বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার এক বৈশ্বিক উদ্যোগ

ফিচার ডেস্ক: জাতিসংঘ ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে তার যাত্রা শুরু করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা এবং লিগ অব নেশনসের ব্যর্থতার পর বিশ্বের বুকে স্থায়ী শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এই আন্তর্জাতিক সংস্থাটি গঠিত হয়।

নিচে জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস এবং এটি কীভাবে যাত্রা শুরু করল তার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো:

১. পটভূমি ও আটলান্টিক সনদ (১৯৪১)
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়েই বিশ্ব নেতারা এমন একটি বিশ্ব সংস্থা গঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন যা ভবিষ্যতের যুদ্ধ থামাতে পারবে। ১৯৪১ সালের আগস্ট মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল একটি যৌথ ঘোষণা স্বাক্ষর করেন, যা আটলান্টিক সনদ নামে পরিচিত। এতে বিশ্ব শান্তির একটি রূপরেখা দেওয়া হয়েছিল।

২. ‘জাতিসংঘ’ নামের উৎপত্তি (১৯৪২)
১৯৪২ সালের ১ জানুয়ারি মিত্রপক্ষের ২৬টি দেশের প্রতিনিধিরা ওয়াশিংটনে মিলিত হয়ে আটলান্টিক সনদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে একটি ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেন। এই ঘোষণাপত্রেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট প্রথম ‘ইউনাইটেড নেশনস’ বা জাতিসংঘ নামটি প্রস্তাব করেন।

৩. ইয়াল্টা ও ডাম্বার্টন ওকস সম্মেলন (১৯৪৪-১৯৪৫)
১৯৪৪ সালের আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ওয়াশিংটনের ডাম্বার্টন ওকস ভবনে চীন, সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা মিলিত হয়ে জাতিসংঘের গঠনতন্ত্র, উদ্দেশ্য এবং কার্যপদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৪৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ইয়াল্টা সম্মেলনে নিরাপত্তা পরিষদের ভোটিং পদ্ধতি (ভেটো পাওয়ার) চূড়ান্ত করা হয়।

৪. সান ফ্রান্সিসকো সম্মেলন ও সনদ স্বাক্ষর (১৯ concert৫)
জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত ধাপ ছিল ১৯৪৫ সালের ২৫ এপ্রিল থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোতে অনুষ্ঠিত ‘আন্তর্জাতিক সংস্থা গঠনে জাতিসংঘের সম্মেলন’। 

•    এই সম্মেলনে তৎকালীন বিশ্বের ৫০টি দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন এবং দীর্ঘ আলোচনার পর জাতিসংঘের মূল দলিল বা ‘জাতিসংঘ সনদ’ তৈরি করেন।
•    
•    ১৯৪৫ সালের ২৬ জুন এই ৫০টি দেশ সনদে স্বাক্ষর করে। (পরবর্তী সময়ে পোল্যান্ড স্বাক্ষর করে প্রতিষ্ঠাতা সদস্য দেশের সংখ্যা হয় ৫১টি)।
•    
৫. চূড়ান্ত ও আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ (২৪ অক্টোবর, ১৯৪৫)
সনদ স্বাক্ষরিত হলেও তা কার্যকর হওয়ার জন্য নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচটি স্থায়ী সদস্য দেশ (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সোভিয়েত ইউনিয়ন, ফ্রান্স ও চীন) এবং অন্যান্য স্বাক্ষরকারী দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের অনুমোদনের প্রয়োজন ছিল।

১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর প্রয়োজনীয় দেশগুলোর দ্বারা সনদটি আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত (Ratified) হয়। এর মাধ্যমেই আইনগত ও কার্যগতভাবে জাতিসংঘের ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু হয়। এই বিশেষ দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে প্রতি বছর ২৪ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী ‘জাতিসংঘ দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়।

জাতিসংঘের মূল উদ্দেশ্যসমূহ:
যাত্রার শুরু থেকেই জাতিসংঘের প্রধান লক্ষ্যগুলো ছিল:
•    আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা।
•    বিভিন্ন জাতি বা দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা।
•    অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানবিক সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা।
•    মানুষের মৌলিক অধিকার এবং স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা বৃদ্ধি করা।