋণ চুক্তি স্বাক্ষরের আশা করছেন বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের শীর্ষ কর্মকর্তারা।
গতকাল বৃহস্পতিবার ব্যাংককে আইএমএফের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক নাইজেল ক্লার্কের সঙ্গে বৈঠক করে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল। বৈঠকের আলোচনাকে ‘ফলপ্রসূ’ উল্লেখ করে কর্মকর্তারা জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, চলতি মাসের শেষে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করবে। এরপর কর্মকর্তা পর্যায়ের সমঝোতার সময় ঋণের পরিমাণ ও শর্ত চূড়ান্ত হবে।
বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, আইএমএফের সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে। ঋণ পেতে কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে। এসব শর্ত কী হবে এবং কীভাবে পূরণ করা হবে তা নিয়ে আরও আলোচনা হবে। কিছু বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে।
অর্থমন্ত্রী জানান, ব্যাংক খাত, কর-জিডিপি অনুপাত, ব্যাংকের পুনঃমূলধনীকরণ ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আইএমএফের পর্যবেক্ষণ রয়েছে। এসব বিষয়ে বাংলাদেশেরও সম্মতি রয়েছে। ইতোমধ্যে অনেক সমস্যার সমাধান হয়েছে। বাকি বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা চলবে।
সংস্কারের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে আইএমএফের প্রশ্ন রয়েছে সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশেরও কিছু পর্যবেক্ষণ রয়েছে। ব্যাংক খাত ও কর-জিডিপি অনুপাত নিয়ে আইএমএফের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে বাংলাদেশ একমত। ইতোমধ্যে অনেক শর্ত পূরণও হয়েছে।
বৈঠকে উপস্থিত বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের একজন কর্মকর্তা বলেন, ব্যাংক খাতের সংস্কার পরিকল্পনা আইএমএফের কাছে তুলে ধরা হবে। এতে আমানতকারীদের আস্থা ফেরানো ও খেলাপি ঋণ কমানোর পরিকল্পনা থাকবে।
ওই কর্মকর্তা জানান, ইতোমধ্যে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের আমানত ফেরত দেওয়া হচ্ছে। গতকাল থেকে ন্যাশনাল ব্যাংকের গ্রাহকদেরও আমানত ফেরত দেওয়া শুরু হয়েছে। সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোর আমানতকারীদের নিয়মিত অর্থ ফেরত দেওয়ার মাধ্যমে তাদের আস্থা বাড়ানোর চেষ্টা চলবে।
ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ কমাতেও পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে জানান ওই কর্মকর্তা। তবে নতুন ঋণ চুক্তিতে খেলাপি ঋণের হার কতটা কমানোর লক্ষ্য থাকবে তা এখনও নির্ধারিত হয়নি।
২০২৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্বাক্ষরিত ঋণ চুক্তিতে ২০২৬ সালের মধ্যে খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি ছিল। তবে বর্তমানে এ হার বেড়ে প্রায় ৩৩ শতাংশ হয়েছে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে আইএমএফ সন্তুষ্ট বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তার ভাষ্য, বাজেটের পরবর্তী সময়ের অগ্রগতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধসহ বৈশ্বিক নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা নিয়ে সংস্থাটি সন্তোষ প্রকাশ করেছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, আইএমএফের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকসহ অন্যান্য বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীর সঙ্গেও অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করবে বাংলাদেশ। দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে এসব সংস্থার সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত থাকবে।
গতকালের কর্মসূচিতে আইএমএফ ছাড়াও আন্তর্জাতিক অর্থায়ন করপোরেশন (আইএফসি) ও জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) প্রতিনিধিদের সঙ্গে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের বৈঠক অন্তর্ভুক্ত ছিল।
সূত্র জানায়, সকালে নারী ও মেয়েদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধে বিশ্বব্যাংক ও যুক্তরাজ্যের আয়োজনে রুদ্ধদ্বার প্রাতরাশ বৈঠক হয়। এ ছাড়া আইএমএফের মুদ্রা ও পুঁজিবাজার বিভাগের কারিগরি সহায়তা নিয়ে বৈঠক, জেপি মরগ্যানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং জাপান টোব্যাকোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। দুপুরে আইএফসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাখতার ডিওপের সঙ্গে বৈঠক করে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল।