বাংলাদেশের টাকার ইতিহাস

মো. আরিফুজ্জামান

টাকা কেবল লেনদেনের মাধ্যম নয়; এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা, রাষ্ট্রীয় পরিচয়, রাজনৈতিক ইতিহাস, শিল্পকলা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ বাহক। ১৯৭২ সালের ৪ মার্চ প্রথম নিজস্ব ব্যাংক নোট প্রচলনের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের মুদ্রাব্যবস্থার যাত্রা শুরু হয়। এরপর পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ে টাকার নকশা, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও প্রতীকের ব্যবহারে নানা পরিবর্তন এসেছে, যা দেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করে।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২ এর মাধ্যমে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘বাংলাদেশ ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রথম গভর্নর হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন বিশিষ্ট ব্যাংকার আবু নজম হামিদ উল্লাহ্। সরকার দেশের প্রথম মুদ্রার নকশা প্রণয়নের জন্য একটি উচ্চপদস্থ কমিটি গঠন করে। এ কমিটির সদস্যরা হলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, পটুয়া কামরুল হাসান, শিক্ষাবিদ নীলিমা ইব্রাহিম ও শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী।

১৯৭২ সালের ৪ মার্চ ১ ও ১০০ টাকার নোট প্রচলনের মাধ্যমে বাংলাদেশের নিজস্ব কাগুজে মুদ্রার সূচনা হয়। একই বছরের ২ মে ১০ টাকার এবং ২ জুন ৫ টাকার নোট বাজারে আসে। এ নোটগুলো ভারতের মহারাষ্ট্রের নাসিখে অবস্থিত ‘ইন্ডিয়া সিকিউরিটি প্রেস’ থেকে মুদ্রণ করা হয়েছিল। প্রথমদিকের নোটগুলোর নকশায় সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্রের মাঝে একটি বিন্দু আঁকা হয়েছিল, যা ছিল দেশের সার্বভৌমত্বের বহিঃপ্রকাশ ও রাজধানী ঢাকার অবস্থান নির্দেশক। ১ টাকা ব্যতীত অন্যান্য মূল্যমানের নোটগুলোয় মানচিত্রের পাশাপাশি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিও স্থান পায়। পরবর্তী সময়ে নকশায় পরিবর্তন এনে বাজারে নতুন নোট প্রচলন করা হয়। এ সময়ের নোটগুলোর নকশাকার ছিলেন শিল্পী কে জি মুস্তাফা।

১৯৭৩ সালে ৫, ১০, ২৫ ও ৫০ পয়সার ধাতব মুদ্রা প্রচলিত হয়। ১৯৭৪ সালে বাজারে আসে ১ পয়সার ধাতব মুদ্রা এবং ১৯৭৫ সালে ১ টাকার ধাতব মুদ্রা। এ সময় থেকে কাগুজে নোট ও ধাতব মুদ্রা মিলিয়ে দেশের মুদ্রাব্যবস্থা বিস্তৃত হতে থাকে। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন নোটে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি বাদ পড়ে। ১৯৭৬ সাল থেকে বিভিন্ন নোটে মসজিদ, ঐতিহাসিক স্থাপনা, কৃষি, শিল্প, নদী ও গ্রামীণ জীবনের চিত্র বেশি গুরুত্ব পায়। পরবর্তী সময়ে শহিদ মিনার, জাতীয় স্মৃতিসৌধ, জাতীয় সংসদ ভবন ও বিভিন্ন অবকাঠামোও নোটের নকশায় স্থান পায়। ফলে বাংলাদেশের ইতিহাস, স্থাপত্য ও অর্থনৈতিক জীবনের নানা দিক মুদ্রায় প্রতিফলিত হয়।

