অধ্যাপক ড. হাসিব মোহাম্মদ আহসান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক এবং দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) পরিচালক। তিনি পরিবহন প্রকৌশল ও সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞ। সড়ক দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান, দুর্ঘটনা প্রতিরোধ এবং নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে কথা বলছেন জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সানজিদুল ইসলাম।
জাতীয় অর্থনীতি: সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ বারবার ব্যর্থ হচ্ছে কেন? সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা কোথায়?
অধ্যাপক ড. হাসিব মোহাম্মদ আহসান: সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো বিষয়টির গুরুত্ব যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে না পারা। সড়ক দুর্ঘটনায় একজন মানুষের মৃত্যু শুধু একটি প্রাণহানি নয়; এর সঙ্গে একটি পরিবারের স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ ও জীবিকার প্রশ্ন জড়িয়ে থাকে। দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি পরিবারের কষ্ট আমরা যদি সত্যিকার অর্থে উপলব্ধি করতে পারতাম, তাহলে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আরও আন্তরিক ও কার্যকর উদ্যোগ নিতাম। সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে আমরা অনেক কথা বলি, সভা-সেমিনার করি, অর্থ ব্যয় করে নানা কর্মসূচি পালন করি। কিন্তু এসব উদ্যোগের ফলে বাস্তবে দুর্ঘটনা কতটা কমছে, মানুষের প্রাণহানি কতটা নিয়ন্ত্রণে আসছে— সেদিকে যথেষ্ট নজর দেওয়া হয় না। শুধু কর্মসূচি পালন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; গৃহীত পদক্ষেপের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করতে হবে এবং তার ফলাফল নিয়মিত অনুসরণ করতে হবে। আমরা যদি দুর্ঘটনা প্রতিরোধের দায়িত্ব নির্দিষ্ট করে দিতে না পারি এবং ব্যর্থতার জন্য কাউকে জবাবদিহির আওতায় আনতে না পারি, তাহলে কেউই কার্যকরভাবে দায়িত্ব নেবে না। তখন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে অনুষ্ঠান, সম্মেলন ও সেমিনার চলতে থাকবে, কিন্তু বাস্তবে দুর্ঘটনা কমছে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে না।
জাতীয় অর্থনীতি: দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির প্রকৃত চিত্র কতটা নির্ভরযোগ্য? বিভিন্ন সংস্থার পরিসংখ্যানে পার্থক্য দেখা যায় কেন?
অধ্যাপক ড. হাসিব মোহাম্মদ আহসান: সড়ক দুর্ঘটনার প্রকৃত চিত্র জানতে নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডারের কোনো বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে দায়িত্ব নির্ধারণ করা অত্যন্ত জরুরি। দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ, বিশ্লেষণ এবং সেগুলোর ভিত্তিতে গবেষণার মাধ্যমে সমাধান বের করার জন্য নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব নিতে হবে। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই সড়ক দুর্ঘটনার তথ্যের ক্ষেত্রে কিছুটা আন্ডার রিপোর্টিং বা প্রকৃত ঘটনার তুলনায় কম তথ্য নথিভুক্ত হওয়ার প্রবণতা রয়েছে। সব দুর্ঘটনা আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত হয় না। বিশেষ করে, ছোটখাটো দুর্ঘটনা কিংবা আপস-মীমাংসার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়া ঘটনাগুলো অনেক সময় প্রতিবেদনে আসে না। তবে এ ধরনের কম তথ্য নথিভুক্ত হওয়ার একটি নির্দিষ্ট সীমা থাকে। বাংলাদেশে বিভিন্ন সংস্থার পরিসংখ্যানের মধ্যে যে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যায়, তা উদ্বেগজনক। এক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ ও নথিভুক্ত করার প্রক্রিয়ায় দায়িত্বশীলতার ঘাটতি রয়েছে। অনেক সময় দুর্ঘটনার তথ্যসংক্রান্ত নির্ধারিত ফরমও যথাযথভাবে পূরণ করা হয় না। ফলে দুর্ঘটনার প্রকৃত সংখ্যা, প্রাণহানির পরিমাণ এবং দুর্ঘটনার ধরন সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য চিত্র পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
জাতীয় অর্থনীতি: মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে কী ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন? তরুণদের মধ্যে মোটরসাইকেলের ব্যবহার বৃদ্ধি, অতিরিক্ত গতি, হেলমেটের মান ও চালকের প্রশিক্ষণের ঘাটতি— এসব ঝুঁকি কমাতে কোন পদক্ষেপগুলো অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত?
