চেকইন-চেকআউটে স্বেচ্ছাচারিতা, দিনে ও রাতে আলাদা ভাড়া

সৈয়দ ইকবাল, ঢাকা: সন্ধ্যা ৬টায় চেকইন, পরদিন সকাল ৯টার মধ্যে চেকআউট। রাত্রিযাপনের জন্য ভাড়া দিয়েও কক্ষে থাকার সুযোগ মাত্র ১৫ ঘণ্টা। এরপর একই কক্ষ আবার ভাড়া দেওয়া হয় দিনের অতিথিদের কাছে। ঢাকার আশপাশের বেশ কিছু রিসোর্টে এভাবে দিনে ও রাতে আলাদা প্যাকেজে কক্ষ ভাড়া দেওয়া হচ্ছে। চেকইন ও চেকআউটের এমন সময়সূচিকে স্বেচ্ছাচারিতা বলছেন ক্ষুব্ধ পর্যটকরা।

পর্যটকরা বলছেন, সন্ধ্যায় চেকইন করে পরদিন সকালেই কক্ষ ছাড়তে হলে ভ্রমণ পরিকল্পনা সংক্ষিপ্ত করতে হয়। যাতায়াতের সময় ও যানবাহনের প্রাপ্যতার সঙ্গে সময়সূচি না মিললে বাড়তি অপেক্ষাও করতে হয়। বিশেষ করে রাত্রিযাপনের পর সকালে তাড়াহুড়া করে কক্ষ ছাড়তে হওয়ায় অবকাশযাপনের স্বস্তি কমে যায়।

 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ ও পূর্বাচলসহ ঢাকার আশপাশের কিছু রিসোর্টে সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত ‘ডে লং’ প্যাকেজ চালু রয়েছে। সন্ধ্যা থেকে পরদিন সকাল পর্যন্ত নেওয়া হয় রাত্রিযাপনের অতিথি। কোনো কোনো রিসোর্টে দুই প্যাকেজের ভাড়াও সমান। পর্যটকদের অভিযোগ, এক রাতের জন্য বুকিং দিয়েও তারা প্রত্যাশিত সময় কক্ষ ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেন না।

রিসোর্টসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অতিথিদের চাহিদা অনুযায়ী দিনে ও রাতে আলাদা প্যাকেজ রাখা হয়েছে। চেকইন ও চেকআউটের সময়ও নির্ধারণ করা হচ্ছে নিজস্ব নীতিতে। অন্যদিকে পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সেবার মান ও পর্যটকদের স্বার্থ রক্ষায় সাধারণ নিয়ম এবং নজরদারি নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছেন।

গাজীপুরের জঙ্গলবাড়ি রিসোর্টে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন রাজধানীর বনশ্রীর বাসিন্দা মো. নাজমুল। তিনি জানান, পূজার ছুটিতে যাওয়ার জন্য রিসোর্টটির ফেসবুক পেজে দেওয়া নম্বরে যোগাযোগ করেন। তাকে জানানো হয়, রাত্রিযাপনের জন্য সন্ধ্যা ৬টায় চেকইন করে পরদিন সকাল ৯টার মধ্যে কক্ষ ছাড়তে হবে। অর্থাৎ থাকার সুযোগ মাত্র ১৫ ঘণ্টা।

নাজমুলের ভাষ্য, দিনের প্যাকেজের সময় সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা। দুই প্যাকেজের দামও কাছাকাছি। তিনি বলেন, ‘তাদের অনেকভাবে বুঝিয়ে বলার পরও চেকআউট সময় বাড়াবে না বলল। কারণ হিসেবে জানাল, দিনেরবেলায় তাদের গেস্ট চলে আসবে।’

এই অভিযোগের পর পর্যটক পরিচয়ে জঙ্গলবাড়ি রিসোর্টে যোগাযোগ করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, সাড়ে ৪ হাজার টাকার ডে লং প্যাকেজে নিচতলায় একটি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষ, সুইমিংপুল ব্যবহার, দুপুরের খাবার ও ওয়াইফাই সুবিধা পাওয়া যাবে। দ্বিতীয় তলার কক্ষ নিলে ভাড়া ৫ হাজার টাকা। চেকইন সকাল ১০টায়, চেকআউট বিকাল ৫টায়।

রাত্রিযাপনের প্যাকেজেও কক্ষভেদে একই ভাড়া দিতে হবে। এতে রাতের খাবার, সকালের নাশতা, সুইমিংপুল ব্যবহার ও ওয়াইফাই সুবিধা রয়েছে। তবে চেকইন সন্ধ্যা ৬টায় এবং চেকআউট পরদিন সকাল ৯টায়। এমন সময়সূচির কারণ জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে শুধু ‘ম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্ত’ বলে জানানো হয়। এ বিষয়ে আর কোনো তথ্য দিতে রাজি হয়নি তারা।