১৯৯৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি আবার নতুন নোটে ফিরে আসে। তবে ২০০১ সালের পর তা পুনরায় বাদ পড়ে এবং জাতীয় প্রতীক, স্মৃতিসৌধ, মসজিদ ও রাষ্ট্রীয় স্থাপনানির্ভর নকশা প্রাধান্য পায়। এ সময় নোটের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য উন্নত করার পাশাপাশি নকশা ও আকারেও পরিবর্তন আনা হয়। ২০১১ সাল থেকে বিভিন্ন মূল্যমানের প্রচলিত নোটে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি নিয়মিত স্থান পায়। পাশাপাশি স্মৃতিসৌধ, শহিদ মিনার, স্থাপত্য, কৃষি, প্রকৃতি ও শিল্পকর্ম নোটের নকশায় অন্তর্ভুক্ত হয়। জাল নোট প্রতিরোধে নিরাপত্তা সুতা, জলছাপ, বিশেষ কালি, মাইক্রোপ্রিন্টিং ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীবান্ধব ফিচার এ সময়ের নোটের গুরুত্বপূর্ণ সংযুক্তি।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপত্য’ শীর্ষক নতুন নকশা ও সিরিজের ব্যাংক নোট প্রচলন শুরু করে। ১ জুন ২০২৫ প্রথম পর্যায়ে ১,০০০, ৫০ ও ২০ টাকার নোট বাজারে আসে। একই বছরের ১২ আগস্ট ১০০ টাকার এবং ৪ ডিসেম্বর ৫০০ টাকার নতুন নোট প্রচলিত হয়। তৎকালীন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের স্বাক্ষরযুক্ত এসব নোটে জাতীয় স্মৃতিসৌধ, আহসান মঞ্জিল, কান্তজিউ মন্দির, ষাটগম্বুজ মসজিদ, সুন্দরবন, শহিদ মিনার ও সুপ্রিম কোর্টসহ বাংলাদেশের ঐতিহাসিক স্থাপনা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বিভিন্ন নিদর্শন স্থান পায়। ২০২৬ সালের ১৮ মে থেকে নতুন সিরিজের ১,০০০, ৫০০ ও ১০ টাকার নোট বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের স্বাক্ষরসহ প্রচলন শুরু হয়। এ ক্ষেত্রে নোটের নকশা, রং, আকার ও নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য অপরিবর্তিত রাখা হয়; পরিবর্তন করা হয় শুধু গভর্নরের স্বাক্ষর। এছাড়া ১৯ মে ২০২৬ অর্থসচিবের স্বাক্ষরযুক্ত নতুন নকশার ৫ টাকার কারেন্সি নোটও প্রচলিত হয়। ৫ ও ১০ টাকার নোটের নকশায় জুলাই ’২৪ গ্রাফিতি স্থান পায়।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের নিজস্ব টাঁকশাল না থাকায় বিদেশে ছাপানো ব্যাংকনোট ও কারেন্সি নোট আমদানি করে দেশের চাহিদা পূরণ করা হতো। ১৯৮৮ সালে গাজীপুরে পরীক্ষামূলকভাবে ১ টাকার কারেন্সি নোট ও ১০ টাকার ব্যাংকনোট উৎপাদনের মধ্য দিয়ে দেশে নিজস্ব নোট মুদ্রণের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৮৯ সালের ৭ ডিসেম্বর সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেস আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে কাগুজে নোট মুদ্রিত হলেও ধাতব মুদ্রা বিদেশি মুদ্রা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তৈরি করিয়ে আমদানি করা হয়।

১৯৭২ সালের মানচিত্রসংবলিত প্রথম নোট থেকে ২০২৬ সালের ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপত্যনির্ভর নকশা— বাংলাদেশের টাকার বিবর্তন রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিবর্তন, সাংস্কৃতিক পরিচয় ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ধারাবাহিক দলিল। দৈনন্দিন লেনদেনের পাশাপাশি এই মুদ্রা বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে মানুষের সামনে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

লেখক: ডেপুটি কিপার, বাংলাদেশ ব্যাংক কারেন্সি মিউজিয়াম

—জা.অর্থনীতি/জেআরটি