অধ্যাপক ড. হাসিব মোহাম্মদ আহসান: মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে প্রথমেই প্রয়োজন সচেতনতা ও সঠিক শিক্ষা। এখানে শিক্ষা বলতে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে বোঝাচ্ছি না; বরং নিরাপদে মোটরসাইকেল চালানো, দুর্ঘটনার ঝুঁকি সম্পর্কে জানা এবং দুর্ঘটনায় নিজের ও অন্যের কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে, তা উপলব্ধি করাও শিক্ষার অংশ। এসব বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
তরুণদের মধ্যে মোটরসাইকেল ব্যবহারের প্রবণতা বেশি। একজন তরুণ যখন দেখেন তার বন্ধুরা মোটরসাইকেল চালাচ্ছেন, তখন তারও মোটরসাইকেল কেনার আগ্রহ তৈরি হতে পারে। সামর্থ্য থাকলে তিনি মোটরসাইকেল কিনছেন। কিন্তু মোটরসাইকেল চালানোর আগ্রহ থাকলেই যে নিরাপদে চালানোর দক্ষতা তৈরি হয়ে যায়, বিষয়টি এমন নয়। সুযোগ পেলে অনেকে বেশি গতিতে যানবাহন চালাতে চান। কিন্তু কোথায় কত গতিতে চালানো নিরাপদ, কোন পরিস্থিতিতে গতি কমাতে হবে এবং নিজের পাশাপাশি অন্যের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করতে হবে-এসব বিষয়ে চালকদের সচেতন করা অত্যন্ত জরুরি।
জাতীয় অর্থনীতি: সড়ক দুর্ঘটনার দায় কি শুধু চালকের, নাকি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোরও? ত্রুটিপূর্ণ সড়ক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, পরিবহনমালিকদের অতিরিক্ত মুনাফার চাপ কিংবা চালকদের দীর্ঘ কর্মঘণ্টা দুর্ঘটনার কারণ হলে দায় নির্ধারণ ও জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত করা উচিত?
অধ্যাপক ড. হাসিব মোহাম্মদ আহসান: আমরা অনেক সময় দুর্ঘটনার জন্য শুধু চালককে দায়ী করি। কিন্তু এর পেছনে পরিবহনমালিক, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং সামগ্রিক পরিবহন ব্যবস্থারও দায় থাকতে পারে। এই দায়গুলো যথাযথভাবে চিহ্নিত করা প্রয়োজন।
আপনি বাসের রঙ পরিবর্তন বা পুরোনো বাসের কথাই ধরুন। একটি পুরোনো বাস দিয়ে যদি একজন মালিক আয় করতে পারেন, তাহলে তিনি নতুন বাস কেনার প্রয়োজন কেন অনুভব করবেন? অথচ পুরোনো বা ত্রুটিপূর্ণ বাস সড়কে চলাচল করতে দেওয়া হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, এসব বাস কীভাবে চলাচলের অনুমতি পাচ্ছে? পুলিশ যদি বাস আটকায়, আবার সেটি ছেড়েও দেয়, তাহলে নিয়মের যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন উঠবেই। আইন অনুযায়ী ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল করার কথা নয়। তারপরও যদি সেগুলো সড়কে চলতে পারে, তাহলে বুঝতে হবে কোথাও নিয়মের ব্যত্যয় ঘটছে। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে শুধু চালককে দায়ী করলে চলবে না। যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত করা, আইন প্রয়োগে অনিয়ম বন্ধ করা, পরিবহন মালিকদের দায়িত্বশীল করা এবং বাস চলাচলে কার্যকর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা জরুরি।
জাতীয় অর্থনীতি: সড়ক পরিবহন আইন থাকা সত্ত্বেও তার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না কেন?
