শিক্ষার মান নির্ভর করে যোগ্য শিক্ষক, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, কার্যকর পাঠদান ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার ওপর। কিন্তু দেশের মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থায় এসবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান শিক্ষকই এখন বড় সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন। গতকাল জাতীয় অর্থনীতি পত্রিকায় ‘মাধ্যমিকে শিক্ষকসংকট তীব্র, মান হারাচ্ছে শিক্ষা’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের প্রায় ৩৮ শতাংশ পদ শূন্য। প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদেও রয়েছে বড় ঘাটতি। এছাড়াও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের অভাব, অতিরিক্ত ক্লাসের চাপ এবং নিয়মিত প্রধান শিক্ষক ছাড়াই বিদ্যালয় পরিচালনার বাস্তবতা শিক্ষার মান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলছে। এমন পরিস্থিতিতে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা কঠিন।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের ১৬ হাজার ১৪১টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ১০ হাজার ৯৩ জন। শূন্য রয়েছে ৬ হাজার ৪৮টি পদ যা মোট পদের প্রায় ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ। আরও উদ্বেগজনক হলো, প্রধান শিক্ষকের ৫৭২টি পদের মধ্যে ৩৭৯টি এবং সহকারী প্রধান শিক্ষকের ৭০২টি পদের মধ্যে ৫২৭টি শূন্য। অর্থাৎ শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের জন্য শিক্ষক নয়, বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও একাডেমিক নেতৃত্বেও ঘাটতি রয়েছে। একজন নিয়মিত প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয়ের পাঠদানের পরিবেশ, শিক্ষকদের কাজের সমন্বয়, শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা ও সার্বিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দীর্ঘদিন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে প্রতিষ্ঠান চালালে এসব ক্ষেত্রে কার্যকর নেতৃত্ব ও জবাবদিহি দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা এ সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। সরকারি কর্ম কমিশনের মাধ্যমে নন-ক্যাডার পদে নিয়োগের প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় লাগায় এ সংকট আরও বাড়ছে। বছরের পর বছর পদ শূন্য রেখে শিক্ষার মান উন্নয়নের প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত হতে পারে না। এ ক্ষেত্রে সরকারের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত দ্রুত নিয়োগের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া। শূন্যপদের বিপরীতে নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে। একইসঙ্গে অবসরে যাওয়ার সম্ভাব্য সময়, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক চাহিদা, বিদ্যালয়ভিত্তিক শিক্ষার্থীসংখ্যা এবং নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি জনবল পরিকল্পনা তৈরি করা জরুরি। মোট কতজন শিক্ষক প্রয়োজন তা নির্ধারণ না করে কোন বিদ্যালয়ে কোন বিষয়ে কতজন শিক্ষক দরকার সেটি সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হবে।
শিক্ষকের সংখ্যার পাশাপাশি যোগ্যতা ও পেশাগত দক্ষতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ব্যানবেইসের প্রতিবেদনে মাধ্যমিক পর্যায়ে ইংরেজি পড়ান এমন ৯ হাজার ৯৮২ জন শিক্ষক এবং গণিত পড়ান এমন ১০ হাজার ১৬৯ জন শিক্ষক স্নাতক পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পড়াশোনা করেননি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ তথ্যকে সরাসরি তাদের পাঠদানের অযোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে না দেখে বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান ও প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ন এবং শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মান মূল্যায়নের ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি শিক্ষক নিয়োগে মেধা ও যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষার্থীর সংখ্যার পরিবর্তনও নীতিনির্ধারকদের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। ব্যানবেইসের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী সাধারণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রায় ৪ লাখ কমলেও একই সময়ে বিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে ৯৪টি। বিপরীতে মাদ্রাসা ও ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীসংখ্যা বেড়েছে। শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি আস্থা কমে যাওয়ার পেছনে শিক্ষার মান, অতিরিক্ত কোচিংনির্ভরতা, পরিবারের ব্যয় বৃদ্ধি এবং শিক্ষাক্রম নিয়ে অসন্তোষের মতো বিষয় কাজ করতে পারে। এসব কারণের প্রকৃত প্রভাব জানতে নির্ভরযোগ্য গবেষণা ও তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন দরকার। সরকারি বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরও মানসম্মত শিক্ষার জন্য অভিভাবকদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হলে তা সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার উদ্দেশ্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। বিশেষত নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য শিক্ষার ব্যয় বেড়ে যাওয়া সমান সুযোগ নিশ্চিত করার পথে বড় বাধা।
দ্রুত শূন্যপদ পূরণ, নিয়মিত প্রধান শিক্ষক নিয়োগ, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিশ্চিতকরণ এবং প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বিদ্যালয়ভিত্তিক জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। শিক্ষকসংকটের কারণে কোনো শিক্ষার্থী যেন মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয় তা নিশ্চিত হওয়া উচিত শিক্ষানীতির প্রধান লক্ষ্য। শিক্ষা খাতে ব্যয়কে কেবল আর্থিক দায় হিসেবে না দেখে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কারণ যোগ্য ও পর্যাপ্ত শিক্ষক ছাড়া মানসম্মত শিক্ষার প্রত্যাশা পূরণ হবে না; আর মানসম্মত শিক্ষা ছাড়া দক্ষ, সৃজনশীল ও প্রতিযোগিতামূলক প্রজন্ম গড়ে তোলাও সম্ভব নয়।