জাকির হোসাইন, ঢাকা: ১৯৯৬ সালের শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির ঘটনায় করা অধিকাংশ মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি প্রায় তিন দশকেও। কোনোটি চলছে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে, কোনোটির বিচার কার্যক্রম উচ্চ আদালতের আদেশে স্থগিত। কয়েকটি মামলায় আসামিরা খালাস পেলেও সেই রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল এখনও বিচারাধীন। বিশ্লেষকরা বলছেন, বিচারে দীর্ঘসূত্রিতা অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে দায়মুক্তির মনোভাব তৈরি করছে। ফলে শেয়ারবাজার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট গভীর হচ্ছে।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালের কেলেঙ্কারির ঘটনায় ৩৮ ব্যক্তি, আটটি তালিকাভুক্ত কোম্পানি ও ছয়টি ব্রোকারেজ হাউজের বিরুদ্ধে ১৫টি মামলা করা হয়। সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯-এর ১৭ ধারা লঙ্ঘনের অভিযোগে এসব মামলা হয়। একই অধ্যাদেশের ২৪ ধারায় এসব অপরাধের শাস্তির বিধান রয়েছে।
ওই কেলেঙ্কারি তদন্তে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আমিরুল ইসলাম চৌধুরীকে প্রধান করে চার সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কমিটি ১৯৯৭ সালের ২৭ মার্চ সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়। এর সুপারিশের ভিত্তিতে মামলা করে বিএসইসি।
তবে এসব মামলায় প্রথম রায় আসতে সময় লাগে প্রায় ১৮ বছর। ১৯৯৭ সালের ২ এপ্রিল চিক টেক্সটাইল ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে করা মামলায় ২০১৫ সালের আগস্টে দুই আসামিকে কারাদণ্ড ও জরিমানা করেন বিশেষ ট্রাইব্যুনাল।
বিএসইসির দেওয়া মামলাগুলোর হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, রূপন অয়েল অ্যান্ড ফ্যাটসের বিরুদ্ধে করা একটি মামলা আসামি নুরুন্নবীর মৃত্যুর কারণে ২০১১ সালের ৩০ মার্চ নিষ্পত্তি হয়। আমাম সী ফুডস ইন্ডাস্ট্রিজ ও এপেক্স ফুডস-সংশ্লিষ্ট মামলা বিশেষ ট্রাইব্যুনালে চলছে।
এইচএমএমএস ফাইন্যান্সিয়াল কনসালট্যান্স অ্যান্ড সিকিউরিটিজের মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় আসামিদের খালাস দেওয়া হয়। সিকিউরিটিজ কনসালট্যান্টসের মামলাতেও আসামিরা খালাস পান। দুটি রায়ের বিরুদ্ধেই কমিশনের করা ফৌজদারি আপিল হাইকোর্টে বিচারাধীন।
চীন টেক্সের মামলায় দুই আসামিকে চার বছর করে কারাদণ্ড এবং ৩০ লাখ টাকা করে জরিমানা করেন ট্রাইব্যুনাল। জরিমানা অনাদায়ে আরও ছয় মাসের কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। তবে ওই দুই আসামি এখনও পলাতক বলে বিএসইসির তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।
চট্টগ্রাম সিমেন্ট ক্লিংকার গ্রাইন্ডিং কোম্পানির মামলাতেও আসামিরা খালাস পেয়েছেন। ওই রায়ের বিরুদ্ধে কমিশনের করা আপিল হাইকোর্টে বিচারাধীন। বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে করা মামলাটি হাইকোর্টে খারিজ হয়। সেই আদেশের বিরুদ্ধে কমিশনের আপিল এখন আপিল বিভাগে বিচারাধীন।
এস এম সামসুল্লাহ ও সোহা সিকিউরিটিজের বিরুদ্ধে করা মামলাটিও হাইকোর্টে খারিজ হয়েছে। ওই আদেশের বিরুদ্ধে কমিশনের করা ফৌজদারি আপিল বিভাগে বিচারাধীন।
ফার্স্ট ক্যাপিটাল সিকিউরিটিজের মামলার কার্যক্রম হাইকোর্টের আদেশে স্থগিত রয়েছে। এসইএস কোম্পানির মামলার কার্যক্রমও রিট নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত করেছেন হাইকোর্ট।