অধ্যাপক ড. হাসিব মোহাম্মদ আহসান: সড়ক পরিবহন আইনের বিদ্যমান আইনগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে কি না, সেটি নিশ্চিত করা। আমরা ছোট আইন করি, বড় আইন করি কিংবা আইন সংশোধন করি, কিন্তু যে আইনগুলো ইতোমধ্যে রয়েছে, সেগুলো কার্যকরভাবে প্রয়োগের ব্যবস্থা আগে নিতে হবে। আইন প্রণয়ন করাই যথেষ্ট নয়, মানুষকে সেই আইন মেনে চলতে অভ্যস্ত করে তুলতে হবে। আইন মানা শুধু শাস্তির ভয়ে নয়, বরং দৈনন্দিন আচরণ ও সামাজিক সংস্কৃতির অংশ হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। অর্থাৎ আইন মানার অভ্যাস গড়ে তুলতে সময় দিতে হয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে আইন প্রয়োগে সব সময় কঠোর শাস্তির ওপরই নির্ভর করতে হবে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে আইন মেনে চলবে।
জাতীয় অর্থনীতি: ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলন নিয়ে অনেকে রাস্তায় নেমে নানা ধরনের হেনস্তা, বাধা ও প্রতিকূলতার মুখে পড়তে হয়েছে। সরকার কেন সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধের দায় যথাযথভাবে নিচ্ছে না, আর সাধারণ মানুষের মধ্যেও এ বিষয়ে জোরালো সামাজিক আন্দোলন বা প্রতিবাদ গড়ে উঠছে না কেন?
অধ্যাপক ড. হাসিব মোহাম্মদ আহসান: বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা অনেকাংশেই ব্যবসাকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। বাস, ট্রাকসহ সড়কে চলাচলকারী প্রায় প্রতিটি যানবাহনের সঙ্গে কোনো না কোনো ব্যবসায়িক স্বার্থ জড়িত। ফলে পরিবহন খাতের ব্যবসায়িক স্বার্থ অনেক সময় সড়ক নিরাপত্তার স্বার্থকে পেছনে ঠেলে দিচ্ছে। পরিবহন খাতে কার্যকর ও কঠোর আইন প্রণয়ন এবং তার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই ব্যবসায়িক স্বার্থ একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে বা নিরাপত্তার ঘাটতি প্রকাশ পেলে সংশ্লিষ্টদের দায়বদ্ধতার প্রশ্নও ওঠে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই তারা সেই দায় যথাযথভাবে নিতে চান না। পরিবহন খাতের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা যদি শুধু নিজেদের ব্যবসার লাভ-ক্ষতির হিসাব দেখেন, কিন্তু যাত্রীদের নিরাপত্তা ও মানুষের জীবনের মূল্যকে সমান গুরুত্ব না দেন, তাহলে সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হবে।
জাতীয় অর্থনীতি: দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান বা ব্ল্যাক স্পট চিহ্নিত করার পরও দুর্ঘটনা ঘটছে কেন? অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট এ ব্যাপারে কোন ব্ল্যাকস্পট নির্ধারণের কোন কার্যক্রম করে থাকে কিনা বা তার পদক্ষেপ নেয় কিনা?
অধ্যাপক ড. হাসিব মোহাম্মদ আহসান: দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান বা ব্ল্যাক স্পট চিহ্নিত করার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সেসব স্থানে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করা। কোনো সড়ককে দুর্ঘটনাপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করা হলো, সেখানে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ডও বসানো হলো; কিন্তু দুর্ঘটনা কমাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া না হলে এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) বর্তমানে এটি বুয়েটের একটি ইনস্টিটিউট হিসেবে অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমেও যুক্ত হয়েছে। গত টার্ম থেকে অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং গত টার্ম ও চলতি টার্মে শিক্ষার্থী ভর্তি নেওয়া হচ্ছে। এখানে শিক্ষার্থীদের পড়ানো হচ্ছে এবং ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি দেওয়া হচ্ছে। ফলে বর্তমানে অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনায় আমাদের বেশি মনোযোগ দিতে হচ্ছে। ব্ল্যাক স্পটের তালিকা ও দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করার কাজ অনেক আগে থেকেই বিভিন্ন পর্যায়ে হয়ে আসছে। তবে কোনো স্থান চিহ্নিত করার পর সেখানে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন। দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান কোনো স্থায়ী পরিচয় নয়। যথাযথ ব্যবস্থা নিলে সেখানকার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।