নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতিকে সচল রাখা উপকূলীয় এলাকাগুলো এখন সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। উপযুক্ত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নিলে আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে এ অঞ্চলে বন্যাজনিত বার্ষিক আর্থিক ক্ষতি ছয় গুণেরও বেশি বাড়বে বলে সতর্ক করেছে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি)। তবে সময়মতো অভিযোজন খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করা গেলে সম্ভাব্য ক্ষতির তুলনায় ২০ গুণ পর্যন্ত বেশি সুফল পাওয়া সম্ভব বলে সংস্থাটির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
গতকাল বুধবার এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক প্রকাশিত ‘এশিয়া-প্যাসিফিক ক্লাইমেট রিপোর্ট ২০২৬: কোস্টাল রিস্কস অন দ্য রাইজ-অ্যাকশনস ফর এ রেজিলিয়েন্ট ফিউচার’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ম্যানিলায় অবস্থিত এডিবির প্রধান কার্যালয় থেকে এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের উপকূলজুড়ে ঝুঁকি প্রতিনিয়ত বাড়ছে এবং এর অর্থনৈতিক প্রভাব ইতোমধ্যেই পড়তে শুরু করেছে। টেকসই অভিযোজন ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে ২০৫০ সালের মধ্যে এ অঞ্চলের উপকূলীয় বন্যাজনিত বার্ষিক ক্ষতির পরিমাণ বর্তমানের চেয়ে ছয় গুণেরও বেশি বাড়তে পারে। এমনকি ২১০০ সাল নাগাদ এ ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২০ গুণে গিয়ে ঠেকতে পারে। ৩০টি উপকূলীয় অর্থনীতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই গবেষণায় বলা হয়, বর্তমানে এ অঞ্চলে বন্যাজনিত কারণে বছরে প্রায় ২৭ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়, যা ২০৫০ সাল নাগাদ ১৭২ থেকে ১৯৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। শতাব্দীর শেষভাগে অর্থাৎ ২১০০ সালে এ ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ গিয়ে দাঁড়াবে প্রায় ৫২০ থেকে ৭৩৯ বিলিয়ন ডলারে। তবে উপযুক্ত বিনিয়োগের মাধ্যমে এই বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব বলে মনে করছে সংস্থাটি। যদি উপকূলীয় সুরক্ষা খাতে প্রতিবছর ৯ বিলিয়ন থেকে ১৯ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা যায়, তবে তা বার্ষিক প্রায় ১৭৮ থেকে ৩৬০ বিলিয়ন ডলারের বন্যাজনিত ক্ষতি রোধ করতে ভূমিকা রাখতে পারবে।
এডিবির ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট ডিপার্টমেন্টের ডিরেক্টর জেনারেল ইয়েভগেনি জুকোভ এ প্রসঙ্গে বলেন, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রগতির মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো এর উপকূলীয় এলাকা। তবে সমুদ্রের ক্রমাগত উচ্চতা বৃদ্ধি এবং তীব্র দুর্যোগের কারণে উপকূলীয় এলাকাগুলো ধীরে ধীরে তাদের ভূখণ্ড হারাচ্ছে। আমরা এখন একটি জটিল মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছি। মানুষ ও তাদের জীবনযাত্রাকে নিরাপদ রাখতে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে এখনই দীর্ঘমেয়াদি, খাপ খাইয়ে নেওয়ার মতো ও ঝুঁকিমুক্ত সমাধানের পথে হাঁটতে হবে।
এডিবির সদস্য দেশগুলোর মধ্যে উপকূলীয় এলাকায় বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা বিপুল। প্রায় ৪০ কোটিরও বেশি মানুষ সমুদ্র উপকূলের মাত্র ১০ কিলোমিটারের মধ্যে বসবাস করে, যা প্রতি ১০ জনের মধ্যে ১ জনেরও বেশি। এই এলাকাগুলো কেবল বিশাল জনসংখ্যার আবাসস্থলই নয়, বরং এগুলো গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর, বাণিজ্যিক কেন্দ্র, পর্যটন স্থান ও বিশ্ব ঐতিহ্যের প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পর্যাপ্ত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নিলে বড় অর্থনীতির দেশগুলো বিপুল আর্থিক ক্ষতির শিকার হবে। তবে তুলনামূলক বিচারে ক্ষুদ্র প্রবালদ্বীপ বা অ্যাটল কেন্দ্রিক রাষ্ট্রগুলোতে এর ক্ষতিকর প্রভাব হবে মারাত্মক। ২১০০ সালের মধ্যে উচ্চ-কার্বন নিঃসরণের পরিস্থিতিতে এসব ক্ষুদ্র দ্বীপ রাষ্ট্রের বার্ষিক বন্যাজনিত ক্ষয়ক্ষতি তাদের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩০ শতাংশ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
এদিকে ব্যাংকক, জাকার্তা, কলকাতা এবং মুম্বাইয়ের মতো মেগা সিটিগুলো উপকূলীয় বন্যার ক্ষেত্রে মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসব বড় শহরে আগে যে ধরনের মারাত্মক উপকূলীয় বন্যা ১০০ বছরে একবার দেখা যেত, এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ তা প্রতিবছর ঘটার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এছাড়া এ অঞ্চলের বন্দরগুলোতে বাণিজ্য স্থবিরতা ও অন্যান্য বিঘ্ন ঘটার কারণে প্রতিবছর প্রায় ৪০ বিলিয়ন থেকে ৪৫ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ বা বাণিজ্য ঝুঁকিতে পড়ছে।
উপকূলীয় এই প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য এডিবির পক্ষ থেকে কয়েকটি বিশেষ জাতীয় পরিকল্পনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সরকারগুলোকে এমনভাবে অভিযোজন পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে যেন তা স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। একইসঙ্গে চারটি প্রধান সুপারিশ রাখা হয়েছে-সাধারণ উন্নয়ন সিদ্ধান্তে অভিযোজন পরিকল্পনা যুক্ত করা, প্রাতিষ্ঠানিক ও সুশাসনব্যবস্থা শক্তিশালী করা, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি মালিকানা বজায় রাখা।
প্রতিবেদনে অর্থায়নের ঘাটতির চিত্রটিও উঠে এসেছে। এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উপকূলীয় দেশগুলোতে আন্তর্জাতিক অভিযোজন অর্থায়ন ২০১৫ সালের ৫ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০২২-২৩ সময়ে বার্ষিক গড়ে ১১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হলেও চাহিদার তুলনায় অর্থায়নের এই বড় ঘাটতি থেকেই গেছে। দীর্ঘমেয়াদি এই ঝুঁকি মোকাবিলায় শুধু সরকারি অর্থের ওপর নির্ভর না করে সরকারি সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি অতিরিক্ত সরকারি, বেসরকারি ও সুবিধাজনক শর্তের যৌথ অর্থায়নের তাগিদ দিয়েছে সংস্থাটি।