১২ বছর পর একই দিনে বড়াইগ্রামে আবারও মৃত্যুর মিছিল
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

নাটোর প্রতিনিধি: ঠিক ১২ বছর পর একই তারিখে, একই সড়কে ২০২৬ সালের ২০ অক্টোবর নাটোরের বড়াইগ্রামে বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ গেল ১৪ জনের।

২০১৪ সালের ২০ অক্টোবর বনপাড়ার রেজুর মোড়ে দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছিলেন ৩৭ জন। আহত হয়েছেন অন্তত ২০ জন।

আজ ভোররাতে নাটোর-পাবনা মহাসড়কের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের সামনে জাহেদা ক্লিনিকের কাছে বাস-ট্রাক মুখোমুখী সংঘর্ষে ১৪ জন নিহত হয়েছেন। 

একের পর এক প্রাণহানিতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে পুরো এলাকায়। একইসঙ্গে মহাসড়কের নিরাপত্তা, যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।

জানা গেছে, কুয়াকাটা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জগামী আরপি পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে আসা বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই ১০ জন নিহত হন। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও ৪ জনের মৃত্যু হয়। আহত অন্তত ২০ জনকে উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়।

দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন স্থানীয় লোকজন, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা। হতাহতদের উদ্ধার এবং আহতদের হাসপাতালে পাঠাতে তারা কাজ করেন। 

এ দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আবুল হায়াৎকে আহ্বায়ক করে সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

এর আগে ২০১৪ সালের ২০ অক্টোবর বড়াইগ্রামের বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কের রেজুর মোড়ে দুটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৩৭ জন নিহত হয়েছিলেন। বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনার ইতিহাসে যা অন্যতম ভয়াবহ দিন হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে। 

স্থানীয়দের কেউ সড়কের প্রশস্ততা কম হওয়াকে, কেউ যানবাহনের অতিরিক্ত গতি ও ওভারটেকিংকে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন। তবে, এবারের দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত করার কথা জানিয়েছে পুলিশ প্রশাসন।

দুর্ঘটনাকবলিত বাসের যাত্রী আব্দুস সালাম অভিযোগ করেছেন, বাসটিতে অতিরিক্ত যাত্রী বহন করা হচ্ছিল এবং দ্রুত গতিতে চালানো হচ্ছিল। অতিরিক্ত যাত্রী বহন ও দ্রুত গতির কারণেই এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।

বড়াইগ্রাম ক্লাবের সভাপতি মো. অহিদুল হক সরকার বলেন, সরু রাস্তার কারণেই দুর্ঘটনা বেশি হচ্ছে। ডিভাইডারসহ সড়কটি চার লেনে উন্নীত করা হলে এমন দুর্ঘটনা হতো না।

নাটোরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক বলেছেন, ট্রাকটি মহাসড়কের বাম পাশের লেন দিয়ে চলছিল। এ সময় দ্রুতগতির বাসটি অন্য যানবাহনকে ওভারটেক করতে গিয়ে ট্রাকটির সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায় বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, ওভারটেকিং এবং অতিরিক্ত গতির বিষয়টি দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে সামনে এসেছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত দুর্ঘটনার চূড়ান্ত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।

নাটোরের জেলা প্রশাসক মোছা. সুমনী আক্তার জানান, দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে ৭ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। দুর্ঘটনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। নিহতদের মরদেহ দ্রুত শনাক্ত করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।

বড়াইগ্রামের মানুষের প্রত্যাশা, ১২ বছর আগের সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনা এবং এবারের প্রাণহানি যেন কেবল শোকের স্মৃতি হয়ে না থাকে। মহাসড়কে নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক, যাতে আর কোনো পরিবারকে সড়কে স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে ফিরতে না হয়।

২০০২ সালে এই সড়ক চালুর পর থেকে ২০২৬ সালের ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত এ সড়কে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৮৪৭ জন।

—জা. অর্থনীতি/এনজে