সংকট ও মন্দায় গ্যাস ব্যবহার কমেছে ৩৯ শতাংশ

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামে হওয়ায় গড়ে উঠেছিল বড় বড় ও ভারী শিল্প; কিন্তু নানা সংকট ও মন্দায় চট্টগ্রাম অঞ্চলে কমছে গ্যাসের ব্যবহার। এর প্রভাবে গত এক দশকে শিল্প খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্টিবিউশিন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) গ্যাসের সংযোগ কমেছে। এখন শিল্প খাতে গ্যাস সংযোগের সংখ্যা মাত্র ৭৩৩। অথচ ২০১৬ সালে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কেজিডিসিএলের গ্যাস সংযোগ ছিল ১ হাজার ২০০টি। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে গ্যাস সংযোগ কমেছে ৪৬৭টি বা ৩৯ শতাংশ কম। অন্যদিকে চালু থাকা শিল্পে গ্যাস সরবরাহ হয় ৩৪ মিলিয়ন ঘনমিটার, যা দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর চাহিদা পূরণ হচ্ছে না।  

কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন সূত্রে জানা যায়, আমদানি ও রপ্তানি সুবিধা থাকায় চট্টগ্রাম অঞ্চলে ইস্পাত খাত, জাহাজ ভাঙা, সিমেন্ট শিল্প, চিনি শিল্প, কাগজ কল, পোশাক শিল্প, কাচ শিল্পসহ বহুমাত্রিক শিল্প কারখানা গড়ে ওঠে। এসব শিল্প-কারখানার উৎপাদন সচল রাখতে গ্যাস সরবরাহ করে কেজিডিসিএল। শুরুতে শিল্প খাতে প্রতিষ্ঠানটির গ্যাস সংযোগ ছিল ১ হাজার ২০০টি। এ সংখ্যা বর্তমানে নেমেছে ৭৩৩টিতে। সময়ের ব্যবধানে শিল্প খাতে সংযোগ কমেছে ৪৬৭টি। এসব চালু থাকা সংযোগের বিপরীতে গ্যাসের মাসিক চাহিদা ৩৪ মিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস। ১০ বছর আগে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ ছিল প্রায় ৬০ মিলিয়ন ঘনমিটার। মূলত প্রাকৃতিক গ্যাস সংকট, এলএনজি গ্যাসের সরবরাহ কম, ব্যবসায় মন্দা, চট্টগ্রামের বেসরকারি বিনিয়োগে শিল্প স্থাপন কমে যায়। খেলাপি ঋণে বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠান বৃদ্ধি পাওয়ায় শিল্প খাতের গ্যাসের চাহিদা তেমন বাড়েনি।  

ব্যবসায়ী ও শিল্প পুলিশের কর্মকর্তারা বলেন, চট্টগ্রামে গত দুই বছরে স্থায়ী ও অস্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে ১৯০টির মতো কারখানা। আর এক দশকে ৫০০-এর বেশি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। এতে কর্মহীন হয়েছেন প্রায় ৫০ হাজার শ্রমিক ও কর্মচারী। কারখানা বন্ধের পেছনে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়া, ঋণ ও এলসি-সংক্রান্ত জটিলতা, বিদ্যুৎ সংকটসহ আটটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম শিল্প পুলিশ-৩-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শিল্পাঞ্চলটিতে ১৯০ কারখানার মধ্যে ১৩৮টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। বাকিগুলো সাময়িকভাবে। বন্ধ কারখানার মধ্যে ৬৮টি তৈরি পোশাক (আরএমজি) কারখানা। অন্যগুলো সাধারণ ও রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান। এগুলোর মধ্যে আছে ইস্পাত কারখানা, ভোজ্যতেল পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠান, সিমেন্ট কারখানা, ওষুধ, চিনি কারখানা, জাহাজ ভাঙা প্রতিষ্ঠান ও বিদ্যুৎকেন্দ্র। 

