মো. ইউনুছ আলী, কুড়িগ্রাম: শিল্পায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে গড়ে ওঠা কুড়িগ্রাম বিসিক শিল্পনগরী এখন প্রায় পরিত্যক্ত। ৩৯টি শিল্প ইউনিটের মধ্যে ৩২টিই বন্ধ হয়ে গেছে। কোনো রকমে চালু রয়েছে মাত্র সাতটি ইউনিট। সেগুলোতেও উৎপাদন বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর কারণে ইতোমধ্যে প্রায় দুই হাজার শ্রমিক কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। বর্তমানে চালু থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাজ করছেন প্রায় ২০০ শ্রমিক।
শিল্পনগরীটিতে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে না ওঠা এবং একের পর এক কারখানা বন্ধ হওয়ার পেছনে উদ্যোক্তা ও পুঁজির অভাব, ব্যাংকঋণ না পাওয়া, বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং স্থান নির্বাচনের ত্রুটিসহ নানা কারণ রয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। শিল্পনগরীটি সচল করতে কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র ও এলাকাবাসী জানান, কুড়িগ্রাম শহর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে যতিনের হাট এলাকায় ১৯৮১ সালে ২০ একর জমির ওপর বিসিক শিল্পনগরী প্রতিষ্ঠা করা হয়। কুড়িগ্রাম-চিলমারী বন্দর সড়কসংলগ্ন এ শিল্পনগরী গড়ে তোলার মূল উদ্দেশ্য ছিল চরাঞ্চলবেষ্টিত অনগ্রসর জেলার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করা। প্রাথমিকভাবে এখানে ২০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।
কিন্তু যথাযথ উদ্যোক্তা নির্বাচন ও প্রয়োজনীয় সহায়তার অভাবে সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি। শিল্পনগরীতে বরাদ্দ দেওয়া হয় ১৩৩টি প্লট। এর মধ্যে ছয়টি প্লটের বরাদ্দ বাতিল করা হয়েছে। উন্নয়ন করা ৮৮টি প্লটে ৩৯টি শিল্প ইউনিট চালু হলেও পরে একে একে বন্ধ হয়ে যায় পাটকল, হাসকিং মিলসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান।
বর্তমানে একটি সিলভার কারখানা, তিনটি প্লাস্টিক কারখানা এবং কয়েকটি চালকল ও চাতালসহ হাতে গোনা কিছু প্রতিষ্ঠান চালু রয়েছে। চালকল ও চাতালগুলোও সারা বছর সচল থাকে না। অধিকাংশ ইউনিট বন্ধ থাকায় শিল্পনগরীটির পরিবেশ এখন অনেকটাই নির্জন। দিনেরবেলায় বিভিন্ন স্থানে গরু-ছাগল চরে বেড়ায়। রাতে সেখানে নেশাগ্রস্তদের আড্ডা বসে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
শিল্পনগরীটির সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান কুড়িগ্রাম জুট মিলস তিন বছর আগে প্রায় ২৬ কোটি টাকার ঋণের বোঝা নিয়ে বন্ধ হয়ে যায়। এক সময় এ মিলে প্রায় ৫০০ শ্রমিক কাজ করতেন। তাদের মধ্যে তিন শতাধিক ছিলেন স্থানীয় দরিদ্র নারী। মিলটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কর্মসংস্থান হারান এসব শ্রমিক। নারী শ্রমিক আলেয়া বেগম, জ্যোৎনা আখতার ও আছমা বেগম জানান, বাড়ির কাছে কাজের সুযোগ পেয়ে তাঁরা স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু কারখানা বন্ধ হওয়ার পর তাদের সেই সুযোগ শেষ হয়ে গেছে। এখন তারা বেকার জীবন কাটাচ্ছেন। পুরুষ শ্রমিকদের কেউ কেউ কাজের সন্ধানে ঢাকা ও গাজীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় চলে গেছেন। কেউ জীবিকা নির্বাহ করছেন দিনমজুরি করে। তবে নারী শ্রমিকদের অনেকেই বিকল্প কর্মসংস্থান না পেয়ে বেকার হয়ে পড়েছেন।
শ্রমিকরা জানান, বিসিক শিল্পনগরীর বাইরেও কুড়িগ্রাম টেক্সটাইল মিলস ও কুড়িগ্রাম স্পিনিং মিলস নামে দুটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ছিল। সেগুলোও বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জেলায় শিল্পভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও কমেছে।
কুড়িগ্রাম জুট মিলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অরূপ কান্তি রায় জানান, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়েছিল। উৎপাদন সচল রাখতে শ্রমিকদের অতিরিক্ত সময় কাজ করাতে হতো। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায় এবং একপর্যায়ে লোকসানের মুখে কারখানাটি বন্ধ করতে হয়। দায়দেনা পরিশোধের জন্য কারখানাটি বিক্রির চেষ্টা করা হলেও এখন পর্যন্ত উপযুক্ত উদ্যোক্তা পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, বন্ধ হয়ে যাওয়া মা গার্মেন্টসের মালিক আমজাদ হোসেন জানান, ছোট পরিসরে তার কারখানায় শার্ট-প্যান্ট তৈরি করা হতো। কিন্তু পুঁজির সংকটে দুই বছর আগে কারখানাটি বন্ধ করে দিতে হয়। ব্যাংকঋণের জন্য অনেক চেষ্টা করেও তিনি ঋণ পাননি। একই কারণে তার মালিকানাধীন সরকার ফার্নিচারও বন্ধ হয়ে গেছে।
স্থানীয়দের মতে, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে কুড়িগ্রাম বিসিক শিল্পনগরী আবারও সচল হতে পারে। এতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি বেকার শ্রমিকদের জীবিকায় ফেরার সুযোগ তৈরি হবে।