মুন্সীগঞ্জের মেঘনা ভিলেজ হলিডে রিসোর্টেও একই ধরনের সময়সূচির তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানটির ডে লং প্যাকেজে চেকইন সকাল ৯টায় এবং চেকআউট বিকাল ৫টায়। রাত্রিযাপনের ক্ষেত্রে চেকইন সন্ধ্যা ৬টায়, চেকআউট পরদিন সকাল ৯টায়। অর্থাৎ দিনের প্যাকেজে আট ঘণ্টা এবং রাত্রিযাপনে ১৫ ঘণ্টা থাকার সুযোগ মিলছে।

অনুসন্ধানে তুরাগ ওয়াটার রিসোর্ট, শ্রীপুরের নামীর গ্রিন রিসোর্ট, পূর্বাচলের নিঝুম পল্লী, মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানের এম জে হলিডে ও মাওয়া রিসোর্টসহ আরও কিছু প্রতিষ্ঠানে দিনে ও রাতে পৃথক প্যাকেজে অতিথি নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

রিসোর্টসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, কেউ দিনেরবেলা এসে ঘুরে চলে যেতে চান আবার কেউ রাত্রিযাপন করতে চান। এই দুই ধরনের চাহিদা বিবেচনায় প্যাকেজ সাজানো হয়। চেকইন ও চেকআউটের জন্য সরকার নির্ধারিত অভিন্ন সময়সূচি না থাকায় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের মতো সময় নির্ধারণ করছে।

তবে ঢাকার কয়েকটি বড় হোটেল ও কক্সবাজারের রিসোর্টের সময়সূচির সঙ্গে এর পার্থক্য রয়েছে। সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার পাঁচতারকা হোটেল ওয়েস্টিনে চেকইন দুপুর ২টার পর এবং চেকআউট দুপুর ১২টার আগে। প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে চেকইন দুপুর ৩টার পর, চেকআউট দুপুর ১২টার আগে। কক্সবাজারের সি পার্ল বিচ রিসোর্টে চেকইন দুপুর ২টা থেকে এবং চেকআউট বেলা ১১টায়। এসব সময়সূচিতে এক রাতের বুকিংয়ে প্রায় ২১ থেকে ২২ ঘণ্টা কক্ষ ব্যবহারের সুযোগ থাকে।

বাংলাদেশ ট্যুরিজম রিসোর্ট ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি খবির উদ্দিন আহমেদ জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘নিজেদের পলিসি অনুযায়ী রিসোর্টগুলো তাদের চেকইন-চেকআউট টাইম নির্ধারণ করছে।’ তিনি জানান, ঢাকার কাছের কিছু রিসোর্ট দিনে ও রাতে দুই ভাগে অতিথি নিচ্ছে। এতে পর্যটকরা থাকার জন্য কম সময় পাচ্ছেন। তবে ঢাকা থেকে দূরের রিসোর্টগুলো একটি প্রচলিত সময়সূচি মেনে চলছে।

গেস্ট হাউজ, মোটেল, রিসোর্ট, রেস্ট হাউজগুলো ‘বাংলাদেশ হোটেল ও রেস্তোরাঁ আইন, ২০১৪’ এবং এর অধীনে প্রণীত বিধিমালার অন্তর্ভুক্ত। এতে মূলত নিবন্ধন, লাইসেন্স, স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ ও অতিথির নিরাপত্তার মতো বিষয়ে বিধান আছে। অতিথিকে সেবা দিতে অস্বীকার বা উচ্ছেদের ক্ষেত্রেও শর্ত ও অভিযোগেরও সুযোগ আছে। কিন্তু চেকইন বা চেকআউটের নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়ার বিধান নেই। 

বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের উপব্যবস্থাপক শেখ মেহদি হাসান জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, দেশের হোটেল-রিসোর্টের আবাসনসেবা বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় ব্যয়বহুল। কিছু রিসোর্ট বিভিন্ন কৌশলে থাকা ও খাবারের জন্য অতিথিদের কাছ থেকে ন্যায্য পরিমাণের চেয়ে বেশি অর্থ নেয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। চেকইন ও চেকআউটের নির্দিষ্ট নিয়ম না থাকায় বেশিরভাগ রিসোর্ট নিজেদের মতো নিয়ম তৈরি করেছে।

শেখ মেহদি হাসানের মতে, পুরো পর্যটনসেবা ব্যবস্থাকে কিছু সাধারণ নিয়ম ও কঠোর নজরদারির মধ্যে আনতে হবে। দেশের পর্যটনশিল্প ও পর্যটকদের স্বার্থে কার্যকর ব্যবস্থা সরকারকেই নিতে হবে।