চোখের ছানি বয়স্ক মানুষের দৃষ্টিশক্তি হারানোর অন্যতম প্রধান কারণ। সময়মতো অস্ত্রোপচার ও উপযুক্ত কৃত্রিম লেন্স সংযোজনের মাধ্যমে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব। কিন্তু চিকিৎসার এই সুযোগ যদি অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়, তবে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক। রাজধানীর বেসরকারি চক্ষু হাসপাতালগুলোয় ছানি অস্ত্রোপচারের প্যাকেজের আওতায় কৃত্রিম লেন্সের জন্য কয়েক গুণ বেশি অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। সরকারের নির্ধারিত সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) এবং সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা অমান্যের এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
ছানি অস্ত্রোপচারে ব্যবহৃত কৃত্রিম লেন্সের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণের পাশাপাশি সরকার লেন্সের দাম প্যাকেজের বাইরে রাখা, মূল্য উল্লেখ করে রোগীকে ক্যাশমেমো দেওয়া এবং অস্ত্রোপচারের পর লেন্সের প্যাকেট ফেরত দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে। এসব ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হলো লেন্সের প্রকৃত মূল্য সম্পর্কে রোগীকে অবহিত করা এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সুযোগ সীমিত করা। কিন্তু নির্দেশনা কাগজে থাকলেই হবে না; বাস্তবে তার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। প্যাকেজের নাম ব্যবহার করে লেন্সের প্রকৃত মূল্য আড়াল করা হলে রোগীর পক্ষে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের বিষয়টি শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের বক্তব্য অনুযায়ী, এ বিষয়ে তারা ভোক্তাদের কাছ থেকে অভিযোগ পাননি। অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মাসুম আরেফিন জাতীয় অর্থনীতিকে জানিয়েছেন, ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইনের ৭৩ ধারার আওতায় বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবায় ত্রুটি-বিচ্যুতির অভিযোগ পেলে অধিদপ্তর তদন্ত করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরকে জানাতে পারে। তবে সরাসরি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা তাদের নেই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথ অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, সমস্যার সমাধানে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।
চোখের লেন্সে অতিরিক্ত মূল্য আদায় বন্ধ করা এবং ছানি অস্ত্রোপচারে রোগীর স্বার্থ সুরক্ষায় চাই কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কয়েকটি ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। এক. স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে রাজধানীসহ সারা দেশের বেসরকারি চক্ষু হাসপাতাল ও ক্লিনিকে নিয়মিত পরিদর্শন চালাতে হবে। কোন ধরনের লেন্সের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য কত, তা হাসপাতালের দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। রোগীকে অস্ত্রোপচারের আগে লেন্সের ব্র্যান্ড, মডেল, নির্ধারিত মূল্য এবং চিকিৎসাসেবার অন্যান্য খরচ পৃথকভাবে জানাতে হবে। প্যাকেজের নামে লেন্সের মূল্য গোপন বা বিভ্রান্তিকরভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে কি না, তা বিশেষভাবে যাচাই করতে হবে। দুই. প্রতিটি অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে লেন্সের ক্রয়চালান, প্যাকেটের গায়ে মুদ্রিত মূল্য, রোগীর ক্যাশমেমো এবং হাসপাতালের বিল মিলিয়ে দেখার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। রোগীকে লেন্সের প্যাকেট ফেরত দেওয়ার নির্দেশনা যথাযথভাবে কার্যকর করতে হবে। এসব তথ্য সংরক্ষণ ও ডিজিটালভাবে যাচাইয়ের ব্যবস্থা চালু হলে মূল্য কারসাজি শনাক্ত করা সহজ হবে। নির্দেশনা লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। তিন. লেন্সের সরবরাহব্যবস্থা ও আমদানি পর্যায়ে মূল্য নির্ধারণের যৌক্তিকতা পর্যালোচনা করা দরকার। আমদানি ব্যয়, শুল্ক, পরিবহন খরচ এবং সরবরাহকারীর মুনাফা বিবেচনায় নিয়ে স্বচ্ছ মূল্যকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে মানসম্মত ও নিরাপদ লেন্সের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি বা কৃত্রিম সংকট তৈরির সুযোগ না থাকে। দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্ত রোগীদের জন্য সরকারি হাসপাতালে ছানি অস্ত্রোপচারের সক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ভর্তুকি বা বিশেষ সহায়তা চালু করাও জরুরি।
এছাড়া সেবাগ্রহীতা তথা রোগীদের অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা করতে হবে। হাসপাতালের অভিযোগকেন্দ্র, হটলাইন ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অভিযোগ গ্রহণ করে দ্রুত তদন্তের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। রোগীকে লেন্সের মূল্যসহ পূর্ণাঙ্গ বিল বুঝে নিতে এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানাতে উৎসাহিত করতে হবে।
চোখের দৃষ্টি মানুষের অমূল্য সম্পদ। এই সম্পদ ফিরে পাওয়ার চিকিৎসাকে অতিরিক্ত মুনাফার হাতিয়ার হতে দেওয়া যায় না। সরকারের নির্দেশনা বাস্তবায়ন, সংশ্লিষ্ট সংস্থার সমন্বিত অভিযান, স্বচ্ছ মূল্যতালিকা এবং নিয়মিত জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে লেন্স সংযোজনের ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। চিকিৎসাসেবা হবে মানবিক, মূল্য হবে যৌক্তিক এবং রোগীর অধিকার থাকবে সুরক্ষিত— এটাই হওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট সবার অঙ্গীকার।