প্রিমিয়াম সিকিউরিটিজ-সংক্রান্ত মামলায় ২০১৭ সালের ২৩ এপ্রিল সংশ্লিষ্ট আসামিদের খালাস দেন বিশেষ ট্রাইব্যুনাল। ওই রায়ের বিরুদ্ধে কমিশনের করা ফৌজদারি আপিল হাইকোর্টে বিচারাধীন। একই মামলায় অন্য দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিচার কার্যক্রমও হাইকোর্টের আদেশে স্থগিত রয়েছে।
অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজের মামলা বিশেষ ট্রাইব্যুনালে চলছে। ইমতিয়াজ হোসেন অ্যান্ড কোম্পানির মামলায় নিম্ন আদালতের কার্যক্রমে স্থগিতাদেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। মামলাটি উচ্চ আদালতে বিচারাধীন।
২০১০ সালের দুটি মামলাও অনিষ্পন্ন
২০১০ সালের শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি তদন্তে খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের নেতৃত্বে চার সদস্যের কমিটি গঠন করে সরকার। কমিটি ২০১১ সালের ৭ এপ্রিল তৎকালীন অর্থমন্ত্রীর কাছে তিন শতাধিক পৃষ্ঠার প্রতিবেদন জমা দেয়। ওই ঘটনায় পরে দুটি মামলা করা হয়।
এর মধ্যে সৈয়দ সিরাজউদ্দৌলা, রাশেদা আক্তার মায়া ও মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান মোড়লের বিরুদ্ধে করা মামলায় নিম্ন আদালতের বিচার কার্যক্রম হাইকোর্টের আদেশে স্থগিত রয়েছে। মামলাটি হাইকোর্টে বিচারাধীন। আবু সাআদ মো. সায়েম ও মো. আবদুল মোমিন মোড়লের বিরুদ্ধে করা অন্য মামলাটি বিশেষ ট্রাইব্যুনালে চলছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশের শেয়ারবাজারে বড় দুটি কেলেঙ্কারির বিচার দীর্ঘ সময় ধরে ঝুলে থাকা জবাবদিহি নিশ্চিত করার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের মতে, ১৯৯৬ সালের ঘটনায় সময়মতো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে পরবর্তী সময়ে বড় অনিয়মের ঝুঁকি কমানো যেত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক মাহমুদ ওসমান ইমাম জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, সময়মতো বিচার না হলে অনিয়মকারীদের মধ্যে দায়মুক্তির মনোভাব তৈরি হয়। এতে একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি বাড়ে। তার মতে, ১৯৯৬ সালের ঘটনায় দায়ী সবাইকে বিচারের আওতায় আনা যায়নি বলেই ২০১০ সালেও বড় অনিয়ম ঘটেছে। বিচারে দীর্ঘসূত্রিতা বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটও গভীর করেছে।
জরিমানা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তা আরোপ করা যৌক্তিক। তবে আদায় নিশ্চিত না হলে শাস্তির কার্যকারিতা থাকে না। প্রয়োজনে আদালতের মাধ্যমে সম্পদ জব্দের ব্যবস্থা রাখতে হবে। দ্রুতবিচার নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত ট্রাইব্যুনাল ও অভিজ্ঞ বিচারক নিয়োগ এবং বিচারকদের পুঁজিবাজার বিষয়ে প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেন তিনি।
মামলার দীর্ঘসূত্রিতা কমাতে কমিশনের উদ্যোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, বিষয়টি আদালতের এখতিয়ারাধীন। বিএসইসির পক্ষ থেকে সর্বাত্মক চেষ্টা করা হয়েছে। মামলাগুলো হাইকোর্টে বিচারাধীন থাকায় এ পর্যায়ে কমিশনের সরাসরি কিছু করার সুযোগ নেই। নিম্ন আদালতে থাকলে সেগুলো ট্রাইব্যুনালে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া যেত।