ফারহানা মীম: একটি শহরের সকাল শিশুর জন্য একই রকম হয় না। কোথাও স্কুলের ঘণ্টা শুনে শিশুরা বই-খাতা হাতে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করে, আবার কোথাও কোনো শিশু দিনের শুরুতেই নেমে পড়ে দুমুঠো খাবারের সংস্থান করতে। কারও কাছে শৈশব মানে খেলাধুলা, পড়াশোনা আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন; কারও কাছে শৈশব মানে জীবিকার তাগিদে ছুটে চলা, অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করা। একই শহরে বেড়ে ওঠা শিশুদের জীবনে এমন বৈপরীত্য কেবল দারিদ্র্যের চিত্র নয়, এটি আমাদের সামাজিক বাস্তবতারও এক নির্মম প্রতিচ্ছবি।
রংপুর রেলস্টেশন এলাকার পথশিশুদের জীবন এই বাস্তবতা সামনে নিয়ে আসে। যে বয়সে তাদের বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা, সে বয়সেই অনেক শিশুকে ফুল, বাদাম কিংবা অন্যান্য পণ্য বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহে সহায়তা করতে হয়। কেউ দোকানে কাজ করে, কেউ দিনের দীর্ঘ সময় কাটায় রাস্তায়। তাদের কাছে সময়মতো খাবার পাওয়া, রাতে নিরাপদে ঘুমানো কিংবা অসুস্থ হলে চিকিৎসা নেওয়াও অনেক সময় অনিশ্চিত। অথচ এসবই একটি শিশুর স্বাভাবিক জীবনের মৌলিক চাহিদা। যে বয়সে তাদের স্বপ্ন দেখার কথা, সে বয়সেই বাস্তবতার কঠিন হিসাব তাদের কাঁধে চেপে বসে।
পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতা শিশুকে কাজে নামায়; কাজের চাপ তাকে শিক্ষা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়; শিক্ষার অভাব ভবিষ্যতে ভালো কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা সংকুচিত করে। এভাবে দারিদ্র্যের একটি চক্র তৈরি হয়, যার মধ্যে আটকে পড়ে শিশুর শৈশব ও ভবিষ্যৎ। শিশুকে শুধু কাজ ছেড়ে বিদ্যালয়ে যেতে বললেই এই চক্র ভাঙা সম্ভব নয়। পরিবারের জীবিকা, শিশুর খাবার এবং পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পরিবেশ— সবকিছুর প্রতিই সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
মেয়েশিশুদের বাস্তবতা আরও জটিল ও উদ্বেগজনক। দারিদ্র্য ও অনিশ্চিত জীবিকার পাশাপাশি তাদের যৌন হয়রানি, নির্যাতন, শোষণ ও পাচারের ঝুঁকির মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। রাস্তায় কিংবা অনিরাপদ পরিবেশে দীর্ঘ সময় কাটানো তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়ার ঝুঁকিও যুক্ত হতে পারে। ফলে মেয়েশিশুদের বঞ্চনা শুধু শিক্ষা ও জীবিকার সংকটে সীমাবদ্ধ থাকে না; তাদের স্বাস্থ্য, আত্মমর্যাদা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাও হুমকিতে পড়ে। তাই পথশিশুদের জন্য যেকোনো পরিকল্পনায় মেয়েশিশুদের বিশেষ প্রয়োজন ও সুরক্ষার বিষয়টি আলাদাভাবে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
ক্ষুধা ও অপুষ্টিও তাদের জীবনের বড় উদ্বেগ। নিয়মিত ও পুষ্টিকর খাবার না পেলে শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে, মনোযোগ কমে যেতে পারে, এমনকি শেখার ক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ক্ষুধার্ত অবস্থায় শ্রেণিকক্ষে বসে পড়াশোনা করা কিংবা অন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা সহজ নয়।
শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। রংপুর রেলস্টেশন এলাকায় জুম বাংলাদেশ স্কুলের মতো উদ্যোগ সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। তবে একটি শিশুকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো আর তার শিক্ষাজীবন নিশ্চিত করা এক বিষয় নয়। নিয়মিত খাবার, বই-খাতা, পোশাক, উপযুক্ত শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষকের পাশাপাশি প্রয়োজন এমন পরিবেশ, যেখানে শিশুটি কাজের চাপে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে না। অনুদান বা ব্যক্তিগত সহায়তা কমে গেলে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে শিশুদের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তাই শিক্ষার উদ্যোগগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি ও ধারাবাহিক সহায়তার আওতায় আনা জরুরি।
এই পরিস্থিতি পরিবর্তনে প্রয়োজন সমন্বিত ও বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, সমাজসেবা অধিদপ্তর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলা যেতে পারে। কত শিশু শিক্ষার বাইরে রয়েছে, কারা শিশুশ্রমে যুক্ত, কারা নিয়মিত খাবার ও নিরাপদ আশ্রয় থেকে বঞ্চিত— এসব চিহ্নিত করে তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা নিশ্চিত করা দরকার। সমাজের সামর্থ্যবান মানুষ ও বিভিন্ন সংগঠনের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিচ্ছিন্নভাবে খাবার বা পোশাক বিতরণের পাশাপাশি শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রয়োজন এমন প্রচেষ্টা, যেখানে শিশুকে কেবল সহায়তা গ্রহণকারী হিসেবে নয়, বরং সম্ভাবনাময় একজন মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
প্রতিটি শিশুর জীবনেই সম্ভাবনা রয়েছে; প্রয়োজন সেই সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ তৈরি করা। শৈশব যেন কারও জন্য স্বপ্ন দেখার সময় হয়, আর কারও জন্য কেবল বেঁচে থাকার সংগ্রাম না হয়ে ওঠে— এই প্রত্যাশাই হোক একটি মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের ভিত্তি।
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।