এসএ গ্রুপের চেয়ারম্যান শাহাবুদ্দিন আলম জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, সব ধরনের অনুমোদন থাকা সত্ত্বেও সময় মতো গ্যাস সংকটের কারণে আমার ছয়টি কারখানা উৎপাদনে আসতে পারেনি। কারখানাগুলোয় গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়নি। সময় মতো উৎপাদনে না আসায় ঋণ খেলাপি হয়ে পড়েছি। ফলে ব্যাংকের সহযোগিতাও বন্ধ হয়ে গেছে। তার অধিকাংশ ঋণ এখন নিয়মিত হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এখন আমাদের ব্যবসা করার জন্য চলতি মূলধন দেওয়া হলে চলমান সংকট কেটে যাবে।         

চট্টগ্রামের কেজিডিসিএলের একাধিক বাণিজ্যিক গ্রাহক জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, চট্টগ্রামের গ্যাসের চাহিদা মাসে ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। এ চাহিদার বিপরীতে কেজিডিসিএল গ্যাস সরবরাহ করতে সক্ষম মাত্র ১৯০ মিলিয়ন ঘনফুট। অথচ এলএনজি আমদানির পর এ সংকট কেটে যাওয়ার কথা ছিল। আবার প্রতি মাসে গ্যাস কেনার চেয়ে বিক্রি হয়েছে বেশি। এতে সঠিক পরিমাণে গ্যাস না পেয়েও গ্রাহকদের নির্ধারিত বিল পরিশোধ করছে। কিন্তু ব্যবসার জন্য মানসম্মত গ্যাস দিতে হবে। আর বিভিন্ন সময়ে গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যায়। এতে কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস বাড়ছে। ফলে ভালো প্রতিযোগিতা করা যাচ্ছে না।

চট্টগ্রাম চেম্বারের সিনিয়র সহ-সভাপতি ও রাইজিং গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমজাদ হোসাইন চৌধুরী জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, এক দশক আগে ব্যবসায়ীরা চাহিদা অনুসারে গ্যাস সরবরাহ পায়নি। এ কারণে চট্টগ্রামে নতুন করে শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠেনি। আর যেসব প্রতিষ্ঠান চালু আছে তারাও চাহিদা মতো গ্যাস পাচ্ছে না। এ কারণে চট্টগ্রামের ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রাসরণ হয়নি। এছাড়া বৈশ্বিক মন্দা, এলসি সংকট, ঋণ জটিলতায় অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে চট্টগ্রামের গ্যাস ব্যবহার বাড়েনি। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে নীতিনির্ধারকদেরই ভাবতে হবে। 

অপরদিকে একটি ইস্পাত উৎপাদনকারী কোম্পানির একজন পরিচালক বলেন, আমাদের কারখানায় গ্যাসের অনুমোদিত লিমিটের ৫০ শতাংশও ব্যবহার করতে পারছি না। কারণ দেশে ইস্পাতের উৎপাদন সক্ষমতার ৫০ শতাংশও চাহিদা নেই। ফলে গ্যাসের ব্যবহার কমবে স্বাভাবিক। 

কেজিডিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সালাহউদ্দিন জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, যতটুকু গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে, ততটুকুই সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে সরবরাহ করা গ্যাসে চট্টগ্রামের গোটা চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে সরকার কাজ করছে। 

বর্তমানে শিল্প, বাণিজ্যিক ও আবাসিকসহ সব মিলিয়ে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশনের গ্রাহক সংখ্যা ১ লাখ ৪৮ হাজার ৮০৬। তাদের জন্য চলতি বছরের আগস্টে কোম্পানিটি গ্যাস কিনেছে ১৯০ মিলিয়ন ঘনমিটার। আর বিক্রি করেছে ১৯৬ মিলিয়ন ঘনমিটার। আর এতে সিস্টেম গেইন হয় ছয় মিলিয়ন ঘনমিটার।